বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের ঢেউ এবার লেগেছে মার্ক জাকারবার্গের গায়ে। বর্ণবাদ-ইস্যুতে তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শীর্ষ কোম্পানিগুলো ফেইসবুক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বিজ্ঞাপন বন্ধ হচ্ছে একে একে। সব মিলিয়ে ফেইসবুকের অবস্থা এখন বেশ নাজুক। লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা
ঘটনার শুরু
২৫ মে আমেরিকার মিনেসোটার মিনিয়াপোলিস শহরে পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড হত্যার পর থেকে ফুঁসে উঠেছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। বর্ণবাদ-বিরোধী আন্দোলন চরম আকার ধারণ করেছিল। আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন শহরেও দিনের পর দিন চলেছে প্রতিবাদ। বিক্ষোভের মুখে পরিবর্তন করা হয় অনেক আগে থেকে প্রচলিত সিদ্ধান্তও। স্বাভাবিকভাবে আন্দোলন যেভাবে চলছিল তাতে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যদি সমর্থন দিতেন, তবে আন্দোলন শেষে পরিস্থিতি হয়ত অন্যদিকে গড়াত। তবে আমেরিকার মতো দেশের প্রেসিডেন্ট যখন বিক্ষোভকারীদের সমর্থনের বদলে তাদের ভেতর ক্রুদ্ধতা জাগিয়ে তোলেন তখন সেই আন্দোলনের জল কতদূর গড়াবে আর তা থেকে কারা কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেটি অবশ্য বলা কঠিন। ফ্লয়েড মারা যাওয়ার পর আন্দোলন যখন তীব্র তখন বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফেইসবুক এবং টুইটারে লিখেছিলেন, ‘লুটপাট শুরু হলে গুলিও শুরু হবে’। তার এই একটি কথাই বিক্ষোভকারীদের একত্রিত তো করেছেই, নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের হর্তাকর্তাদেরও। ট্রাম্পের বিতর্কিত এই মন্তব্য ফেইসবুক না সরানোয় জাকারবার্গকে সহ্য করতে হচ্ছে কঠিন পরিস্থিতি। কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলতে ফেইসবুকের নাম আসে সবার আগে, আর ধকল সবচেয়ে বেশি যায় তাদের ওপর দিয়েই। সেই পরিস্থিতির চাপ এতটাই জোরালো হয়ে উঠেছে যে, ফেইসবুকে বিজ্ঞাপন দেওয়া থেকে সরে এসেছে বিশ্বের শীর্ষ কোম্পানিসহ অন্তত ১০০ কোম্পানি।
ফেইসবুকে বিজ্ঞাপন বয়কট
কয়েক বছর ধরে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সব দর্শকের কাছে পৌঁছানোর জন্য বড় এবং ছোট ব্যবসায়ীদের অপরিহার্য মাধ্যম ফেইসবুক। ডিজিটাল বিজ্ঞাপন প্রকাশের জন্য স্বাভাবিকভাবেই এই মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল দিন দিন। তবে বর্ণবাদ নিয়ে বিতর্ক শুরু হলেও সেই বিতর্ক দূর করতে ফেইসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের মধ্যে তেমন কোনো চেষ্টা দেখা যায়নি। আর এতে আগুনে ঘি ঢালার মতো বর্ণবাদবিরোধী বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনের সারির মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এই আন্দোলনে যোগ দেয়। আন্দোলনে যোগ দেয় কালার অব চেঞ্জ, ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অব কালার্ড পিপল, সিøপিং জায়েন্ট, ফ্রি প্রেস, অ্যান্টি ডিফ্যামেশন লিগ, কমন সেন্স মিডিয়া। তাদের অভিযোগ, অনলাইনে বর্ণবাদী কনটেন্ট প্রচার রোধে ফেইসবুকের মতো বড় বড় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো কোনো ভূমিকা রাখছে না। এই আন্দোলন ‘স্টপ হেট ফর প্রফিট’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। আন্দোলনের ওয়েবসাইটে যে গুরুতর অভিযোগটি এসেছে সেটি হচ্ছে, আমেরিকায় জর্জ ফ্লয়েড, ব্রেরোনা টেলর, টনি ম্যাকডেড, আহমেদ আরবেরি, রেশার্ড ব্রুকস এবং আরও অনেকের ঘটনায় বর্ণ সম্পর্কিত ন্যায় বিচারের যে লড়াই সামনে এসেছে সে সংক্রান্ত প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে হিংসা প্রণোদনা অনুমোদন করেছে ফেইসবুক। মূলত ফেইসবুককে প্রণোদনাকারী হিসেবেই অভিযোগ তোলা হচ্ছে জোরেশোরে। বিজ্ঞাপন বন্ধ রাখার ব্যাপারে আন্দোলনকারীরা ব্যবসায়ীদের অনুরোধ জানিয়ে বলেছে, ‘ফেইসবুকের ৭০ বিলিয়ন আয়ের ৯৯ শতাংশ আসে বিজ্ঞাপন থেকে। চলুন আমরা ফেইসবুককে একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠাই যে, ঘৃণা, ধর্মান্ধতা, বর্ণবাদ নিয়ে হিংসা প্রচারের মাধ্যমে তাদের কোনো লাভ করতে দেওয়া হবে না।’
২০২০ সালে মার্কিন নির্বাচনের প্রচারের দায়িত্বে থাকা সংগঠকরা, মার্কিন আইসক্রিম নির্মাতা সংস্থা বেন অ্যান্ড জেরিস, ফিল্ম পরিবেশক ম্যাগনোলিয়া পিকচার্স ও আউটডোর অ্যাপারেল ব্র্যান্ড নর্থফেস এরা সবাই বিজ্ঞাপন বয়কটের আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। তবে ফেইসবুকের মডারেশন নীতি নিয়ে আলোচনা কেন্দ্রে চলে আসে যখন টেলিকম সংস্থা ভেরিজোন বিজ্ঞাপন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভেরিজোন একটি খোলা চিঠিতে দেখিয়েছে ফেইসবুকে ঘৃণাপূর্ণ একটি অ্যান্টিসেমেটিক পোস্টের পাশেই তাদের একটি বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হচ্ছে। একই ঘটনা ঘটেছে আরও কয়েকটি কোম্পানির ক্ষেত্রে। তখনই ভেরিজোনসহ ইউনিলিভার, লিভাইসের মতো সংস্থাগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের অবস্থান নিয়ে ফের আলোচনা করছে। এরই সূত্র ধরে ফেইসবুকে বিজ্ঞাপন বন্ধের ঘোষণা এসেছে। এই ক্যাম্পেইনের তরফ থেকে আশা করা হচ্ছে, ফেইসবুক তাদের নীতি বদলাবে, বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ ব্যবহারকারীদের কাছে একটি সুরক্ষিত ও পক্ষপাতহীন অনলাইন অভিজ্ঞতা তুলে ধরবে। ক্যাম্পেইন থেকে ফেইসবুকে একটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে, যেসব মানুষ বর্ণবাদ ও বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন তাদের আরও সমর্থন দেওয়া, ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট থেকে আয় হয় এমন বিজ্ঞাপন বন্ধ করা এবং প্রাইভেট গ্রুপে নিরাপত্তা বৃদ্ধি।
যেসব কোম্পানি বিজ্ঞাপন বন্ধ করেছে
আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে ফেইসবুক থেকে ইতিমধ্যে সরে আসা শুরু করেছে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। ১০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান ফেইসবুক এবং ইন্সটাগ্রামে কোনো ধরনের বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে। এদের মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যদিও ফেইসবুক বর্জনের কথা বলেনি কিন্তু বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ রেখেছে। এই তালিকায় আছে ওয়ালমার্ট, আমেরিকান এক্সপ্রেস, হোম ডিপটের নাম। গত বছর পর্যন্ত ফেইসবুককে সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন দেওয়া ২৫টি কোম্পানির মধ্যে তিনটি কোম্পানি ছিল মাইক্রোসফট, স্টারবাকস এবং পিফিজার। তারা সরাসরি ঘোষণা দিয়েই জানিয়েছে ফেইসবুকে মার্কেটিং করবে না। এই ২৫টি কোম্পানি থেকে ফেইসবুকের গতবারের আয় ছিল ২০০ কোটি টাকা অর্থাৎ ২০১৯ সালে ফেইসবুকের পুরো আয়ের প্রায় ৩ শতাংশ। ফেইসবুকের এখন যে অবস্থান তাতে করে তাদের যে ক্ষতি হবে তা হয়ত খুব বেশি কিছু নয়। তবু যেটুকু ক্ষতি হয়েছে তার দায়ভার কিছুটা হলেও ফেইসবুক প্রতিষ্ঠাতার ওপর বর্তায়। কারণ তিনি নীরব ছিলেন বলেই প্রতিষ্ঠানকে এত বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। দায় কিছুটা নিজের কাঁধে নিয়েই তাই হয়ত মার্ক জাকারবার্গ তার কর্মীদের বলেছেন, ‘আমার বিশ্বাস, খুব দ্রুত বিজ্ঞাপনদাতারা এই প্ল্যাটফর্মে আবার ফিরে আসবেন।’ টোম চ্যানিক নামে ফেইসবুকের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘আমরা প্রতিটি বিষয়কে খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। আমাদের সঙ্গে যারা কাজ করছেন তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। আমাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে ঘৃণাযুক্ত সকল মন্তব্য আমরা সরিয়ে ফেলব, কারণ এতে করে আমাদের আসলে কোনো লাভ হচ্ছে না। আমরা নীতির ওপর ভিত্তি করে নীতি বদলাই, রাজস্ব চাপে নয়।’ ফেইসবুক থেকে এই মন্তব্য জানানোর পর ওয়ালমার্ট, উবার, নেটফ্লিক্স, ডমইনো’স, আমেরিকান এক্সপ্রেসসহ শীর্ষ ২৫ কোম্পানি অবশ্য কোনো মন্তব্য জানায়নি।
হোম ডিপটের ২০১৯ সালে ফেইসবুকে বিজ্ঞাপন ছিল ১৭৮ মিলিয়ন ডলারের। শুরুতে তারা কোনো বিজ্ঞাপন দেবে না বলে জানালেও পরে আবার বলেছে জাকারবার্গ তার সিদ্ধান্ত বদল নিয়ে যা বলেছেন সেই অনুযায়ী যদি কাজ করেন, তবে তারা বিজ্ঞাপন দেওয়ার বিষয়ে আবার ভেবে দেখবে। প্রক্টর এন্ড গ্যাম্বল গত বছর ফেইসবুককে বিজ্ঞাপন দিয়েছে ৯২ মিলিয়ন ডলারের। তারাও বলছে, ফেইসবুক যদি তাদের নীতি ধরে রাখতে না পারে, তবে সেখান থেকে তারা নির্দ্বিধায় বের হয়ে আসবে। অবশ্য ফেইসবুকের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছে কিছু প্রতিষ্ঠান। ওয়েলস ফারগো প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা তাদের গ্রাহকদের জন্য যেটা সবচেয়ে ভালো সেটাই করবে। ফেইসবুক থেকে যদি তাদের গ্রাহক বিজ্ঞাপন পেয়ে সন্তুষ্ট হয়, তবে সেটিই তারা করবে। কিন্তু তারা চায় ফেইসবুক দ্রুত ধর্মান্ধতা, বর্ণবাদ এবং ইহুদিবিদ্বেষী মন্তব্যগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক। এছাড়াও কানাডিয়ান পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান আর্কটেরিক্স, আইসক্রিম কোম্পানি বেন অ্যান্ড জেরি’স, মার্কিন খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সান্তোরি বেভারেজ অ্যান্ড ফুড লিমিটেড, মার্কিন খুচরা পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এডি বায়ার, জনপ্রিয় চকোলেট ব্র্যান্ড হার্শিস, জনপ্রিয় অটোমোবাইল প্রতিষ্ঠান হোন্ডা, বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাকপ্যাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জ্যানস্পোর্ট, মার্কিন ডেনিম পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান লেভি স্ট্রস অ্যান্ড কোম্পানি, প্রথম হলিউড স্টুডিও ম্যাগনোলিয়া পিকচারস, আমেরিকান গার্মেন্টস পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান পাতাগোনিয়া, গার্মেন্টস পোশাক প্রস্তুতকারক বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান দ্য নর্থ ফেস, পাসওয়ার্ড ম্যানেজার অ্যাপ কোম্পানি ড্যাশলেন, কোকাকোলাসহ অনেক শীর্ষ প্রতিষ্ঠান জুলাই মাস জুড়ে ফেইসবুক ও ইন্সটাগ্রামে বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ রাখবে।
বড় প্রায় ১০০টি ব্র্যান্ডেড কোম্পানি থেকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ফেইসবুকের আয় ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ফেইসবুকের মোট আয়ের মাত্র ৬ শতাংশ। বড় কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি ফেইসবুকের বিজ্ঞাপন রাজস্বের বেশিরভাগই কিন্তু আসে হাজার হাজার ছোট বা মাঝারি আকারের ব্যবসা থেকে। এই মাঝারি কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগই ফেইসবুক বয়কটের ডাকে সাড়া দেয়নি। বিজ্ঞাপনী সংস্থা ডিজিটাল হুইস্কির হেড অব স্ট্র্যাটেজি ম্যাথ মরিসন বলেন, ‘অনেক মাঝারি আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে যারা আসলে ফেইসবুকে বিজ্ঞাপন না দেওয়ার কথা ভাবতেই পারে না। এই মাঝারি বা ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্কে বিজ্ঞাপন দেওয়ার সাধ্য নেই। তারা ফেইসবুকের মতো প্লাটফর্মে অনেক কম খরচে বিজ্ঞাপন দিতে পারে। একমাত্র ফেইসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে এরকম টার্গেটেড বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই এইসব ব্যবসা আসলে টিকে থাকে। তবে এটাও সত্য, কোনো আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য ফেইসবুক একটি ভালো টার্গেট।’ এর কারণ হচ্ছে ফেইসবুকের কাঠামো বেশ বড়। অসংখ্য মানুষ এখানে থাকায় একে অন্যকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও বেশি। তাই জাকারবার্গ চাইলে বড় একটি পরিবর্তন আনা সম্ভব ফেইসবুকের মাধ্যমেই। কিছুটা দেরিতে হলেও জাকারবার্গ হয়ত বিষয়টা বুঝতে পেরেছেন। ঘৃণা এবং বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার জন্য তারা দ্রুত কাজ করবে বলে ঘোষণা এসেছে ফেইসবুকের পক্ষ থেকে।
আস্থার সংকটে ফেইসবুক
যদি প্রশ্ন করা হয়, এই বয়কট কি ফেইসবুকের ক্ষতি করতে পারে? উত্তর আসবে, হ্যাঁ পারে। কারণ ফেইসবুকের মোট আয়ের সঙ্গে বিজ্ঞাপন থেকে প্রাপ্ত আয় জড়িত। গত শুক্রবার ফেইসবুকের শেয়ারের দাম পড়ে গেছে প্রায় ৮%। এর ফলে মার্ক জাকারবার্গের সম্পদ অন্তত ৬ বিলিয়ন পাউন্ড কমে গেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি দীর্ঘমেয়াদি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে কি না সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। এভাইভা ইনভেস্টরসের ডেভিড কামিং বলেন, ‘ফেইসবুকের নৈতিক অবস্থান স্বচ্ছ নয় বলেই এই আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এতে তাদের ব্যবসায় ক্ষতি হতে পারে।’
কোনো সোশ্যাল মিডিয়ার বিরুদ্ধে এটা প্রথম বয়কট নয়। ২০১৭ সালে ইউটিউবে বর্ণবাদী এবং সমকামী বিদ্বেষী ভিডিওর পাশে নিজেদের বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছিল বলে অনেক বড় বড় কোম্পানি সেখানে বিজ্ঞাপন না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। এরপর যদিও ইউটিউব তাদের বিজ্ঞাপনী নীতিমালায় অনেক পরিবর্তন এনেছে। এখন ইউটিউব ও গুগল বেশ ভালো অবস্থানেই আছে। তবে ফেইসবুকের বিষয়টি তাদের থেকে কিছুটা আলাদা। একে তো এ বছরের জোরদার বর্ণবাদ আন্দোলন, আবার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বড় কোম্পানিগুলোর একাত্মতা। সব মিলিয়ে ফেইসবুকের অবস্থা বেশ নাজুকই বলতে হয়। যদিও ক্যাম্পেইনের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, এই ক্যাম্পেইনের উদ্দেশ্য ফেইসবুকের আর্থিক ক্ষতি নয়, ফেইসবুকের মডারেশন নিয়ে তাদের যে ঘাটতি রয়েছে সেটা তুলে ধরা।
কী বলছে ফেইসবুক
আন্দোলনের তীব্রতায় ফেইসবুক কিছুটা দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই জাকারবার্গের পক্ষ থেকে প্রথম ঘোষণা এসেছে বিষয়টি সুরাহা করার। শুক্রবার ১১ মিনিটের লাইভস্ট্রিমিংয়ে জুকারবার্গ জানান, ‘আমি ফেইসবুককে মানুষের নিজের কথা বলার ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যম করে তোলার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, কিন্তু একই সঙ্গে ঘৃণা বা হিংসা ছড়ানোর বিরুদ্ধে বা ভোট দমনের বিরুদ্ধেও আমার অবস্থান, আমরা এ ধরনের কনটেন্ট সরিয়ে দেব তা যার কাছ থেকেই আসুক না কেন। ইন্সটাগ্রাম ও ফেইসবুক প্রান্তিক গোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু অভিবাসী, পরিযায়ী, উদ্বাস্তু ও অন্যদের সুরক্ষায়ও সচেষ্ট।’ ফেইসবুকে জুকারবার্গের এ ভাষণের আগে ২০০ জনেরও বেশি বিজ্ঞাপনদাতার সঙ্গে কনফারেন্স কলের মাধ্যমে জানানো হয়েছে, তারা বিশ্বাসের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চালাচ্ছে।
ফেইসবুকের দেওয়া আর্থিক বিবৃতি অনুসারে, গত বছর পর্যন্ত বিজ্ঞাপন খাতে তাদের আয় ছিল ৭০ বিলিয়ন ডলার। নিজেদের জায়গা ধরে রাখার জন্য ফেইসবুকও এগিয়ে আসবে এটাই স্বাভাবিক। তারাও চেষ্টা করছে এই বয়কটে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে। মার্ক জাকারবার্গ খুব শিগগিরই হয়ত নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা দলগুলোর সঙ্গে বসবেন, যারা বয়কট নিয়ে কথা বলা শুরু করেছিল। আলোচনা শেষে ফেইসবুক কতটা সফল হবে তা সময়ই বলে দেবে।