খেলাপি ঋণ ও এর বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে গিয়ে বড় আকারে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। আর এই মূলধন ঘাটতি মেটাতে আবারও সরকারের কাছে অর্থ সহায়তা চেয়েছে ব্যাংকটি। এবার সরকারের কাছে মূলধন ঘাটতি মেটাতে ১০ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি। তবে এই নগদ সহায়তার বিপরীতে সরকারের অনুকূলে শেয়ার ইস্যু, সরকারি গ্যারান্টিপত্র অথবা নামমাত্র সুদে পারপিচুয়াল বন্ড ইস্যুর প্রস্তাব দিয়েছে সোনালী ব্যাংক। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে মূলধন ঘাটতি পূরণে অর্থ সহায়তা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)।
ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, মূলধন ঘাটতি থাকলে বিদেশি ব্যাংকগুলো এলসি নিতে চায় না। নিলেও বাড়তি খরচ দিতে হয়। এ ছাড়া করোনা পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকের ব্যবসাও কমে গেছে। ২০২০ সালে সোনালী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৮০০ কোটি টাকা কমবে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ও এর বিপরীতে সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে নিট মুনাফা কমে যাচ্ছে, যা মূলধন ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয় বলে চিঠিতে জানান সোনালী ব্যাংকের এমডি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আতাউর রহমান প্রধান। মূলধন ঘাটতি বাড়ার এটিই প্রধান কারণ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটি করার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ভালোভাবে পরীক্ষা- নিরীক্ষা করতে হবে, আদৌ এর প্রয়োজন রয়েছে কি না। যদি মূলধন সাপোর্ট দিতেই হয় তাহলে এখন নগদ টাকা না দিয়ে অন্যভাবে মূলধন স্বীকৃতি দিয়ে দেওয়া যেতে পারে, এতে চাপ কম পড়বে। তিনি বলেন, এক ব্যাংককে দিলে আরেকটাকে দিতে হবে এমন নয়। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত সব ব্যাংকের অবস্থা খারাপ নয়। তবে খেলাপি ঋণ কমিয়ে এনে ব্যাংকের অহেতুক ব্যয় কমানোর দিকেও মনোযোগ বাড়াতে হবে। সার্বিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত সোনালী ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, এর আগে সরকার কর্র্তৃক প্রদানকৃত নগদ অর্থ ব্যাংকের বিপুল মূলধন ঘাটতি পূরণে খুবই সামান্য ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এতে ব্যাংকসহ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সার্বিক দিক বিবেচনায় ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকার তিনটি বিকল্প গ্রহণ করতে পারে। বিকল্পগুলোর একটি হচ্ছে মূলধন ঘাটতিতে দেওয়া নগদ অর্থের বিপরীতে সরকারের অনুকূলে শেয়ার ইস্যু করা যেতে পারে। ব্যাংকের অনুকূলে ১০ হাজার কোটি টাকার সরকারি গ্যারান্টিপত্র ইস্যু করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্র্তৃক একে মূলধন হিসেবে স্বীকৃতিদানের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। অথবা সরকার কর্র্তৃক এই ব্যাংকের অনুকূলে নামমাত্র কুপন হারে ১০ হাজার কোটি টাকার সরকারি পারপিচুয়াল বন্ড ইস্যু করা এবং ওই বন্ডের বিপরীতে ব্যাংক কর্র্তৃক সরকারের অনুকূলে শেয়ার ইস্যুকরণের সুযোগ দেওয়া। এর মধ্যে যেকোনো একটিকে বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণের পদক্ষেপ কার্যকরী হবে বলে জানায় ব্যাংকটি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মো. আতাউর রহমান প্রধান গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০০৭ সালে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরকালে পুঞ্জীভূত ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। এই ক্ষতিকে ইনটেনজেবল অ্যাসেট বা সুনাম হিসাবে রূপান্তর করে গত ১০ বছরে মুনাফার বিপরীতে সমন্বয়সহ নানা কারণে এ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। কিন্তু নানা পদক্ষেপের কারণে ব্যাংকটির মুনাফা বাড়লেও খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতির কারণে মূলধন সংকট বাড়তে থাকে। এখন করোনার এই ক্রান্তিকালে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ১০ হাজার কোটি টাকার মূলধন প্রয়োজন। তিনি বলেন, এর মাধমে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ নগদ টাকা না চেয়ে বিকল্প পন্থার কথা বলা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় যা ভালো মনে করবে, তার মাধ্যমেই পূরণ করা যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্য ব্যাংকগুলোও চাইতে পারে, পেতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক তো সরকারি ব্যাংক। ব্যাংক ফল্ড করলে সরকারের ক্ষতি হবে, এ জন্য কিছুটা ঝুঁকি আছে। কিন্তু সরকার এ ঝুঁকি নিতে পারবে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, এ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষের নিবিড় তদারকিসহ যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে সোনালী ব্যাংক দেশের সব বাণিজ্যিক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ ২ হাজার ২৫ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। ২০১৯ সালেও প্রায় অনুরূপ ফলাফল প্রত্যাশা করছে। পরিচালন মুনাফা বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা সম্ভব হলেও ব্যাসেল-৩-এর কঠোর নিয়মানুবর্তিতার কারণে বিভিন্ন সমন্বয়, শ্রেণিকৃত ঋণাধিক্য ও প্রভিশন ঘাটতিজনিত কারণে নিট মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ সম্ভব হবে না। এ ছাড়া কভিড-১৯-এর প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি আজ বিপর্যস্ত, বাংলাদেশ তার বাইরে নয়। কভিড-১৯-এর প্রভাবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি আজ ব্যাপক হুমকির সম্মুখীন; যার উল্লেখযোগ্য প্রভাব সমগ্র ব্যাংকিং সেক্টরের ওপরও পড়েছে। সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে সোনালী ব্যাংকের ওপর এর প্রভাব আরও বেশি হবে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যদিও কভিড-১৯-এর প্রভাব মোকাবিলায় ১ লাখ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তবুও প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ২০২০ সালে এ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা কম হবে , যা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতিকে আরও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালে ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকগুলোকে ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফার বাবদ ২ দশমিক ৫০ শতাংশ ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে মূলধন সংরক্ষণ করতে হবে। তা ছাড়া সোনালী ব্যাংককে বিভিন্ন বিষয়ে মোট ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণ করতে হবে। এ অবস্থায় ব্যাংকের বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় মূলধন ঘাটতি পূরণে ১০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। নিট মুনাফা দ্বারা এই ঘাটতি পূরণ অসম্ভব। করলেও দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার, যা ব্যাসেল-৩ পরিপালনে বড় অন্তরায়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, সোনালী ব্যাংক সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত ও একমাত্র ট্রেজারি ব্যাংক হিসেবে সরকারি বড় বড় এলসি খুলে থাকে। যেমন সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের জন্য প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা মূল্যের একটি এলসি এ ব্যাংক হতে খোলা হয়েছে। এ ছাড়া বিপিসি, খাদ্য, সমরাস্ত্র, রেলওয়ে এসব মন্ত্রণালয় তো রয়েছেই। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি থাকলে অনেক বিদেশি ব্যাংক এলসি গ্রহণ করতে চায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা গ্রহণ করলেও এই কনফারমেশন ফি দাবি করে। এতে সরকারের ও দেশের আমদানি ব্যয় প্রায় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়ে যায়। এ কারণে সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ অত্যাবশ্যক।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসব কথা বলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি এর আগেও মূলধন সহায়তা নিয়েছে। এখন এই পদ্ধতিতে সহায়তা দিতে হলে ব্যাংকটিতে সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। খেলাপি ঋণ ও দুর্নীতি কমিয়ে আনতে হবে। নইলে বারবার টাকা দিলেও কোনো লাভ হবে না। কারণ ঝুড়ির তলা ফুটো থাকলে, সেটা বন্ধ করতে হয়। না হলে যত পানিই দেওয়া হোক, তা পড়ে যাবে। ব্যাংকের দুর্নীতি, অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ না হলে লাভ হবে না।