ঔষধাগারের দুর্নীতির তদন্ত ও বিচার জরুরি

করোনাভাইরাস মহামারী কেবল দেশের স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতাগুলোই সামনে আনেনি, স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলোও সামনে নিয়ে এসেছে।  মহামারীর কালে সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং মহামারী মোকাবিলায় যথাযথ দিকনির্দেশনা দিয়ে জনগণকে পরিচালিত করার কথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু দেখা গেল করোনার পরীক্ষা আর চিকিৎসা দেওয়া নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিজেই দিশাহীন। এসবের সমালোচনায় যখন সারা দেশে তোলপাড় চলছে তখনই একে একে সামনে আসতে থাকে মানহীন পিপিই, নকল এন-৯৫ মাস্কসহ স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় নানা দুর্নীতির কথা। অভিযোগ ওঠে, চিকিৎসকদের মানহীন ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এসব কেনাকাটায় সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের যোগসাজশের অভিযোগও ওঠে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়ম খতিয়ে দেখার তাগিদও আসে। এভাবেই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসার মতো সামনে এলো দেশের স্বাস্থ্য খাতের সব ধরনের কেনাকাটার দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে (সিএমএসডি) ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ।              

বুধবার দেশ রূপান্তরে ১৯ কর্মকর্তার ১৫ জনই ‘দুর্নীতিবাজ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালনা ও কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু কেনাকাটায় দুর্নীতিই নয়, সংস্থাটি পরিচালনার ক্ষেত্রেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। সংস্থাটির অর্গানোগ্রামে ‘চিফ কো-অর্ডিনেটর’ বলে কোনো পদ নেই।  কিন্তু সেখানে এমন একটি ‘পদ সৃষ্টি করে’ দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করছেন ডা. মো. জিয়াউল হক।  আবার রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হওয়া সত্ত্বেও সেখানে সৃষ্টি করা হয়নি প্রশাসন, উন্নয়ন, পরিকল্পনা, অডিটসহ সংশ্লিষ্ট কোনো বিভাগ। তদবিরের জোরে যারা সংস্থাটিতে পোস্টিং বাগিয়ে নেন তারা সবাই যুক্ত হন ‘প্রকিউরমেন্ট’ অর্থাৎ কেনাকাটায়।  এমন কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন এ দপ্তরে অবস্থান করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট। আর তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে মিলেমিশে হাজার কোটি টাকার উপকরণ কিনেছেন। কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এসব তথ্য পাওয়া গেছে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে।

দেশের সব সরকারি হাসপাতালের সেবাসামগ্রী কেনাকাটা করে থাকে সিএমএসডি।  করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়ার ফলে দেশের স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটাও বেড়ে যায়। ফলে অনেকটাই আড়ালে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান সিএমএসডি নানা কারণে আলোচনায় আসে। সেখানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থার নজরদারিও বাড়তে থাকে। দেশ রূপান্তরের প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, সিএমএসডির কর্মকর্তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টরদের সঙ্গে মিলেমিশে অনিয়মগুলো করে থাকেন। সেখানকার একজন লাইন ডিরেক্টর তার পছন্দের কিছু কর্মকর্তাকে দিয়ে নিজেদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওই কর্মকর্তা এর আগে দীর্ঘদিন সিএমএসডিতে ছিলেন। ফলে এখানে মালামাল সরবরাহ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তার সখ্য রয়েছে। অবশ্য সবশেষ এন-৯৫ মাস্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার পর সংস্থাটির সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি পরিচালককে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর গত ২২ মে সিএমএসডির পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় অতিরিক্ত সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামানকে।  অন্যসব কর্মকর্তার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, কেনাকাটার সঙ্গে জড়িত ১৯ কর্মকর্তার মধ্যে ১৫ জনই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। একটি দায়িত্বশীল সংস্থা তদন্তে নেমে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ১৫ কর্মকর্তাকে চিহ্নিতও করে। আর এসব কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কেনাকাটা সংক্রান্ত সব দাপ্তরিক কাগজপত্র চেয়ে সিএমএসডি পরিচালককে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের নতুন পরিচালক বলেছেন, মহামারী পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এবং প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সব বিবিবিধান মেনে কাজ শুরু করেছেন তিনি। এখন সেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হওয়া জরুরি। কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের কেনাকাটায় রাষ্ট্রীয় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল বা ‘পিপিআর’ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসমূহকে কোনো অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না সেসব উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে বেশিরভাগ মানুষই এখনো সরকারি স্বাস্থ্যসেবার চেয়ে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভরশীল।  তার ওপর জনগণের ট্যাক্সের টাকায় জনগণের স্বাস্থ্যসেবার জন্য কেনাকাটায় যারা দুর্নীতি করেন তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার। স্মরণকালের ভয়াবহতম এই মহামারীর কালে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে মানুষের তুমুল অসন্তোষ আর ক্ষোভের ছোঁয়া এখন জাতীয় সংসদে গিয়েও পৌঁছেছে।  স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অপসারণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সংসদের এই আলোচনাকে ইতিবাচক বলতে হবে।  তবে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত বিভাগ ও দপ্তরসমূহের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল সংসদের এই আলোচনা সত্যিকার অর্থে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। সেজন্য সব অনিয়ম ও দুর্নীতির যথাযথ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।