দেশের অন্যতম বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ ট্রান্সকমের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান। ইলেকট্রনিকস, খাদ্যপণ্য, ওষুধ, চা, মিডিয়াসহ বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে রয়েছে ট্রান্সকমের ব্যবসা। ১৯৭২ সালে ব্যবসা শুরু করেছিলেন ৫ জন নিয়ে। ট্রান্সকম গ্রুপে এখন কাজ করছেন ১০ হাজারের বেশি মানুষ। আন্তর্জাতিক ফুড চেইন পিৎজা হাট ও কেএফসি এবং পেপসির বাংলাদেশ ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক ছিলেন। গতকাল বার্ধক্যজনিত কারণে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নিজ বাড়িতে মারা গেছেন তিনি।
ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতা, সুনাম আর সততার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১২ সালে তিনি পান বিজনেস ফর পিস অ্যাওয়ার্ড, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের জগতে নোবেল হিসেবে খ্যাত। এ ছাড়া লতিফুর রহমান প্রথম আলো পত্রিকার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মিডিয়াস্টার লিমিটেড এবং ডেইলি স্টারের পরিচালনা প্রতিষ্ঠান মিডিয়াওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন।
আশির দশকে লতিফুর রহমানের ট্রান্সকম ছিল বাংলাদেশে নেসলের একমাত্র আমদানিকারক ও পরিবেশক। নব্বইয়ের দশকে লতিফুর মার্কিন ফার্মাসিটিক্যালস কোম্পানি স্মিথ, ক্লাইন অ্যান্ড ফ্রেঞ্চের বাংলাদেশ ইউনিটের ব্যবসা কিনে নেন, যা এখন এসকেএফ নামে পরিচিত।
১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে ফিলিপস ইলেকট্রনিকস ও বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবসা কিনে নিয়ে ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকস ও বাংলাদেশ ল্যাম্পসের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে পিৎজা হাট, কেএফসি, পেপসিকোর স্থানীয় পার্টনার ট্রান্সকম।
কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনে নেতৃত্ব দেওয়া লতিফুর রহমান মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের (এমসিসিআই) সাতবারের এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন দুইবার। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সহসভাপতি ছাড়াও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ চা অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী কমিটিতে ছিলেন তিনি।
নেসলে বাংলাদেশ, হোলসিম বাংলাদেশ এবং ন্যাশনাল হাউজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করা লতিফুর রহমান লিনডে বাংলাদেশের (সাবেক ব্রিটিশ অক্সিজেন কোম্পানি) পরিচালক এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও ব্র্যাকের গভর্নিং বোর্ডেরও সদস্য ছিলেন তিনি।
১৯৪৫ সালের ২৮ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন লতিফুর রহমান। পাটের বড় ব্যবসা ছিল। পরিবারে আর্থিক সমস্যা ছিল না। বাঙালির তৈরি প্রথম পাটকলটি ছিল তাদেরই। ছিল চা-বাগান। তার স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, ১৭ বছর বয়সেই নিজের একটা ছোট ফিয়াট গাড়ি ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর সব শুরু করতে হয়েছে নতুনভাবে।
লতিফুর রহমানের দাদা খান বাহাদুর ওয়ালিউর রহমানের জন্ম চৌদ্দগ্রামের চিওড়া গ্রামে। কোনো একটা অসুখের কারণে দাদাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল মামার কাছে, জলপাইগুড়িতে। সেখানেই আইন পাস করে জলপাইগুড়ি বারে আইনি পেশা শুরু করেছিলেন। ১৮৮৫ সালে সেখানে কিছু জমি কিনে চা-বাগান শুরু করেন। তখন চা-বাগানের মালিক ছিল মূলত ব্রিটিশরা। তার দাদার চা-বাগানই ছিল স্থানীয় কারও মালিকানার প্রথম বাগান। খান বাহাদুর উপাধি পেয়েছিলেন তিনি। লতিফুর রহমানের বাবা মুজিবুর রহমানের জন্ম সেখানেই। কলকাতায় লেখাপড়া শেষে আসামের তেজপুরে ফিরে সেখানেই জমি কিনে চা-বাগান তৈরি করেন। তিনিও খান বাহাদুর উপাধি পান। দেশভাগের পর সবাই চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৫১ বা ৫২ সালের দিকে সিলেটে নতুন করে চা-বাগান করেন। পাটের ব্যবসাও শুরু করেন। ভৈরব-আশুগঞ্জ এলাকাজুড়ে পাটের ব্যবসা ছিল।
ঢাকার গেন্ডারিয়ায় থাকতেন লতিফুর রহমানের পরিবার। ছোটবেলায় পড়তেন সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুলে। পরে ভর্তি হন হলিক্রস স্কুলে। সে সময় হলিক্রসে ছেলেরাও পড়ত। ১৯৫৬ সালে পাঠিয়ে দেওয়া হয় শিলংয়ে। সেন্ট এডমন্ডস স্কুলে ভর্তি হলেন ক্লাস থ্রিতে। সেখান থেকে কলকাতা সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গাÑ সব মিলিয়ে সময়টা বেশ উত্তাল। ঢাকায় ফিরে এলেন লতিফুর রহমান। এসে ঢুকে গেলেন পাটের ব্যবসায়। বাবা তখন চাঁদপুরে গড়ে তুলেছেন ডব্লিউ রহমান জুট মিল। ১৯৬৩ সালে কাজ শুরু হলেও উৎপাদন শুরু হলো ১৯৬৬ সালে। সেখানে লতিফুর রহমান ট্রেইনি হিসেবে কাজ শুরু করেন ১৯৬৬ সালে। দেড় বছর কাজ শেখার পর একজন নির্বাহী হিসেবে যোগ দেন। প্রশাসনের কাজকর্ম দেখতেন। এভাবেই চলে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর সব পাল্টে গেল।
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সবকিছু জাতীয়করণ করা হয়। এর মধ্যে পাটকলও ছিল। কেবল চা-শিল্পে হাত দেওয়া হয়নি। তখন বেশির ভাগ চা-শিল্পের মালিকানা ছিল ব্রিটিশদের হাতে। এ কারণেই হয়তো জাতীয়করণের আওতায় এই শিল্প পড়েনি। সে সময় চা পুরোটাই যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। বাইরের সঙ্গে ব্যবসা করার কোনো সুযোগ ছিল না, কীভাবে চা রপ্তানি করতে হয়, তা-ও জানা ছিল না। বাড়ি, চা-বাগান থাকলেও হাতে নগদ টাকা ছিল না। মতিঝিলে একটা অফিস ছিল। জাতীয়করণ করায় অফিসের ফার্নিচারও সরকারি সম্পদ হয়ে গেল। এক হাজার বর্গফুটের সেই অফিসে ফার্নিচারও থাকল না। জজ কোর্টের পেছনে তখন ফার্নিচার ভাড়া দেওয়ার দোকান থেকে প্রয়োজনীয় কিছু ফার্নিচার ভাড়া করে অফিস চালাতে লাগলেন। বেশ অবস্থাপন্ন ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ সবকিছু চলে যেতে পারে। এটাই তার জীবনের একটা বড় শিক্ষা, বলে স্মৃতিচারণে জানিয়েছিলেন।
এই জীবনেরও পরিবর্তন এনেছিলেন লতিফুর রহমান। ১৯৭২ সালের শেষের দিকে রেনে বারনার নামে এক সুইস ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাকে নিয়ে গেলেন চা-বাগানে। বাগানের অবস্থা তখন করুণ। খোলা পড়ে আছে অবিক্রীত সব চা। সব দেখে দেশে ফিরে যোগাযোগ করলেন সেই সুইস ভদ্রলোক। তখন পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে হতো সরকারি সংস্থা টিসিবির মাধ্যমে। সুতরাং নিজে থেকে কিছু করার উপায় ছিল না। পণ্যের বিনিময়ে পণ্য, অর্থাৎ বার্টার বা কাউন্টার ট্রেডের ব্যবস্থা ছিল। তা জানতেন না লতিফুর রহমান। রেনে বারনার আমাকে জানালেন, বাংলাদেশ বিদেশ থেকে কীটনাশক কিনতে চায়। চায়ের সঙ্গে কীটনাশকের বার্টার ট্রেড হতে পারে। অর্থাৎ চায়ের বিনিময়ে কীটনাশক দেবে ওরা। জার্মানির বায়ার কোম্পানি কীটনাশক বিক্রি করবে। এভাবেই শুরু হলো চা রপ্তানির কাজ। আর এর জন্য গড়ে তোলা হলো নতুন এক কোম্পানি টি হোল্ডিংস লিমিটেড। এর পরই তারা নেদারল্যান্ডসের কোম্পানি ভ্যান রিস বিভির প্রতিনিধি হলেন। উত্তরা ব্যাংক থেকে ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বড় পরিসরে শুরু করলেন ব্যবসা।
কঠিন একটা সময়ে নিজের অবস্থার পরিবর্তন ঘটলেও লতিফুর রহমানের মনোজগতে এর ছাপ রয়ে গেল। বুঝলেন, অর্থই সবকিছু নয়। হঠাৎ সব চলে যেতে পারে। আরেকটা ভাবনা এলো, কোনো স্থায়ী সম্পদে আর কখনো বড় বিনিয়োগ করা যাবে না। স্থায়ী সম্পদের বদলে গড়লেন শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
৫০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ নিয়ে নতুন করে শুরু করেছিলেন তিনি। এখন এই গ্রুপের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি। তিনি এমনভাবে প্রতিষ্ঠান গড়তে চাইতেন, যা ১০০ বছর পরও টিকে থাকে।
১০০ বছর টিকে থাকার জন্য নিজস্ব কিছু ভাবনাও ছিল লতিফুর রহমানের। আর সেটি হচ্ছে আধুনিক ব্যবস্থাপনা। প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার লেনদেন হয়। কিন্তু একটি চেকেও তিনি নিজে সই করতেন না। বলতেন, ‘আমার নীতি হচ্ছে, সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক জায়গায় নিয়ে এসে তাকেই পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে। তাকে সম্মান দিতে হবে। আমার প্রতিষ্ঠান সেভাবেই চলে। এভাবে না চললে তো সব প্রতিষ্ঠান পারিবারিক প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, ব্যবস্থাপনার মানও হতে হবে বিশ্বমানের। আমি সেভাবেই চেষ্টা করছি।’