মহেন্দ্র সিং ধোনি : ক্রিকেটে এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম

ঝাড়খন্ডের মতো প্রান্তিক অঞ্চল থেকে এসে কেউ কোনো দিন ভারতীয় দলের নেতৃত্ব দিতে পারে, একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এটা ছিল কল্পনাতীত ব্যাপার। মহেন্দ্র সিং ধোনি সেই অতিকাল্পনিক ব্যাপারকে বাস্তব করেছেন। আর কী করেছেন? না, বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত ধোনি কী করেননি? অধিনায়ক হিসেবে দুটি বিশ্বকাপ দিয়েছেন ভারতকে। টেস্টে নাম্বার ওয়ান করেছেন। চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতিয়েছেন। সর্বোপরি অধিনায়কত্বের নিজস্ব ঘরানা তৈরি করেছেন। ব্যাটিং এবং কিপিং স্টাইলেও ধোনির স্বকীয়তা স্পষ্ট।

গ্রেগ চ্যাপেল মনে করতেন, আধুনিক ক্রিকেট-পাঠের সেরা মডেল হতে পারে ধোনি। সাবেক ভারতীয় কোচের যুক্তি, ‘গলি ক্রিকেট বা পার্ক ক্রিকেটের মতো ছকের বাইরে গিয়ে যদি ক্রিকেটটা খেলা যায়, তাহলেও অনেক কিছু শেখা যায়।  যেখানে কোচ থাকে না। কখনো কখনো বয়সে অনেক বড় ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধেও খেলতে হয়। একদম ছোট থেকে লড়াইয়ের প্রবণতাটা ঢুকে পড়ে ক্রিকেটারের মধ্যে। ধোনিই তো সেরা উদাহরণ। ছোটবেলায় যদি অ্যাকাডেমিতে যেত, তা হলে একদম আলাদা ধোনিকে দেখতাম আমরা। অস্ট্রেলিয়ায় দেখি ছোট থেকেই প্রচুর ছেলে অ্যাকাডেমিতে যায়। অ্যাকাডেমি ঘরানায় ক্রিকেটটা খেলে। আমার মনে হয় না, ক্রিকেট শিক্ষার সেটাই সেরা রাস্তা।’ কপিবুক ক্রিকেটের বাইরে গিয়ে ধোনির স্পিন খেলা দেখে ভারতের আরেক সাবেক কোচ গ্যারি কারস্টেন বলেছিলেন, ‘স্পিনারদের বিরুদ্ধে ধোনির ব্যাটিংটা মন দিয়ে দেখুন। কীভাবে ও বলের পেছনে চলে যায়! শুধু স্টেপ আউট করে ছক্কা মারার সময় ছাড়া ও সব সময় ব্যাকফুটে স্পিনারদের খেলে।’

এক কথায় সব কিছুতেই ধোনি ‘আনঅর্থডক্স’ এতটাই যে, মাঝে মাঝে কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। ২০০৭’র টি- টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনাল যেমন। শেষ ওভারে তিনি বল তুলে দিয়েছিলেন যোগিন্দর শর্মার হাতে। পাকিস্তানের দরকার ছিল ১৩ রান। তখন ৩৭ রানে ব্যাট করছিলেন মিসবাহ-উল-হক। প্রথম বল ওয়াইড। পরের বল ডট। এরপর ছক্কা। তৃতীয় বল স্কুপ করতে গিয়ে মিসবাহ আউট। ৫ রানে প্রথম টি- টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতল ভারত। পরে সাংবাদিকরা ধোনির কাছে জানতে চাইলেন, এত বিকল্প থাকতে যোগিন্দর কেন? ধোনির যুক্তি, ‘ডেথ ওভারে ইয়র্কার করার ব্যাপারে হরভজন শতভাগ নিশ্চিত হতে পারছিল না। ভাবলাম এমন কাউকে বল দেওয়া উচিত যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভালো করতে চায়। যোগি দারুণ করেছে।’ এই প্রথাবিরুদ্ধতার নামই ধোনি। গালভরা শব্দে আপনি এটাকে ‘ক্যাপটেন্স ইনস্টিংক্ট’ বলতে পারেন। তবে যাই বলুন ঠিক সংজ্ঞায়িত করতে পারবেন না।

ওয়ানডেতে ব্যাটসম্যান ধোনি বেশি সফল। টেস্টেও ব্যর্থ নন। ৯০ টেস্টে ৩৮.০৯ গড়ে ৪৮৭৬ রান। ৬টি সেঞ্চুরি, ৩৩টি হাফসেঞ্চুরির সঙ্গে ২৫৬টি ক্যাচ আর ৩৮টি স্টাম্পিং। তাছাড়া ২৭ টেস্ট জিতিয়ে ভারতের সফল অধিনায়ক তিনিই। ৫০ ওভারের ক্রিকেটে তো ধোনি সর্বকালের সেরা। সাড়ে তিনশ ওয়ানডেতে ১০ হাজারের ওপর রান করেছেন। গড় পঞ্চাশের ওপর। তবে ১০টি সেঞ্চুরি, ৭৩টি হাফসেঞ্চুরি ‘ফিনিশার’ ধোনিকে চেনাতে পারবে না। রান তাড়া করার ক্ষেত্রে ব্যাটিং গড়ে তিনি বেভান-কোহলিদের চেয়ে এগিয়ে। ক্রিকেট-প-িত ইয়ান চ্যাপেল একবার বলেছিলেন, ‘ধোনি যখন ওয়ান ডে-তে ভারতকে নেতৃত্ব দেয় তখন ও সম্পূর্ণ আলাদা। টেস্টের সঙ্গে যাকে মেলানোই যায় না! যেন পুরো টিমটাকে চালনা করে ওর নিজের মগজাস্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটের শক্তিতেও।’ কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়ার কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গার তার দলে ধোনির মতো ফিনিশারের জন্য হাপিত্যেশ করেছিলেন।

বিশ্বকাপের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেননি ধোনি। অবসরও নেননি। আজ ৩৯-এ পা দিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশের জার্সি গায়ে হয়তো তাকে আর দেখা যাবে না। কিন্তু তার বিকল্প কি পাওয়া যাবে? লন্ডন টেলিগ্রাফের হয়ে সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক মাইকেল ভন কিছুদিন আগে এই প্রশ্নটাই করেছিলেন রবি শাস্ত্রিকে। যা উত্তর পেয়েছেন তা আসলে এক কোচের ভয়মিশ্রিত আক্ষেপ, ‘কোনো অবস্থাতেই ধোনির বিকল্প কেউ হতে পারে না। ধোনির মতো ক্রিকেটাররা ৩০-৪০ বছরে একবারই আসে। তাই আমি সবাইকে একটা কথাই বলি, ও যতদিন ক্রিকেটে রয়েছে, খেলা উপভোগ করে নাও। ও যেদিন চলে যাবে, দেখবে এমন এক শূন্যতা তৈরি হবে যা পূরণ করা খুব কঠিন হবে। ক্রীড়া বিশ্বে দূত হিসেবে যেভাবে এত দীর্ঘ সময় ধরে ধোনি বিচরণ করছে, তা অকল্পনীয়। ও কিংবদন্তি। ভারতীয় ক্রিকেটে অন্যতম সেরা হিসেবেই পরিচিত হয়ে থাকবে।’

মাঠে ধোনির চেয়ে ধীর-স্থির-প্রশান্ত ক্রিকেটার দ্বিতীয়টি নেই। তিনি শূন্য করলেও যেমন সেঞ্চুরিতেও তেমন। বিশ্বকাপ জিতেছেন না প্রথম রাউন্ড থেকেই ছিটকে গেছেন, মুখ দেখে তা বোঝা যেত না। ২০১১তে ভারতকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এনে দেওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সাক্ষাৎকার দেননি। এমন একজনকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন! এমএসডি আসলে ক্রিকেটের ব্যাখ্যাতীত সত্তা। এক চলমান বিস্ময়ও বটে।