ঋণখেলাপি হওয়ায় সাঈদ হোসেন চৌধুরীকে ওয়ান ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ১২১ কোটি ৪৩ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাঈদ হোসেন চৌধুরীকে অপসারণ সংক্রান্ত চিঠি রবিবার ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালনা পর্ষদকে পাঠিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, সাঈদ হোসেন চৌধুরীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে খেলাপি ঋণ থাকায় ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী তার ওয়ান ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান থাকার কোনো সুযোগ নেই। চিঠি প্রাপ্তির দিন থেকে সাঈদ হোসেন চৌধুরী আর ওয়ান ব্যাংকের পরিচালক নন। ফলে ব্যাংকটিতে তার চেয়ারম্যান পদও অবৈধ। এ অবস্থায় ওয়ান ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় তিনি আর অংশ নিতে পারবেন না।
এ বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, সাঈদ হোসেন চৌধুরী তার মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়েছিলেন। ঋণ পরিশোধ না করায় পরে তা খেলাপি হয়ে যায়। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী একজন ঋণখেলাপি কোনো ব্যাংকের পরিচালক পদে থাকতে পারেন না। এজন্য তাকে অপসারণ করা হয়েছে।
ওয়ান ব্যাংকে সাঈদ হোসেন চৌধুরীর ৩ কোটি ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৬৯৪টি শেয়ার রয়েছে, যা ব্যাংকটির মোট শেয়ারের ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। সাঈদ হোসেন চৌধুরী একাধিক মেয়াদে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদে ছিলেন। সবশেষ গত বছরের ১ আগস্ট এক বছরের জন্য চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। মেয়াদ শেষ হওয়ার কিছুদিন বাকি থাকতেই তাকে ওয়ান ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ করল বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, সাঈদ হোসেন চৌধুরীসহ ওয়ান ব্যাংকের চারজন পরিচালকের মেয়াদ নবায়ন করার জন্য গত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন জানানো হয়। ওই সময় ঋণখেলাপি হওয়ায় সাঈদ হোসেন চৌধুরীকে আইন অনুযায়ী পরিচালক হিসেবে মেয়াদ নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। বিষয়টি জানিয়ে ওয়ান ব্যাংককে চিঠিও দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের আদেশের ওপর উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশ নেন সাঈদ হোসেন চৌধুরী। ফলে খেলাপি হওয়া সত্ত্বেও এতদিন পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কিন্তু সম্প্রতি উচ্চ আদালতে সাঈদ হোসেন চৌধুরীর করা মামলাটি বাতিল (কোয়াশ) হয়ে যায়। এতে ওয়ান ব্যাংকের পরিচালক পদের পাশাপাশি সাঈদ হোসেন চৌধুরীর চেয়ারম্যান পদও অবৈধ হয়ে যায়। এ প্রেক্ষাপটে তাকে ওয়ান ব্যাংক পর্ষদ থেকে অপসারণের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যেদিন চিঠি পাবেন, সেদিন থেকেই আদেশ কার্যকর হবে। সে হিসেবে ইতিমধ্যে সাঈদ হোসেন চৌধুরী ওয়ান ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ হারিয়েছেন। তবে তিনি যদি এক সপ্তাহের মধ্যেই খেলাপি ঋণ পরিশোধ বা পুনঃতফসিল করতে পারেন, তাহলে পরিচালক পদ ফিরে পেতে পারেন।
আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরীর ভাই সাঈদ হোসেন চৌধুরী এইচআরসি গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। পারিবারিকভাবেই শিপিং লাইনস হানজিন ও পিআইএলসহ বেশ কয়েকটি শিপিং লাইনসের ব্যবসা ছিল সাঈদ হোসেন চৌধুরীর। সে সুবাদে নিজেও এইচআরসি শিপিং লাইনস নামে কোম্পানি গড়ে তোলেন তিনি। এক সময় পণ্য আনা-নেওয়ায় আটটি জাহাজ ছিল এ কোম্পানির বহরে। তবে বর্তমানে ওই কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম নেই।
সাঈদ হোসেন চৌধুরী ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন এইচআরসি গ্রুপ। গ্রুপটির মালিকানায় চা, রাবার, রিয়েল এস্টেট, লাইটিং ইন্ডাস্ট্রি, মার্চেন্ট ব্যাংকিং, ইন্স্যুরেন্স, সংবাদপত্র, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতের ২০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
জানা গেছে, এইচআরসি গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এইচআরসি শিপিং লাইনসের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন সাঈদ হোসেন। গত বছরের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত এইচআরসি শিপিং লাইনসের কাছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সুদসহ মোট পাওনা দাঁড়ায় ১২১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। সেই ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের খেলাপির তালিকায় তার নাম আসে। পাওনা আদায়ে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে ৩১ দশমিক ৮০ ডেসিমেল জমির ওপর সাঈদ হোসেন চৌধুরীর মালিকানাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান আরাকান এক্সপ্রেস লিমিটেডের বাণিজ্যিক শেড ও স্থাপনা নিলামে বিক্রির প্রস্তুতি নেয় স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা। ঋণ নেওয়ার সময় ওই সম্পত্তি বন্ধক রেখেছিল এইচআরসি গ্রুপ।
এদিকে খেলাপি ঋণ সংশ্লিষ্টতার কারণে পরিচালক পদ হারিয়েছেন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বর্তমান পরিচালক এ এস এম ফিরোজ আলম। রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের এমডির কাছে পাঠানো হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়, এ এস এম ফিরোজ আলমের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে খেলাপি ঋণ থাকায় ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী তাকে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক নিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই। ওই চিঠিতে এ কে এম সহিদ রেজা, আলহাজ মোশারফ হোসেন এবং এম আমান উল্লাহকে ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।