প্রণোদনা বাস্তবায়ন

ঋণ না দেওয়া ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি এফবিসিসিআইয়ের

সরকার করোনা পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিতে গতি আনতে বড় অঙ্কের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণের ঘোষণাও রয়েছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রণোদনার ঋণ দিতে অনেক ব্যাংক অনীহা দেখাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যেসব ব্যাংক প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করবে না, সেখানে থাকা সরকারের আমানত তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই।

গতকাল রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন ভবনে প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম। সভায় যেসব ব্যাংক প্রণোদনা বাস্তবায়ন করবে না, সেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি কর আরোপের দাবি জানান তিনি। আর মানুষের পাশে দাঁড়ানো ব্যাংকগুলোর  ক্ষেত্রে ‘বিশেষ কোনো ব্যবস্থায়’ ১ শতাংশ করপোরেট ট্যাক্স ছাড় দেওয়া যা কি না, সে প্রস্তাবও করেছেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি। তবে কোনো ঋণখেলাপির পক্ষে এফবিসিসিআই ঋণের জন্য সুপারিশ করবে না বলেও স্মরণ করিয়ে দেন ফজলে ফাহিম।

করোনাভাইরাস মহামারীতে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার এক লাখ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে, তা ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে যাবে, যার সুদের একটি অংশ দেবে সরকার। আর ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোকে অর্থ জোগাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রণোদনার ঋণ দ্রুত ছাড় করতে ব্যাংকগুলোকে তাগিদ দিয়ে আসছে।

এ সময় এফবিসিসিআই সভাপতি অভিযোগ করেন, প্রণোদনা নিয়ে একটি শ্রেণি বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো প্রণোদনার আওতায় ঋণের অর্থ দিতে পারছে না বলে বলা হলেও এর সঙ্গে একমত নন এফবিসিসিআই সভাপতি। ফাহিম বলেন, ব্যাংকে তারল্য বাড়ানোর জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে ঈদের আগেই ব্যাংকগুলোতে ৭০ হাজার কোটি টাকা নতুন তারল্য সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকাররা আমাদের সঙ্গে (এফবিসিসিআই) সভায়ও বলেছে, কোনো তারল্য সংকট নেই। তিনি বলেন, প্রণোদনা বাস্তবায়ন কেবল ব্যবসায়ীদের স্বার্থে নয়। সার্বিকভাবে সমাজের ওপর এর প্রভাব পড়বে। এ সময় জানানো হয়, এসএমই খাতের জন্য প্রণোদনার আওতায় বরাদ্দ হওয়া ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে দুই মাসে মাত্র ৫০ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজের অগ্রগতি এবং ব্যাংকগুলোর অনীহার বিষয়ে অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দেবেন তারা।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি এবং কুটিরশিল্পের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থাপনা তৈরির প্রস্তাব করে তিনি বলেন, এসব শিল্পের ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে। তাদের ৯৯ শতাংশ ব্যাংকগুলোর ঋণের শর্তের উপযোগী হবে না। ‘এ কারণে যারা এ খাতে আগে থেকে বিনিয়োগ করে থাকে এবং বাংলাদেশের বাস্তবতার নিরিখে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা আমরা বলেছি।’

অর্থনৈতিক সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এখনই ‘বড় সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন এফবিসিসিআই সভাপতি। তিনি বলেন, ‘২০২১ ও ২২ সালের মধ্যে তারা ফরমাল মার্কেটে প্রবেশ করবে। পরের বছর এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের সময় গ্লোবাল মার্কেটেও ঢুকে যাবে। এর মাধ্যমে অ্যাকসেস অব ক্যাপিটাল, কস্ট অব ক্যাপিটালের গণতন্ত্রায়ন হবে। কিন্তু এখনো আমরা ক্ষুদ্র, কুটিরশিল্প এবং মাঝারি শিল্পের কাছে সেভাবে পৌঁছাতে পারিনি। ব্যাংক-ক্লায়েন্ট রিলেশনশিপের দিকে তারা নেইও। ফলে অন্য জায়গায় বেশি সুদে ঋণ নিলেও ব্যাংকের কাছে যান না।

সংবাদ সম্মেলনে আয়কর ও ভ্যাটের বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তির কথা তুলে ধরে বাজেট পাসের সময় এসব বিষয়ে সংশোধনের দাবি জানায় এফবিসিসিআই। বিশেষত অগ্রিম আয়কর, ভ্যাটের অধীনে আগাম কর এবং ন্যূনতম করব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে বাতিলের দাবি জানানো হয়। অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স আমরা ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব আমরা করেছি। সামনের দিনগুলোতে এটা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করেছেন বলে জানান ফাহিম।

দেশের শীর্ষ এই সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভ্যাট ও শুল্কসংক্রান্ত বেশ কিছু সিদ্ধান্তের কারণে ব্যবসায়ে অহেতুক জটিলতা তৈরি হবে। বিশেষত ভ্যাটসংক্রান্ত বিরোধের আপিলে অগ্রিম প্রদানকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ করা, কমিশনারের অনুমতি ছাড়াই নিচের সারির কর্মকর্তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অভিযানের অনুমতি দেওয়া, আমদানিকৃত পণ্য চার মাসের মধ্যে ব্যবহারের শর্ত, বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ আসার পাঁচ দিনের মধ্যে বিল অব এন্ট্রি দেওয়ার শর্ত, ভ্যাট রেয়াতের ক্ষেত্রে অনেক পণ্য তালিকার বাইরে রাখাসহ বেশ কিছু ইস্যু উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, এসব সিদ্ধান্ত স্বচ্ছতা ব্যাহত করবে এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবে।

অর্থবিলে এনবিআরের পরিবর্তনের বিষয়গুলো সহজসাধ্যভাবে উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একটি কমা বুঝতে হলে ১০টা বই দেখতে হয়। এনবিআরের কর্মকর্তাদের ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, সহজ করার বদলে তারা বসে বসে ‘দুষ্টামি প্যাঁচ’ মারে, আমাদের বুঝতে সময় লাগে।

এনবিআর রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে ব্যবসাবান্ধব করার চেয়ে নতুন নতুন প্রকল্প নেওয়ায় আগ্রহী উল্লেখ করে এটি নিয়ে নিজেদের অসন্তোষের কথা জানান। একই সঙ্গে অতীতে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান এফবিসিসিআই সভাপতি। তিনি বলেন, এসব প্রকল্পে যুক্তরা অনেকে চাকরিতে রয়েছেন। আবার অনেকে অবসরে গিয়ে পরামর্শক হিসেবে রয়েছেন। ব্যর্থদের বাদ দিয়ে যোগ্য কর্মকর্তাদের এসব প্রকল্পে যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, এর পেছনে ইতিমধ্যে রাষ্ট্রের কয়েক শ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে।

সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীরা নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া অনলাইনেও বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতা ও সাংবাদিক যুক্ত হন।