রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়নে আইডিবির সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি করেছে সরকার। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে তেল পরিশোধনের সক্ষমতা ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে ৪৫ টন হবে। এতে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার অন্তত ৪৫ শতাংশ পূরণ হবে। ২০৩০ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। চার বছরের বেশি লাগলেও গভীর জ্বালানি সংকটের এই সময়ে ৫৮ বছরের পুরনো একমাত্র রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়াতে সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া কিছুটা স্বস্তির বিষয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার সীমিত রিজার্ভের মধ্যে রিফাইনারি আধুনিকায়নের মতো জরুরি কাজে ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি করা একটি সময়োচিত ও সাহসী সিদ্ধান্ত। এ পদক্ষেপকে আমরা সাধুবাদ জানাই। রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়ানো উচ্চমানের কারিগরি বিষয়। আমাদের প্রত্যাশা প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।
নানামুখী জ্বালানি সংকটে মানুষের সমস্যা চরমে পৌঁছেছে। দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৬৪ শতাংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় এর সরবরাহ বড় ঝুঁকিতে আছে। রাজধানীতে কিছুটা কম হলেও গ্রামাঞ্চলে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যায় বহু পরিবারে রান্না বন্ধ হতে চলেছে। শিল্পোদ্যোক্তাসহ জ¦ালানিনির্ভর পেশায় যারা আছেন, তারা হিমশিম খাচ্ছেন। বহু কারখানায় উৎপাদন সীমিত করা হয়েছে। প্রায় ২ মাস ধরে এমন অবস্থা চলতে থাকায় রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পসহ শত শত প্রতিষ্ঠান পড়েছে উভয় সংকটে। তাদের কেউ বেশি দামে চাইলেও গ্যাস-বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। সংকট আরও দীর্ঘায়িত হলে বেশিরভাগকেই লোকসান গুনতে হবে। লোকসানের ঝুঁকি কমাতে অনেক উদ্যোক্তা উৎপাদন বন্ধ, এমনকি কারখানা বিক্রি করে ‘আমদানিনির্ভর’ ব্যবসা করার কথা বলছেন। এতে বহু মানুষের কর্মহীন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দেশে সাতটি সার কারখানার ছয়টি বন্ধ। কৃষকরা পড়েছেন বিপাকে। সব মিলিয়ে অর্থনীতির নানা স্তরে চাপ বাড়ছে।
গ্যাসের সরবরাহের বর্তমান সংকট আরও একটি গভীর দুর্বলতা সামনে এনেছে, তা হলো বৈদেশিক মুদ্রার সীমিত রিজার্ভের পাশাপাশি আমদানি করা জ্বালানির ওপর দেশের নির্ভরতা বাড়তে থাকা।
সরবরাহ অব্যাহত রাখতে দেশে প্রতি মাসে গড়ে ১০টি এলএনজি কার্গো আমদানি করতে হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কাতারসহ নিয়মিত সরবরাহকারীরা অপারগতা জানানোয় এখন সাত থেকে আটটি কার্গো স্পট-মার্কেট থেকে কিনতেই হচ্ছে চড়া দামে। সম্প্রতি কেনা দুটি কার্গোতে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে এক কোটি ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২৩ কোটি টাকার সমান। অন্যদিকে প্রায় এক হাজার কোটি টাকায় কেনা প্রতিটি কার্গোর গ্যাস দেশে বিক্রি করে রাষ্ট্র পায় মাত্র ৩৫০ কোটি টাকার মতো। অর্থাৎ প্রতি কার্গোতে লোকসান হচ্ছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। কিন্তু এই ভর্তুকি দিয়ে যাওয়ার বিকল্প এখনো নেই।
এর মধ্যে সরকার বলছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে অন্তত ২ বছর লাগতে পারে। দুই বছর পরও পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসবে, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ঠিক রাখার একমাত্র উপায় হচ্ছে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি করা। কিন্তু চাইলেই দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। আর গ্যাসের বদলে জ্বালানি তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলে ভর্তুকির চাপ এতটা বাড়বে, যা বহন করা রাষ্ট্রের পক্ষে বেশ কঠিন হবে।
পাইপে বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ আর না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আছে। বর্তমান সংযোগগুলো ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার উৎসাহিত করা হচ্ছে। রূপপুরের বিদ্যুৎ যতটা সম্ভব দ্রুত গ্রিডে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ বেশ সময় নেবে।
তবে সংকট থেকে উত্তরণে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে নতুন রিগ কেনা, নতুন গ্যাস কূপের খোঁজে জরিপ চালানো, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানসহ একগুচ্ছ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারকে সাহসী ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর তা দ্রুত বাস্তবায়িত হলে মানুষ একটু দেরিতে হলেও স্বস্তি পাবে।