বেকার ও পেশাজীবীদের আন্দোলনের মধ্যে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ১৪৫ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আগামীকালের মধ্যে তাদের কাজে যোগ দিতে বলা হয়েছে। পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই তাদের এ নিয়োগ দেওয়া হলো। গতকাল রবিবার নিয়োগপত্র ইস্যু করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বেকার অ্যান্ড প্রাইভেট সার্ভিসেস মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বারবার বলেছি ১৮৩ জনের বাছাই প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ। নিয়মবহির্ভূতভাবে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে একটি চক্র তাদের তালিকা করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। শেষ পর্যন্ত ওই তালিকা থেকেই ১৪৫ জনকে নিয়োগ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আমাদের প্রতিবাদ আর আন্দোলনের কোনো মূল্যই দিল না কর্র্তৃপক্ষ। এখানে একটি দুষ্টচক্র রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা নিয়ে স্বার্থের খেলা খেলেছে। আমরা অবিলম্বে এ নিয়োগ বাতিলের দাবি জানাচ্ছি এবং ১ হাজার ২০০ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার আহ্বান জানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে দেড় লাখ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট দরকার। আছে মাত্র পাঁচ হাজারের কিছু বেশি। গত ১০ বছরে কোনো মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ হয়নি। এদিকে বেকার বসে আছে ২৫ হাজার। তাদের বয়স প্রমার্জনা করে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হোক। আর রাষ্ট্রপতি প্রমার্জনা করলেও শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো প্রমার্জনা করেননি। কিন্তু যে ১৪৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হলো তাদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাস করা। তাদের সনদ নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা রয়েছে। তাদের কোন ক্ষমতাবলে নিয়োগ দেওয়া হলো তা আমি বুঝতে পারছি না।’
করোনা আক্রান্তদের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার আওতা বাড়াতে ১ হাজার ২০০ মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। একটি চক্র আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ১৮৩ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্টের নামের তালিকা চূড়ান্ত করে বলে অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, তারা মহামারীর মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কভিড-১৯ রোগীদের সেবা দিয়েছেন। এ কারণে শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া বিভিন্ন বিষয় মার্জনা করে তাদের চাকরিতে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। তৈরিকৃত তালিকা নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক গণমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। বেকার মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করে অবস্থান ধর্মঘট ও কালোব্যাজ ধারণ করছেন।
এসব অনিয়ম তদন্ত না করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১৪ ও ১৫ জুন ১৮৩ জনকে সশরীরে হাজির হয়ে তাদের কাগজপত্র দাখিল করতে বলে । ১৮৩ জনের মধ্যে ১৫৭ জন হাজির হয়ে কাগজপত্র জমা দেন। জমাকৃত কাগজপত্র বাছাই করে দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ হতে পাস করা প্রার্থী রয়েছেন ৯৩ জন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাস করা প্রার্থী ৫২ জন, বিএসসি ইন হেলথ টেকনোলজি পাস করা প্রার্থী ৯ জন, সনদবিহীন প্রার্থী ২ জন এবং ডিপ্লোমা ইন ফার্মেসি পাস করা প্রার্থী ১ জন। শেষ পর্যন্ত বিএসসি মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স পাস করা ৯ জন প্রার্থী, ডিপ্লোমা ইন ফার্মেসি কোর্স করা ১ জন প্রার্থী, ডিপ্লোমা সনদবিহীন ২ জন প্রার্থীসহ ১২ জনকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ থেকে পাস করা ৯৩ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাস করা ৫২ জনসহ ১৪৫ জন প্রার্থীকে চূড়ান্ত করে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে।
১৮৩ জনের তালিকায় ১৪ জন প্রার্থীর নাম দুবার করে উল্লেখ রয়েছে। মো. দাইমুল ইসলামের নাম আছে ক্রমিক ৪৯ ও ১৪২ নম্বরে। ক্রমিক ৫০ ও ১৪৩ নম্বরে রয়েছেন একই ব্যক্তি মো. আরাফাত হোসেন গনি। মো. কাফি আল মাহমুদের নাম রয়েছে ক্রমিক ৫২ ও ১৪১ নম্বরে। ক্রমিক ৫৩ ও ১৪৪-এ রয়েছেন একই ব্যক্তি মো. মশিউর রহমান। ক্রমিক ৬৩ ও ১৪৪-এতে রয়েছেন একই ব্যক্তি মো. হামিম, ৭৮ ও ১৫৯-তে মো. আবদুল কায়উম, ৮২ ও ১৭৮-এ মো. জিন্নাতুল নাইম, ৮৪ ও ১৭৭-তে মো. ইউসুফ আলী , ৮৬ ও ১২৬-তে মো. শিমুল আহমেদ, ৮৯ ও ১৮৩-তে মো. নিশাত রায়হান, ৯৬ ও ১৩৩ নম্বরে মো. শাহিন আলম, ১০০ ও ১৫৮ নম্বরে মো. খোকন সরকার, ১০৮ ও ১৪৫ নম্বরে মো. মোরশেদ রায়হান, ১২২ ও ১৩৪ নম্বরে মো. মাসুদ বিল্লাহ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্র্তৃক বাছাইকৃত ১৪৫ জনের মধ্যে মো. আবদুল কায়উম, শিমুল আহমেদ, মো. শাহিন আলম, মো. মোরশেদ রায়হান ছাড়া বাকি ১০ জনের নাম নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে। এনটিপি প্রকল্প থেকে নিয়োগ পাওয়া ইশরাত জাহান কাজে যোগদান না করেও ১৪৫ জনের চূড়ান্ত নিয়োগের তালিকায় ৬৬ নম্বরে রয়েছেন। তিনি কভিডের কোনো কাজ না করেই চূড়ান্ত নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, অনেক মেডিকেল টেকনোলজিস্ট কভিডের কাজে যোগদান করার সঙ্গে সঙ্গেই, আবার কেউ যোগদানের আগেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক প্রশাসন স্বাক্ষরিত ১৮৩ জনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এপ্রিল ও মে মাসে যারা এ কাজ করেছেন তাদের ১৮৩ জনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করে মে মাসের শেষ সপ্তাহে এমনকি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে করোনার কাজে যুক্তদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের নাম ১৮৩-তে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তালিকা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃতপক্ষে যারা করোনার কাজ করেছেন তাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, অন্যদিকে যারা কাজ করেননি তাদের অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তালিকায় ঢাকার ১০টি কমিউনিটি সেন্টার, ৪টি বেসরকারি ক্লাব, ৪টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ৭টি বেসরকারি হাসপাতালে এনজিও ব্র্যাক নিয়োজিত কর্মচারীদের নাম রয়েছে। একইভাবে আইদেশি নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ৪ জন কর্মচারীর নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে। অনুরূপভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ জন, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন কর্মচারীর নাম ১৮৩ জনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
বেকার মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৮৩ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট তালিকায় দৃশ্যমান অসংগতি রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে পরিচালক প্রশাসন কার নির্দেশে ১৮৩ জনের নামের তালিকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন তার চিঠিতে সে নির্দেশনা নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিঠিতে ১৮৩ জনকে সরাসরি স্থায়ী নিয়োগের কোনো সুপারিশ নেই। অথচ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের সরাসরি স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা চেয়ে সার-সংক্ষেপ পাঠায়। চিঠিতে যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে তার মধ্যে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও এনজিওর নাম রয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানে কর্মচারী নিয়োগ হয় তাদের নিজস্ব নিয়মে। সেখানে স্বাস্থ্য বিভাগ কীভাবে সরকারি কর্মচারী নিয়োগ দেবে সে বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বিএসএমএমইউ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও ব্র্যাক।
করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান হাসপাতাল বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে যারা রোগীদের সেবা দিচ্ছেন তাদের নাম তালিকায় নেই। তাছাড়া কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে গত ৪ থেকে ৫ বছর ধরে মাস্টাররোলে প্যাথলজি বিভাগে কর্মরত আছেন চারজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, দেড় থেকে দুই বছর ধরে কাজ করছেন ২ জন। ১৮৩ জনের মধ্যে এই ৬ জনের নাম নেই। করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কেন্দ্রস্থল আইইডিসিআরের কর্মরতদেরও নাম নেই।