রাজধানীর শ্যামবাজারের ফরাশগঞ্জে বুড়িগঙ্গা নদীতে দুর্ঘটনায় তলিয়ে যাওয়া ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ রুটের মর্নিং বার্ড লঞ্চের যাত্রীরা কেবিনের জানালা দিয়ে বের হওয়ার সময়টুকুও পাননি। চাঁদপুর রুটের ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় মাত্র ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই ডুবে যায় মর্নিং বার্ড। লঞ্চটির কেবিনে থাকা যাত্রীদের হাতেগোনা দুই-একজন বের হতে পারলেও মুহূর্তের মধ্যে ডুবে যাওয়ায় বেশিরভাগই কেবিনে আটকা পড়ে প্রাণ হারান। ওই দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়াদের সঙ্গে কথা বলে এমনই তথ্য পাওয়া গেছে।
তলিয়ে যাওয়া মর্নিং বার্ড থেকে বেঁচে ফেরা ব্যবসায়ী মো. মাসুদ লঞ্চটি ডোবার মুহূর্তের বর্ণনা দেন দেশ রূপান্তরের কাছে। তিনি বলেন, ‘ঘাটে ভেড়ার জন্য আমাদের লঞ্চ সোজা আসছিল। অন্য একটা লঞ্চ তেছড়াভাবে (বাঁকা) রওনা দিছে। তেছড়াভাবে রওনা দেওয়াতে ওই লঞ্চটা বাড়ি দিছে আমাদের লঞ্চের মাঝ বরাবর। বাড়ি দেওয়ার সাথে সাথে লঞ্চটা কাইত হয়ে যায়। কয়েক হাত ঠেলে নেওয়ার পর হঠাৎ তলায় যায়। তলায় যেতে ১০ সেকেন্ডও সময় নেয় নাই। আমি কেবিনে ছিলাম। গ্লাস খুলে আমি বের হইছি। ভেতরে আমার আপন দুই মামা আফজাল শেখ ও বাচ্চু শেখ ছিলেন। তারা তো বের হতে পারেন নাই। তাদের খোঁজ করছি। কেবিনে থাকাদের বেশির ভাগই মারা গেছে।’
মাসুদ আরও বলেন, ‘রাজধানীর ইসলামপুরের গুলশান আরা সিটিতে কাপড়ের ব্যবসা করি। প্রতিদিন সকালে মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে দোকান খুলি। গত রবিবার ময়মনসিংহ থেকে আমার দুই মামা আমাদের বাসায় বেড়াতে আসেন। তাদের নিয়ে মঙ্গলবার সকালে লঞ্চের একটি কেবিনে করে ঢাকায় ফিরছিলাম। কিন্তু লঞ্চ পাড়ে ভেড়ার আগ মুহূর্তে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। লঞ্চে থাকা প্রায় ৫০ জনের মতো যাত্রী আমরা সাঁতরে উঠতে পারছি। বাকি যাত্রীরা কেউ উঠতে পারে নাই।’
গতকাল সোমবার দুর্ঘটনার পরই উদ্ধারকাজ শুরু করে ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী, নৌপুলিশ, থানা পুলিশ ও স্থানীয়রা। একসঙ্গে ৪-৫ জন ডুবুরি পানির নিচে নেমে হতাহতদের খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন। কিছুক্ষণ পরপরই একেকজন ডুবুরি মরদেহ নিয়ে পানির ওপর ভেসে ওঠেন। অবস্থা এমন দাঁড়য় যে, মরদেহ তুলে তারা যেন শেষ করতে পারছেন না। যখন একের পর এক মরদেহ উদ্ধার করে মাঝনদীতে নৌযানে সারি করে রাখা হচ্ছিল তখন প্রিয় মানুষের মৃত্যুতে স্বজনদের ধৈর্য আর বাঁধ মানেনি। তারা নৌকা নিয়ে ছুটে যান নদীতে সারি করে রাখা মরদেহের কাছে। স্বজনদের বুকভাঙা কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আশপাশ।
বিআইডব্লিউটিএর হয়ে উদ্ধারকাজ করা ডুবুরি জাহাঙ্গীর আলম শিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি সকাল ১০টার দিকে খবর পেয়ে এখানে আসি। এসে দেখি ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ড্রাইভে রয়েছে। আমাকে তারা কাজ করতে বললেন। এরপর আমি নামলাম। লঞ্চটি ৬০-৭০ ফুট পানির নিচে কাত হয়ে রয়েছে। একটু তল্লাশি করার পরই দুটি মরদেহ পেলাম। এরপর আবার যখন যাই তখন দেখি লঞ্চটি উপুড় হয়ে আছে। এরপর একে একে শিশুসহ আরও সাতটি মরদেহ উদ্ধার করে নিয়ে আসি। এর মধ্যে দুজন নারী।’
আরেক বেসরকারি ডুবুরি মো. কালু ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কাজ করছিলেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পানির নিচে লঞ্চটি উপুড় হয়ে আছে। আমি দুটি লাশ লঞ্চের বাইরে পেয়েছি। ধারণা করছি, কিছু লাশ হয়তো বের হয়েছে। লঞ্চের ভেতরে আরও লাশ রয়েছে।’
নজরুল ইসলাম নামে আরেক ডুবুরি বলেন, ‘আমি দুটি লাশ উদ্ধার করেছি। ভেতরে আর লাশ দেখলাম না। তবে লঞ্চটি উপুড় হয়ে রয়েছে।’
লঞ্চডুবির সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা দুইতলা মর্নিং বার্ড লঞ্চটি সদরঘাট কাঠপট্টি ঘাটে ভেড়ানোর আগ মুহূর্তে চাঁদপুরগামী ময়ূর-২ লঞ্চটি ব্যাগার দেওয়ার সময় (পেছন দিকে গিয়ে আবার সামনে অগ্রসর হওয়া) ধাক্কা দেয়। ময়ূর-২ লঞ্চটি পেছানোর সময় মর্নিং বার্ড লঞ্চটিকে ধাক্কা দিয়ে কয়েক হাত নিয়ে যাওয়ার পরই তা ডুবে যায়। ছোট্ট মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর তাৎক্ষণিক আবার সামনের দিকে চলা শুরু করে ময়ূর-২ লঞ্চটি।