অন্ধকারে মানুষ চায় আলো, সংকটে চায় সমাধান। যদিও সংকট আগেও ছিল, এবং ছিল তা নিয়ে বিতর্কও। উন্নয়ন আগে না গণতন্ত্র আগে, প্রবৃদ্ধি বাড়ছে পায়ে হাঁটা গতিতে কিন্তু বৈষম্য কেন বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে, অর্থনৈতিক উন্নতি বাড়ছে তবে সমাজে স্বস্তি আসছে না কেন, মাথাপিছু আয় বাড়ছে তবে মাথা থেকে ঋণের বোঝা কমছে না কেন? পাশাপাশি অর্থনীতির অনেক সূচকের অগ্রগতি সত্ত্বেও জীবনে অনেক দুশ্চিন্তার বৃদ্ধি ঘটছে কেন তা নিয়ে বিতর্ক ছিল। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে কতটা এগোলাম আর কত পথ যে বাকি পড়ে থাকল তা পর্যালোচনা চলছিল। যদিও উন্নয়ন আর অগ্রগতির ফিরিস্তি এত উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা হচ্ছিল যে তার ঢাকের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছিল বৈষম্যের বেদনা। অনেকে আবার এক কাঠি এগিয়ে বলতেন, এ হচ্ছে উন্নয়নের অপরিহার্য বেদনা। তখন প্রশ্ন উঠেছিল বেদনার সুষম বণ্টন তো হচ্ছে না। উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে অল্প কিছু মানুষ আর অপরিহার্য বেদনার ভার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বহন করছে কেন? এসব বিতর্কের মধ্যেই করোনা কাঁপিয়ে দিল অর্থনীতির ভিত্তি আর দেখিয়ে দিল তার দুর্বলতাগুলো। এত সাফল্য ৪ মাসেই নিঃশেষ হয়ে এত সংকটের জন্ম দিল কীভাবে? অর্থনৈতিক ভিত্তি কি এতটাই দুর্বল ছিল? এই দুর্বলতা কি করোনা সৃষ্টি করেছে নাকি করোনার কারণে দুর্বলতাগুলো প্রকট ও দৃশ্যমান হয়েছে। এখন এই দুর্বলতা দ্রুত দূর না করলে সংকট আরও তীব্র হবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। কিন্তু আসন্ন সংকটের সেই পদধ্বনি শুনতে পাওয়া গেলেও সমাধানের তেমন কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না।
করোনা সবচেয়ে বড় আঘাত হানছে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রগুলোতে। যুবকরা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এবং তারাই এখন সবচেয়ে বড় সংকটে। দেশের কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে বেকার কত তা নিয়ে শুধু সংখ্যার তারতম্য আছে তাই নয়, কোন পদ্ধতিতে তাকে বেকার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হবে তা নিয়েও রয়েছে মতপার্থক্য। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করলে তিনি আর বেকার নন। এই হিসেবে বাংলাদেশে কোনো দিনমজুর সপ্তাহে একদিন কাজ পেলে তাকে আর বেকার বলা যাবে না। একজন মজুরের গড় মজুরি ৪০০ টাকা হলে ঘণ্টায় আয় হবে ৫০ টাকা। সপ্তাহে ৫০ টাকা আয় করলে সংজ্ঞা অনুযায়ী তাকে বেকার না বলা গেলেও তার জীবনযাপন কি এই টাকায় সম্ভব? তাই সংজ্ঞা নিয়ে পার্থক্য যতই থাকুক না কেন, বেকার যে আছে এবং করোনার আগেই বেকার সমস্যা প্রকট ছিল, এবং করোনা একে প্রচণ্ড রূপ দিতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী চার সপ্তাহ কাজ খুঁজেছে অথচ পায়নি, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কাজ পেতে পারে বা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই বিদ্যমান মজুরিতে কাজ শুরু করবে এমন মানুষকে বেকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দেশের বেকার শ্রমশক্তির যে জরিপ করেছে, তা এই সংজ্ঞার ওপর ভিত্তি করেই।
অনেক দেশে স্বল্প মেয়াদের বেকারত্বের পাশাপাশি মৌসুমি বেকার, প্রচ্ছন্ন বেকার ও দীর্ঘমেয়াদি বেকার হিসেবে ভাগ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ৬ মাস এবং ইউরোপে এক বছর কাজ না পেলে তাকে দীর্ঘমেয়াদি বেকার বলা হয়। আমাদের দেশে বেকারের এ রকম কোনো শ্রেণিবিভাগ নেই। প্রতি বছর ২২ লাখ লোক শ্রমবাজারে আসছে। কিন্তু গড়ে বছরে সরকারিভাবে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র দেড় লাখ। ৭ থেকে ৮ লাখ দেশের বাইরে জীবিকার সন্ধানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলে যায়। বাকি কর্মসংস্থানকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত ও স্বকর্ম সংস্থান হিসেবে বিবেচিত। ব্রিটিশ পত্রিকা ইকোনমিস্টের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুসারে বর্তমানে বিশ্বে ২০টি সর্বাধিক বেকারত্বের দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২। ওই প্রতিবেদন অনুসারে বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি ১০০ স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ- তরুণীর মধ্যে ৪৭ জন বেকার। বিবিএস বলছে, বেকারদের মধ্যে চিকিৎসক-প্রকৌশলীর হার ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। নারী চিকিৎসক-প্রকৌশলীর মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩১ শতাংশ। এরপরই আছেন উচ্চমাধ্যমিক ডিগ্রিধারীরা। তাদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে দেশে মোট কর্ম উপযোগী মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৯১ লাখ। বাংলাদেশের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী কর্মক্ষম শ্রমশক্তি ৬ কোটি ৩৫ লাখের মধ্যে কর্মে নিয়োজিত রয়েছেন ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষ অর্থাৎ বেকার ২৭ লাখ। এ হিসেবে বেকারত্ব ৪ দশমিক ২ শতাংশ। কাগজের এই হিসাবের সঙ্গে বাস্তবের যে মিল নেই তা চারপাশে কর্মপ্রত্যাশীদের সংখ্যা দেখলে অনুমান করতে কষ্ট হয় না। বেকারত্বের দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে বা একটু উন্নত জীবনের আশায় কীভাবে যুবকরা বিদেশ যেতে মরিয়া হয়ে উঠছে তা দেখছি আমরা। দুর্গম বনাঞ্চল বা উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিতে মালবাহী ট্রাকে চেপে, বন্দি শিবিরের মতো জায়গায় থেকে বিদেশে যেতে কত করুণ মৃত্যু ঘটছে। এ থেকেও বোঝা যায় বেকারত্বের চাপ কত তীব্র। আর যারা কর্মে আছেন, তাদের মধ্যে কৃষি ক্ষেত্রে নিয়োজিত রয়েছেন ২ কোটি ৪৭ লাখ, শিল্পে ১ কোটি ২৪ লাখ এবং সেবা ক্ষেত্রে যুক্ত রয়েছেন ২ কোটি ৩৭ লাখ মানুষ। আর শ্রমশক্তির বাইরে ৪ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ, যা মোট শ্রমশক্তির ৪২ শতাংশ। এছাড়া যারা শ্রমশক্তির বাইরে রয়েছেন, তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৩ কোটি ৫০ লাখ আর পুরুষ ১ কোটি ৬ লাখ। অন্যদিকে শহরের চেয়ে গ্রামে এ হার অনেক বেশি। গ্রামে শ্রমশক্তির বাইরে থাকা মানুষ ৩ কোটি ১৪ লাখ আর শহরে ১ কোটি ৪২ লাখ। এই অংশটি কোনো কাজে যুক্ত না থাকলেও বিবিএসের হিসাবে তারা বেকার নয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এরাও বেকার। আইএলওর সংজ্ঞার সঙ্গে সংগতি রেখে বিবিএস বেকারের আর একটি নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজ পায় না যারা, তারা সম্ভাবনাময় কিন্তু তাদের কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এদের ছদ্ম বেকার বলা যায়। দেশে এমন ধরনের কাজ করে যারা তাদের সংখ্যা প্রায় ৬৬ লাখ। এরা যোগ্যতা বা পছন্দ অনুযায়ী কাজ না পেয়ে টিউশনি, রাইড শেয়ারিং, ফাস্টফুডের দোকানের বিক্রয়কর্মী, কল সেন্টারের কাজসহ অনেক ধরনের কাজ করছেন। তারা তাদের স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা এবং যোগ্যতার চাইতে নিম্নমানের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। কোনো না কোনো ধরনের কাজে নিয়োজিত যুবকদের এই বিরাট অংশ করোনার আঘাতে একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
দেশের কর্মজীবীদের ৮৫ শতাংশ বেসরকারি খাতে কর্মরত। তাদের অনেকেই মাঝারি মানের বেতন পেতেন। মাসে ৫০ হাজার টাকার ওপরে আয় করতেন এমন চাকরিজীবীর সংখ্যাটাও একেবারে কম ছিল না। তাদের শিক্ষাগত দক্ষতা উচ্চমানের, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে অভিজ্ঞতার ঝুলিটাও বেশ পুষ্ট কিন্তু করোনা তাদের এক অনিশ্চিত জীবনের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যাদের বয়স ৪০/৪৫ তারা এখন কোথায় যাবেন? তাদের এতদিনের যাপিত জীবনের ধারা, সন্তানদের লেখাপড়া, ভবিষ্যৎ জীবন সব নিয়ে অন্ধকার দেখছেন তারা। কাজ হারালে কারও কাছে হাত পাতারও উপায় নেই তাদের।
গার্মেন্টস খাত নিয়ে কথা হচ্ছে প্রচুর, এ খাতের ৪০ লাখ শ্রমিকের মধ্যে ১০/১২ লাখ কাজ হারাবেন বলা হচ্ছে। আবাসন প্রকল্পগুলো হুমকির মুখে, ফলে ৩৫/৪০ লাখ নির্মাণ শ্রমিকের কাজ অনিশ্চয়তার মধ্যে। পরিবহন খাতের ৫০ লাখের মধ্যে কতজনের কাজ থাকবে আর কতজন কাজ হারাবে তা নিশ্চিত নয়। পর্যটনকেন্দ্রিক হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ, প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কর্মহীন। মানুষের আয় কমে গেলে খাদ্যপণ্য, ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ছাড়া অন্য কিছু কিনতে চাইবে না। ফলে ঝলমলে সেবা খাত জৌলুশ হারাবে আর কর্মহীন হবে লাখো মানুষ। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বিদেশ প্রত্যাগত ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষের চাপ। সব মিলে অদৃশ্য করোনা দৃশ্যমান বেকারের মিছিল দীর্ঘতর করবে।
৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে এ ক্ষেত্রে পদক্ষেপ আর প্রস্তুতি তেমন দেখা যায়নি। কর্মসংস্থান যেন ব্যক্তিগত উদ্যোগ আর বাজারের ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্রের যেন কোনো দায়িত্ব নেই। করোনাক্রান্ত পৃথিবীতে আগামী ২/৩ বছর যদি টিকে থাকতে হয় তাহলে কৃষি খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ফসল, সবজি, ফল, মাছ, গবাদিপশু, পোলট্রিসহ কৃষি উৎপাদন বহুমুখীকরণ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শুধু যে অর্থনৈতিক ঝুঁকিকে সামাল দেবে তাই নয়, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করবে। খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলা করে অনাহার থেকে বাঁচাতে, বর্ধিত বেকারের চাপ সামাল দিতে, আমদানি কমিয়ে রপ্তানি বাড়াতে বৈজ্ঞানিক কৃষির ওপর জোর দেওয়াটা প্রয়োজনীয়। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের সাময়িক মুনাফার দিকে নজর এত বেশি যে আসন্ন বিপদকে বুঝে তা মোকাবিলা করার পদক্ষেপ নেওয়ার দিকে মন নেই। কাজ করতে হলে হাত-পা নাড়াতে হয়। তবে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অনুযায়ী হাত-পা না নাড়ালে শরীর ক্লান্ত হয় কিন্তু কাজ হয় না। এলোমেলো পা ফেলেও তেমনি এগোনো যায় না। করোনা সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় তাই দরকার সুনির্দিষ্ট ও সুচিন্তিত পদক্ষেপ। যেখানে মুনাফার চেয়ে মানুষকে প্রয়োজনীয় ভাবা হবে।
লেখক
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
rratan.spb@gmail.com