খুলনায় প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে যখন প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা, তখন জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান সিভিল সার্জন সুজাত আহমেদ কর্মস্থল ছেড়ে সপ্তাহের তিন দিন ব্যস্ত থাকছেন ১০০ কিলোমিটার দূরবর্তী কয়রা উপজেলায় নিজের ব্যক্তিগত চেম্বারে। শুধু তাই নয়, সেখানকার সরকারি কোয়ার্টারের একটি কক্ষে গড়ে তোলা নিজস্ব চেম্বারে রোগী দেখার পাশাপাশি করছেন অস্ত্রোপচার। যদিও সরকারি চিকিৎসকরা নিজ কর্মস্থলের বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না বলে গত বছরই নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে এখানেই শেষ নয়, সিভিল সার্জন সুজাত আহমেদ অচেতনবিদ ছাড়াই নিজ চেম্বারে অস্ত্রোপচারের পর সেই রোগীদের থাকতে দেন কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যায়। অনেক সময় আবার নিজের ব্যক্তিগত রোগীদের জন্য ব্যবহার করেন হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার। ওই রোগীদের ওষুধও দেওয়া হয় হাসপাতাল থেকে। তবে এজন্য কোনো টাকা জমা হয় না হাসপাতালের তহবিলে। আয়ের পুরো অংশই যায় তার পকেটে।
এদিকে করোনা সচেতনতামূলক একটি ভিডিও ক্লিপ তৈরির পর তা ফেইসবুকসহ স্থানীয় কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রচার করেন সুজাত আহমেদ, যেখানে জাতীয় সংগীতকে অবমাননা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
খুলনার সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুজাত আহমেদ খুলনার সিভিল সার্জন হিসেবে যোগদান করেন গত বছর ২৪ ডিসেম্বর। এর আগে তিনি কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ছিলেন। তখন থেকেই তিনি সেখানে নিজের বাসস্থানের (সরকারি কোয়ার্টার) একটি কক্ষে নিজস্ব চেম্বার গড়ে তোলেন। সেখানে নিয়মিত রোগী দেখা ও অস্ত্রোপচার করে আসছেন। সিভিল সার্জন হওয়ার পরও যার একটুও হেরফের হয়নি। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতেও কয়রার চেম্বারে সপ্তাহে তিন দিন (বৃহস্পতি থেকে শনিবার) সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টাকা নিয়ে রোগী দেখছেন। ভিজিট হিসেবে রোগীপ্রতি ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেন তিনি। সিজারের জন্য ৫-৭ হাজার এবং অন্যান্য অস্ত্রোপচারের জন্য ৪-৫ হাজার টাকা করে নেন। তবে সরাসরি টাকা নেন না। এ কাজের জন্য চুক্তি করেন কয়রা হাসপাতালের আউটসোর্সিং কর্মচারী পলাশ, নৈশপ্রহরী আবদুর রশিদ এবং নার্স শ্যামলী ও চায়না। কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার প্যাডেই রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন সুজাত। তবে নিজের অপরাধ ঢাকতে সেই ব্যবস্থাপত্রে কোনো তারিখ লেখেন না। এছাড়া সপ্তাহের ওই তিন দিন কমবেশি পাইকগাছার শাপলা ক্লিনিক ও কয়রার সুন্দরবন ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার করেন। নানা অনিয়ম ও বেশ কয়েকজন রোগীর মৃত্যুর কারণে শাপলা ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সুজাত আহমেদ সিভিল সার্জন হওয়ার পর সেটি আবার চালু করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কয়রার ব্যক্তিগত চেম্বারে সপ্তাহে তিন দিন রোগী দেখতে বেরিয়ে পড়েন সুজাত আহমেদ। প্রতি বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় তিনি কয়রার উদ্দেশে রওনা হন, খুলনায় ফিরে আসেন রবিবার দুপুরে। এ হিসাবে সপ্তাহের প্রায় চার দিন তিনি বাইরেই কাটান। তবে ওই সফরকে তিনি হাসপাতাল পরিদর্শন বলে চালিয়ে দেন।
কয়রা হাসপাতালের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে এক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অচেতনবিদ ছিলেন। তিনি থাকাবস্থায় এ হাসপাতালে আটটির মতো অপারেশন করা হয়েছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। কিন্তু স্যার (সিভিল সার্জন) তাকে খুলনায় নিয়ে গেছেন। যাতে আমরা আর অপারেশন না করতে পারি। তাছাড়া তিনি এ হাসপাতাল থেকে দুই-তিনজন চিকিৎসক নিয়ে গেছেন তার কার্যালয়ে। সেখানে তাদের কাজ শুধু মেইল চেক করা আর পাঠানো। অথচ তারা এখানে থাকলে করোনার সময় বেশ কাজ হতো। তিনি নিজের বাণিজ্য চালু রাখতে এ হাসপাতালে নানারকম অনিয়ম-দুর্নীতি চালু করেছেন।’
অন্যদিকে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে করোনার সময় কার্যালয় ত্যাগ করা যাবে না। কিন্তু স্যার তো এটা মানতে নারাজ। সপ্তাহে তিন দিন কয়রায় নিজস্ব চেম্বারে রোগী দেখছেন। এ তিন দিনকে তিনি হাসপাতাল পরিদর্শন হিসেবে চালিয়ে দেন। এ সময় অনেক জরুরি কাজ করা সম্ভব হয় না। আর সে কারণে অফিসের অনেক কাজে ঝামেলার সৃষ্টি হচ্ছে।’
এদিকে সম্প্রতি করোনা সচেতনতামূলক একটি ভিডিও ক্লিপ তৈরি করে তা ফেইসবুকসহ স্থনীয় কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রচার করছেন সুজাত আহমেদ। ওই ভিডিওতে জাতীয় পতাকা উড়ছে এবং বাজছে জাতীয় সংগীত। ঠিক সেই মুহূর্তে করোনা সচেতনতার জন্য নানারকম নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। যা বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী অপরাধ বলে অভিযোগ করেছেন খুলনার সংস্কৃতিকর্মীরা।
গণশিল্পী সংস্থার কেন্দ্রীয় প্রধান সংগঠক অ্যাডভোকেট মিনা মিজানুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাকালীন সময়ে জনসচেতনতামূলক ভিডিওটিতে ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রথমে ও পরে “আমরা করবো জয়” গানটির মিউজিকের সঙ্গে মধ্যখানে মিউজিকে আমাদের দেশের জাতীয় সংগীতের যে পরিবেশনা সংযোজন করা হয়েছে তা অবশ্যই নিন্দনীয়। কারণ আমরা জানি সাংবিধানিকভাবে কোথায় জাতীয় সংগীত পরিবেশিত বা ব্যবহার করতে হবে তা বিধি হয়ে লিপিবদ্ধ আছে। যত্রতত্র এই পবিত্র জাতীয় সংগীত বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে বাজানো যায় না। সব ভালো কাজের জন্য জাতীয় সংগীত প্রয়োজ্য নয়, জাতীয় পতাকা বা জাতীয় সংগীত আমাদের পবিত্র আমানত, সে কারণে সবার দায়িত্বও রয়ে গেছে এর পবিত্রতা রক্ষার।’
তার বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন সুজাত আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখানোর জন্য জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত ব্যবহার করা হয়েছে। আর শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে রোগী দেখি। গত ২২ বছর ধরে আমি কয়রায় রোগী দেখি। তাই ওই এলাকার রোগীদের আমার প্রতি একটি বিশ্বাস আছে। তাই যেতে হয়। তাছাড়া আমার ১২টি ভিজিট রয়েছে। তাই যেতে হয়।’ তবে পরিদর্শন শুধু কয়রা ও পাইকগাছাতে কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কয়রা, পাইকগাছা ও তেরখাদা এলাকার মানুষ বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে তাই।’ আর নিজের ব্যক্তিগত রোগীদের জন্য সরকারি সুবিধা ব্যবহারের অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, ‘আমি সরকারি লোক তাই অপারেশন থিয়েটার ও হাসপাতালের কোয়ার্টার ব্যবহার করি।’
সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. মনজুরুল মুরশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনত তিনি কয়রা গিয়ে সরকারি হাসপাতাল ব্যবহার করে ব্যক্তিগত কাজ করতে পারেন না। তাছাড়া করোনার সময় কেউ নিজের অফিস ত্যাগ করতে পারেন না। এ ব্যাপারে আপনি জানালেন, খোঁজখবর করে ব্যবস্থা নেব। আর ওই ভিডিও আমি দেখিনি, দেখে ব্যবস্থা নেব।’