স্বাস্থ্যের ঠিকাদার চক্র

মিঠুর নামে-বেনামে ২০ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান!

করোনাকালে দেশের স্বাস্থ্য খাতের যে নাজুক অবস্থা ধরা পড়েছে, সে জন্য অনেকেই ‘মিঠু সিন্ডিকেট’কে দায়ী করেন। তার পুরো নাম মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর গ্রামের কছিরউদ্দীনের ৮ ছেলে ও ৩ মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মিঠু দেশে কমই আসেন। সেখানে বসেই তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নামে-বেনামে ও আত্মীয়-বন্ধুবান্ধবের নামে তার কমপক্ষে ২০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম জানা গেছে।

প্রভাবশালী ঠিকাদার মিঠু সম্পর্কে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নানা চমকপ্রদ তথ্য। ২০১৬ সালের ৯ মে প্রকাশিত বহুল আলোচিত পানামা পেসার্স কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারকারী হিসেবে মিঠুর নাম আসে। গত অর্ধযুগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে কয়েক দফায় তদন্তের উদ্যোগ নিলেও কোনোটিই আলোর মুখ দেখেনি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কোনো নোটিস হলেই হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন মিঠু। পরে সেটি নথিভুক্ত করার মাধ্যমে ‘অভিযোগ নিষ্পত্তি’ করিয়ে নেন তিনি। মিঠুর বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত একটি ‘নন-সাবমিশন’ মামলা করেছে দুদক। ২০১৬ সালের ১০ মে বনানী থানায় মামলাটি করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল হক। গত দুই বছরে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে দুদক অনেক অনুসন্ধান করলেও মিঠু রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমনকি দুদকের সুপারিশের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যে ১৪ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করেছে সেখানে মিঠুর একটি প্রতিষ্ঠানেরও নাম নেই।

এরই মধ্যে ১ জুলাই মিঠুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ‘অতীব জরুরি তলবি নোটিস’ পাঠিয়েছে দুদক। দুদকের পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী স্বাক্ষরিত ওই নোটিসে তাকে ৯ জুলাই কমিশনে হাজির থাকতে বলা হয়েছে। নোটিসে বলা হয়েছে, ‘স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কভিড-১৯-এর চিকিৎসার নিমিত্ত নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সরঞ্জাম ক্রয়সহ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করার নামে অন্যদের যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎপূর্বক অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে বর্ণিত অভিযোগ বিষয়ে তাদের বক্তব্য শ্রবণ ও গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।’ নোটিসে মিঠুকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের চেয়ারম্যান ও লেক্সিকোন মার্চেন্ডাইজ ও টেকনোক্র্যাট লিমিটেডের মালিক বলা হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘মিঠু সিন্ডিকেট’ কমপক্ষে ২০ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি), স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, ঔষধ প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, নার্সিং অধিদপ্তর, প্রায় সব কটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ঠিকাদারি করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং জেনারেল হাসপাতালগুলোতেও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে তারা। অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য শিক্ষাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে আছে মিঠুর ‘বিশ্বস্ত ও অতিবিশ্বস্ত’ এজেন্ট। তারাই মিঠুর হয়ে সব কাজ করে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ জন্য কখনো ‘প্রতাপশালী’ ব্যক্তিদের প্রভাব খাটানো হয় অথবা কখনো অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ‘ম্যানেজ’ করা হয়। আবার কখনো সংশ্লিষ্টদের জন্য  ‘প্লেজার্স ট্যু’র ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ফিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ আছে ‘এই চক্রের’ বিরুদ্ধে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই প্রভাবশালী ঠিকাদার মিঠু সিন্ডিকেটের কিছু তথ্য তুলে ধরে সিএমএসডির বিদায়ী পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহীদউল্লাহ গত ৩০ মে জনপ্রশাসন সচিবকে একটি চিঠি পাঠান। তিনি চিঠিতে বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) তাকে (শহীদুল্লাহ) মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার নির্দেশ দেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তার ছেলের পক্ষ থেকে ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে বলে তাকে জানান ওই দুই কর্মকর্তা।’ চিঠিতে শহীদউল্লাহ আরও জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওই দুই কর্মকর্তা মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেডসহ তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখেন। ওই কোম্পানির পাঠানো তালিকা ও মূল্য অনুযায়ী দ্রব্যাদি কেনাকাটা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তিনি এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং ক্রয় তালিকায় সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করেননি। এতে মেডিটেক ইমেজিংসহ সহযোগী ঠিকাদাররা ক্ষুব্ধ হন।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি মন্ত্রণালয় কভিড হাসপাতালের আইসিইউর জন্য ডিপিএমে (সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি) কিছু চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয়ের চাহিদা দেয়। মন্ত্রণালয়ের কয়েক কর্মকর্তা মৌখিকভাবে মেডিটেক ইমেজিংয়ের কাছ থেকে ওইসব সামগ্রী ক্রয়ের নির্দেশ দেন। কিন্তু মেডিটেক ইমেজিংয়ের যন্ত্রপাতি ছিল নি¤œমানের ও দাম বেশি। ফলে তারা বাদ পড়ে। এরপরও মিঠুর বেনামি প্রতিষ্ঠান মেডিটেক ইমেজিংকে বিভিন্ন হাসপাতালে ২৫০টি আইসিইউ মেশিন সরবরাহের কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। আর এ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি আইসিইউ মেশিনের দাম ধরা হয়েছে প্রকৃত বাজার দরের চেয়ে ৪-৫ গুণ বেশি।

রংপুরের একাধিক সাংবাদিক দেশ রূপান্তরকে জানান, ৩০ বছর আগে মিঠুর উত্থান। রংপুরে তার বাড়ির ছাদে হেলিকপ্টার ওঠানামার ব্যবস্থা আছে। রংপুর শহরে এমন বাড়ি আছে একটাই। এমনকি বাড়িটির দিকে ক্যামেরা তাক করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেজে ওঠে অ্যালার্ম। মিঠুর বাবা কছিরউদ্দীনের নামে নগরীর বাণিজ্যিক এলাকায় নির্মিত হয়েছে হাসপাতাল। রংপুরের চব্বিশহাজারি, মহিপুর ও দর্শনায় একরকে একর জমি, নানা অবকাঠামো, ছাত্রাবাসসহ মিঠুর বিপুল সম্পদ রয়েছে বলে জানা গেছে। রংপুরের দর্শনা এলাকায় ‘মিঠু সড়ক’ নামে একটি সড়কও আছে। তিস্তা নদীর তীরের বাড়িটি স্থানীয়দের কাছে ‘মিঠু হাজির বাড়ি’ নামে পরিচিত। ওই গ্রামের নাম মহিপুর হওয়ায় ‘মহি মিঠু’ নামেই তার বেশি পরিচিতি।

নোটিস হলেই রিট : দুদক ইতিপূর্বে যেসব নোটিস করেছে তার প্রায় সবগুলোর বিরুদ্ধেই রিট করেছেন মিঠু। এরপর নানা প্রভাব-খাটিয়ে তিনি সেগুলো নথিভুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করিয়েছেন বলে জানা গেছে। দেশ রূপান্তরের হাতে তার এমন কয়েকটি নথি এসেছে। ২০১৬ সালের ২৩ মার্চ দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত-১ শাখার উপপরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদ কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে একটি অনুসন্ধান নথিভুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তির চিঠি দেন। যার স্মারক নম্বর ছিল ‘দুদক/অনু: ও তদন্ত-১ অনু: ১৪৭/ ঢাকা ২০১৪/ ১০১৫৯।’ বিষয় উল্লেখ ছিল ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করে ঠিকাদার মিঠুকে কোটি কোটি টাকার বিল পরিশোধের অভিযোগ।’ যার সূত্র ‘দাখিলকৃত ৮/৩/২০১৬ তারিখের প্রতিবেদন।’ ওই চিঠিতে বলা হয়, উপরিউক্ত বিষয় ও সূত্রের পরিপ্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে যে, ‘আপনার দাখিলকৃত আংশিক প্রতিবেদন সুপারিশ অনুযায়ী রিট পিটিশন ৮৪২৯/১৪, ৮৪২৭/১৪, ৮৪২৬/১৪, ৮৪২৮/১৪, ৮৪৩৯/১৪, ৮৪৩০/১৪ এবং ৮৪৩১/১৪ সংক্রান্ত “ইক্যুইপমেন্ট অ্যান্ড আদার্স ইন্সট্রুমেন্ট” সরবরাহের কাজে টেন্ডারে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে ভাগাভাগি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগটি নথিভুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। অভিযোগের অবশিষ্ট অংশ তথা অবশিষ্ট ৭টি রিটের বর্তমান অবস্থা জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও অন্যান্য অভিযোগের ওপর দ্রুত অনুসন্ধান সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’ এভাবে দুদক যখনই মিঠু বা তার চক্রের কাউকে নোটিস করেছে রিট করে সময় নিয়ে পরে তিনি সেগুলো নিষ্পত্তি করেছেন বলে জানা গেছে।

মিঠুর নামে নন-সাবমিশন মামলা : নির্দিষ্ট সময়ে সম্পদের হিসাব না দেওয়ায় মিঠুর বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ১০ মে একটি ‘নন-সাবমিশন’ মামলা করে দুদক। রাজধানীর বনানী থানায় মামলাটি করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল হক। এজাহারে বলা হয়, ‘৫০ কোটি টাকার বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়টি দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসার পর ২০১৩ সালে মোতাজ্জেরুল ইসলামকে সম্পদবিবরণী জমা দেওয়ার নোটিস জারি করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে তিনি সম্পদবিবরণী জমা দেননি কিংবা সময় বাড়ানোর আবেদনও করেননি। এ কারণে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।’

ওই মামলার আগে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে মিঠুকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের চেয়ারম্যান উল্লেখ করে এ বিষয়ে তথ্য চায় দুদক। ২০১৬ সালের মে মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে দুদক যে চিঠি পাঠিয়েছিল তাতে ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে স্বাস্থ্য সেক্টরে বিভিন্ন উন্নয়ন, সেবা খাতে যেসব কাজ বাস্তবায়ন করেছে, চলমান আছে এবং ওষুধ-মালামাল-যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে সেগুলোর প্রশাসনিক অনুমোদন, বরাদ্দপত্র, প্রাক্কলন-টেন্ডার, কোটেশন, দাখিলকৃত টেন্ডার, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, কার্যাদেশ, কার্যসমাপ্তি প্রতিবেদনসহ প্রাসঙ্গিক সব রেকর্ডপত্র ২০১৬ সালের ৩০ মের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কয়েক দফা তাগিদ দেওয়ার পরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এসব রেকর্ড আর দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন দুদকসংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল দুদকের উপপরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ‘হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক কর্মসূচির অনুকূলে মেডিকেল ইক্যুইপমেন্ট ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য চান। কয়েক দফা তাগাদাপত্র দিয়েও কমিশন ওইসব তথ্য পায়নি বলে তৎকালীন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান। 

দুদকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, সম্পদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে নানা অনিয়ম ও অবৈধ টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার তথ্য মিলে মিঠুর বিরুদ্ধে। সাবেক এক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছেলেকে ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে রেখে মহাজোট সরকারের গত আমলে স্বাস্থ্য খাতের সব ধরনের টেন্ডার এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন মিঠু। ওই সময় সারা দেশের ১৮টি মেডিকেল কলেজ ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বড় অঙ্কের অধিকাংশ ঠিকাদারি কাজই হাতিয়ে নেয় তার প্রতিষ্ঠানগুলো।

মিঠুর কমপক্ষে ২০ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান : অনুসন্ধানে মিঠু, তার স্ত্রী, ভাই, ভাগ্নিসহ আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবের নামে থাকা কমপক্ষে ২০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলেন, মিঠুর প্রতিষ্ঠানগুলো দেড় দুই বছরের বেশি কাজ করে না। প্রতি অর্থবছরে নতুন নতুন নামে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেন তিনি। ২০১৬ সালে দুদকের তদন্তে মিঠুর নামে-বেনামে থাকা ১৬ প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মিঠু ও তার স্ত্রীর যৌথ নামে রয়েছে লেক্সিকোন মার্চেন্ডাইজ ও টেকনোক্রেট লিমিটেড। ওই সময় দুদকের চিঠিতে মিঠুকে এ দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রোপাইটর উল্লেখ করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর ঠিকানা উল্লেখ করা হয়— (১) বাসা নং-৮, রোড-৬, ব্লক-সি, বনানী, ঢাকা। (২) কাজী ভবন, ৭মতলা, ৩৯ নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা। (৩) রুম নং-৩০৯, রাজা রামমোহন মার্কেট, রংপুর (৪) হাউজ নং ৪২০, রোড-১১, সিডিএ, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম। (৫) ১৪৩, মালিবাগ বাজার রোড, ঢাকা। (৬) বাড়ি নং-৫/এ,  রোড-২৫/এ, ব্লক-এ, বনানী, ঢাকা। এছাড়া মিঠুকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের চেয়ারম্যান উল্লেখ করে সে বিষয়েও তথ্য চায় দুদক।

জানা গেছে, মিঠুর স্ত্রী নিশাত ফারজানা ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বড় ভাইয়ের নামে রয়েছে সিআর মার্চেন্ডাইজ ও এলআর এভিয়েশন নামে দুটি ঠিকাদারি লাইসেন্স। মিঠুর ভাবির নামে রয়েছে জিইএফ অ্যান্ড ট্রেডিং। ভাগ্নের নামে রয়েছে ট্রেড হাউজ। ভাগ্নের স্ত্রীর নামে আছে মেহেরবা ইন্টারন্যাশনাল। আত্মীয়দের নামে আরও আছে— ক্রিয়েটিভ ট্রেড, ফিউচার ট্রেড, লেক্সিকোন আইটি প্রাইভেট লিমিটেড, টেকনো ট্রেড, বেলএয়ার এভিয়েশন, জিইএস অ্যান্ড ট্রেডিং, হ্যাভ ইন্টারন্যাশনাল, লেসিকন হসপিটালিটি, নর্থ টেক এলএলসি লিমিটেড, থ্রি-আই মার্চেন্ডাইজিং, ইনসেনারিটি লিমিটেড।

মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেড নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিও মিঠুর একটি বেনামি প্রতিষ্ঠান বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. হুমায়ুন কবিরের বাড়ি টাঙ্গাইলে এবং তিনি মিঠুর বন্ধু। রাজধানীর ৩/৪ কমলাপুর বাজার রোডের ঠিকানায় ফিউচার ট্রেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা দেখানো হয় মিঠুর স্ত্রীর নামে। এ প্রতিষ্ঠানটি মুগদা ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে।

দুদকের ভাষ্য : এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘সরকারি অর্থ আত্মসাৎকারী কোনো ঠিকাদার বা অন্য কেউ রেহাই পাবেন না। তাদের জন্য আমাদের মেসেজ হচ্ছে— এগুলো বন্ধ করেন। তা না হলে আপনাকে আইনের আওতায় আসতেই হবে। তাকে দুদক তলব করেছে। তার দুর্নীতির প্রমাণ পেলে অবশ্যই মামলা হবে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করা হলেও সেটি তিনি রিসিভ করেননি। পরে মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।