২৫ হাজার পাটকল শ্রমিকের চাকরির অবসান

লোকসান থেকে বাঁচতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হচ্ছে গত কয়েক দিন ধরে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এমন সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোট, শ্রমিক নেতারা, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠন বিবৃতি ও অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছে। এর মধ্যেই গতকাল রবিবার পাটকলগুলোর ব্যবস্থাপনা মডেল সংস্কার নিয়ে অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি পরিষ্কার করেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। তিনি বলেছেন, ‘দেশের ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে অবসরে পাঠানো হচ্ছে। সরকার চিন্তা করছে কীভাবে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে শ্রমিকদের টাকা বুঝিয়ে দিয়ে এ কারখানাগুলোকে আবার চালু করে আমাদের পাট খাতকে এগিয়ে নিতে পারি।’

এর তীব্র সমালোচনা করে শ্রমিক ও বাম জোটের নেতারা বলছেন, এ শিল্পকে আধুনিকায়ন না করে বরং বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশকে আরও পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কৃষক থেকে শুরু করে পাটকলের সঙ্গে সরাসরি জড়িত দেশের কয়েক লাখ পরিবার পথে বসবে। এ শিল্পকে বাঁচালে দেশ এগিয়ে যাবে। দ্রুত এ সিদ্ধান্ত বাতিল করা উচিত। পাটকল বন্ধ করলে তা চালু করা হবে না বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।

এদিকে পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ এবং বিজেএমসি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। সিদ্ধান্তটি বাতিল করে পাটকল আধুনিকায়ন করতে উদ্যোগ না নিলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে বিক্ষোভসহ কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।

বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অবস্থান সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল্লাহ কাফি রতন, বাসদের (মার্কসবাদী) নেতা কমরেড মানস নন্দী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য কমরেড আকবর খান, গণসংহতি আন্দোলনের কমরেড বাচ্চু ভূঁইয়া, কমিউনিস্ট লীগের কমরেড নজরুল ইসলাম, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির নেতা কমরেড আমেনা বেগম। সমাবেশ পরিচালনা করেন বাসদ নেতা খালেকুজ্জামান লিপন।

সমাবেশে নেতারা বলেন, করোনা সংক্রমণের এ দুর্যোগকালে এমনিতেই প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। বিদেশ থেকেও অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়ে দেশে ফিরছে। সেই সংকটকালে সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী পদক্ষেপ নিচ্ছে। তারা বলেন, পাট ও পাট শিল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য গভীরভাবে যুক্ত। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও পাটকল শ্রমিকদের ভূমিকা ছিল সামনের কাতারে। দেশ স্বাধীনের পর ৭৭টি রাষ্ট্রীয় পাটকল ছিল। ১৯৮২ সাল থেকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কাঠামোগত সমন্বয়ের পরামর্শ পলিসি অনুসারে একের পর এক বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলো বন্ধ করতে থাকে শাসকশ্রেণি। পানির দামে এসব কলকারখানা ব্যক্তিমালিকদের হাতে তুলে দেয়। এখনো তার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।

নেতারা বলেন, বলা হচ্ছে পাটকল লোকসান দিচ্ছে। দেশবাসীর প্রশ্ন লোকসানের জন্য দায়ী কে? সরাকরের দুর্নীতি, লুটপাট, ভুলনীতি ও মাথাভারী-অদক্ষ প্রশাসন লোকসানের জন্য দায়ী শ্রমিকরা নয়।

সমাবেশ থেকে আগামী ২ জুলাই পাটকল বন্ধের প্রতিবাদে, যতবার খুশি জ¦ালানির দাম বৃদ্ধির বিল প্রত্যাহার এবং স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনা বন্ধ, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে বিনামূল্যে সব নাগরিকের করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল এবং একই দাবিতে জেলায় জেলায় এক ঘণ্টা রাস্তা অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেন বাম জোটের সমন্বয়ক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ।

এদিকে গতকাল রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর ব্যবস্থাপনা মডেল সংস্কার নিয়ে অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে লোকসান থেকে বাঁচতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে অবসরে পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী।

একই অনুষ্ঠানে বস্ত্র ও পাট সচিব লোকমান হোসেন মিয়া বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে শ্রমিকদের চাকরির অবসান করতে। পাটকল শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেক দেওয়ার পর পিপিপির মাধ্যমে পাটকলগুলোকে আধুনিকায়ন করে উৎপাদনমুখী করা হবে। তখন এসব শ্রমিক সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকরির সুযোগ পাবেন।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার এ সিদ্ধান্তটি আগেই নিয়েছে এখন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কিন্তু এটা দেশের উন্নয়নের অন্তরায় হবে। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত স্থায়ী-অস্থায়ী মিলে প্রায় ৫৫-৬০ হাজার শ্রমিক কাজ হারাবে। তাদের পরিবার এবং ৪০ লাখ পাটচাষি ও তাদের পরিবার, পাট ব্যবসায়ী মিলে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ চরম বিপাকে পড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাত্র ১২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে রাষ্ট্রীয় পাটকলের আধুনিকায়ন করলে শ্রমিকদের ২৫ হাজার টাকা বেতন দিয়েও কারখানা লাভজনক থাকবে। কোনো শ্রমিক ছাঁটাই করতে হবে না বরং নতুন শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া যাবে। অথচ সরকার এই ১২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ না করে ৬ হাজার কোটি টাকা দিয়ে শ্রমিক ছাঁটাই ও পাওনা পরিশোধ করে কারখানা বন্ধ করতে চাইছে যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এছাড়া ইতিহাস বলে দিচ্ছে পাটকল বন্ধ হলে পরে তা আর চালু হয় না, এগুলো হবে বলেই আশঙ্কা করি।’