পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের শর্ত শিথিল

করোনাভাইরাসের মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি সচলে প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট ও আয়কর আইনে সংযোজিত নতুন ধারা বাতিল, মোবাইল ফোনসেবায় বাড়তি কর প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন দাবি জানানো হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। বাজেটে বিশাল ব্যয় সংস্থানে বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যেও আয়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যবসায়ীদের দাবি পূরণ না হলেও পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগে শর্ত শিথিল করে লকইনের মেয়াদ কমানো হয়েছে।  পাশাপাশি জিরো কুপন বন্ডে আরোপিত কর প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের আরও কিছু সংশোধনী এনে গতকাল পাস হয়েছে অর্থ বিল। পাস হওয়ার পর এটি অর্থ আইনে পরিণত হলো। আজ মঙ্গলবার পাস হবে বাজেট। ২০২০-২১ অর্থ বিলে ভ্যাট সংক্রান্ত বিরোধে আপিল করার ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বাজেটে যে বাড়তি ২০ শতাংশ অর্থ অগ্রিম জমা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া চার মাসের মধ্যে কাঁচামাল ব্যবহার না করলে অগ্রিম প্রদান করা ভ্যাট  ফেরত না পাওয়ার বিধানও বাতিল করা হয়েছে। সরকারের জিরো কুপন বন্ডে বিনিয়োগ করমুক্তই থাকছে। প্রস্তাবিত বাজেটে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আনার স্বার্থে অন্যান্য বন্ডের মতো এই বন্ডে বিনিয়োগে কর সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার   কোটি টাকার বাজেটের সঙ্গে অর্থ বিল ২০২০ জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছিলেন। গতকাল দুপুরে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অর্থমন্ত্রী অর্থ বিল পাসের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। ১ জুলাই থেকে শুরু হবে নতুন অর্থবছর।

কয়েকজন সংসদ সদস্যের সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণের মধ্য দিয়ে সংসদে যে অর্থ বিল পাস হয়েছে, তাতে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল না। মোবাইল সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব প্রত্যাহারের যে দাবি ছিল, তাতেও কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

আড়াই বছর ধরে মন্দায় থাকা পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শর্তসাপেক্ষে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। এতে পুঁজিবাজারে কালো টাকার বিনিয়োগ তিন বছর রাখার শর্তারোপ করা হয়। তবে কালো টাকা বিনিয়োগের এমন সুযোগ দেওয়ার পরও পুঁজিবাজারে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি), ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ এবং অন্য অংশীজনরা কালো টাকার বিনিয়োগ তিন বছরের পরিবর্তে এক বছর রাখার দাবি জানায়। সরকারও তা মেনে নিয়ে গতকাল শর্ত শিথিল করে এক বছর রাখার শর্তে পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়। 

১১ জুনের প্রস্তাবিত বাজেটের বেশকিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষত আপিলে বাড়তি ২০ শতাংশ অর্থ জমার শর্ত, কাঁচামাল চার মাসের ব্যবহারের শর্ত, কমিশনারের অনুমতি ছাড়াই নিচের সারির কর্মকর্তাদের অবাধে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানোর ক্ষমতা, বন্দরে পণ্য আসার পাঁচ দিনের মধ্যে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা, ভ্যাট রেয়াত নেওয়ার সুযোগ থেকে বেশকিছু পণ্যকে বাতিল করা এর মধ্যে অন্যতম। অন্যদিকে আয়করের ক্ষেত্রে বছরে তিন কোটি টাকার বেশি বিক্রয় করলে ন্যূনতম করের আওতায় আনা, কোম্পানির প্রমোশনাল ব্যয়ে রাশ টানায় বাড়তি করের মুখে পড়াসহ আরও কিছু প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানান তারা। তারা জানান, এসব প্রস্তাব পাস হলে তা ব্যবসায়ে জটিলতা ও হয়রানি বাড়াবে। অন্যদিকে কালো টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা হলে তিন বছরের মধ্যে প্রত্যাহার করতে না পারার শর্ত, প্রতিষ্ঠানে পেনশন ও গ্র্যাচুইটির ব্যয় অনুমোদন না নিলে এর ওপর কর আরোপের মতো বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অনেকে। সমালোচনা ছিল মোবাইল ফোনে কথা বলায় বাড়তি কর আরোপ নিয়েও।

তবে গতকাল অর্থ বিল পাসের সময় অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবের বেশিরভাগই রাখা হয়েছে। পুঁজিবাজারে ১০ শতাংশ কর দিয়ে তিন বছর বিনিয়োগ রাখার শর্তে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়। কালো টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেই যাতে সরিয়ে না নেয়, সেজন্য এ প্রস্তাব করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টরা জানান, যেহেতু এবার অন্যান্য খাতেও একই কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, ফলে নতুন শর্তের কারণে মানুষ শেয়ারবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবেন না। সম্প্রতি এসইসির নতুন চেয়ারম্যানও এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ওই প্রস্তাব প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। গতকাল অর্থ বিল পাসকালে তিন বছরের স্থলে তা কমিয়ে এক বছর করা হয়েছে।  

বর্তমানে যে কোনো ভ্যাট সংক্রান্ত বিরোধের আপিল করতে হলে তিন স্তরে বিরোধ (ডিসপিউট) ভ্যাটের ১০ শতাংশ করে মোট ৩০ শতাংশ অর্থ অগ্রিম পরিশোধ করতে হয়। প্রস্তাবে আপিলাত ট্রাইব্যুনাল ও হাইকোর্টে যাওয়ার ক্ষেত্রে আরও ২০ শতাংশ আরোপ করা হয়। গতকাল এতে সংশোধন এনে কমিশনার পর্যায়ে আপিলে ২০ শতাংশ ও হাইকোর্টে যাওয়ার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে আগের মতো ৩০ শতাংশ ঠিক থাকলেও আপিলের শুরুর ধাপে ব্যবসায়ীর ব্যয় অপেক্ষাকৃত বেশি হবে। বর্তমানে ভ্যাট আইন অনুযায়ী কাঁচামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে পরিশোধ হওয়া ভ্যাট পরবর্তীতে রেয়াত পাওয়া যায়। কিন্তু নতুন করে চার মাসের মধ্যে ওই কাঁচামাল বা মধ্যবর্তী কাঁচামাল ব্যবহার না হলে অগ্রিম পরিশোধ হওয়া ওই ভ্যাট রেয়াত নেওয়া যাবে না বলে প্রস্তাব দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের সমালোচনার মুখে গতকাল তা বাতিল করা হয়। তবে ব্যবসায়ী নেতারা আশা করছেন, বাজেট পাস হওয়ার পরও আলোচনার ভিত্তিতে বেশকিছু ইস্যুর সমাধান করা সম্ভব হবে।

অর্থ বিল পাসের আগে বাজেটের ওপর নিজের সমাপনী বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তার আগে বাজেট আলোচনায় অংশ নেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রথা অনুযায়ী, অর্থ বিলে কোনো পরিবর্তন আনতে হলে অর্থমন্ত্রীর সমাপনী বক্তব্য এবং অর্থ বিল পাসের আগে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রীকে সে বিষয়ে অনুরোধ করেন। এরপর অর্থমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ আমলে নিয়ে সেসব বিষয়ে পরিবর্তন এনে অর্থ বিল পাসের প্রস্তাব করেন। কিন্তু এবার প্রধানমন্ত্রী কোনো পরিবর্তন আনতে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করেননি।

বাজেটের ওপর বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন কিছু নয়। অতীতের সব বাজেটই বাস্তবায়ন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। এবারের বাজেটও সরকার বাস্তবায়নে সক্ষম হবে।’

পরে বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে এ বাজেট থেকে বাদ দিতে পারি নাই। কাউকে বাদ দিতে পারলে বাজেটের আকার অবশ্যই ছোট রাখা যেত, ছোট রাখা যেত বাজেট ঘাটতিও। কিন্তু সত্য যে বড় কঠিন, তাই সব জেনেশুনে আমরা এই কঠিনকেই ভালোবেসেছি।’