চট্টগ্রাম বন্দরের বৃহৎ বে-টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প

চীন, ভারতকে হটিয়ে শর্টলিস্টে সিঙ্গাপুর, সৌদি

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) প্রস্তাবিত অত্যাধুনিক বে-টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে দ্য পোর্ট অব সিঙ্গাপুর অথরিটি (পিএসএ) বা পিএসএস টার্মিনাল ও সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালকে (আরএসজিটি) সংক্ষিপ্ত তালিকায় (শর্ট লিস্ট) অন্তর্ভুক্ত করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। চবক বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দশ কিলোমিটার উত্তরে বঙ্গোপসাগরের হালিশহর উপকূলবর্তী এলাকায় বৃহৎ পরিসর ও গভীরতাসম্পন্ন এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় জিটুজির মাধ্যমে বে-টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালিত হবে। প্রকল্পটি ২০২৫ সাল নাগাদ বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চবকের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্পটির দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র রাফিউল আলম দেশ রূপান্তরকে জানান, চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৮ দেশের ৯টি কোম্পানি বে-টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে তাদের অভিজ্ঞতা, সক্ষমতার নানা শর্ত পূরণ করে আগ্রহপত্র দাখিল করেছিল। এর মধ্যে অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সিঙ্গাপুরের পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল ও সৌদি আরবের আরএসজিটিকে শর্ট লিস্টে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তবে তাদের সঙ্গে নির্মাণ চুক্তি বা কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়টি আমাদের নানা শর্ত ও উভয়পক্ষের চূড়ান্ত সমঝোতার ওপর নির্ভরশীল।

প্রকৌশলী রাফিউল আলম জানান, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে    অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উঁচুমানের এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেকগুলো টেকনিক্যাল ও বৈষয়িক দিক রয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগের অঙ্ক, রাজস্বের অংশীদারত্ব, নির্মাণকাজ পরিচালনার মেয়াদকাল, কাজের ক্ষেত্র ও পরিমাপসহ বহু খুঁটিনাটি দিক রয়েছে। এ ব্যাপারে সমীক্ষা বা ফিজিবিলিটি স্টাডির জন্য পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

আগামী সেপ্টেম্বর নাগাদ পরামর্শক (কনসালটেন্ট) নিয়োগ দান সম্ভব হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, সমীক্ষা প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর শর্ট লিস্টেড প্রতিষ্ঠান দুটোর সঙ্গে সমঝোতা বৈঠক হবে। এরপর বে-টার্মিনাল নির্মাণকাজে হাত দেওয়া যাবে। আপাতত ২০২৫ সালকে প্রকল্প বাস্তবায়নের টার্গেট ইয়ার ধরে কাজ এগোচ্ছে বলে তিনি জানান।

বে-টার্মিনাল নির্মাণের নির্ধারিত স্থানে ভূমি অধিগ্রহণের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে চবকের ল্যান্ড অফিসার জিল্লুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ৮৭১ একর ভূমির মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ের ৬৮ একর ভূমি দুই বছর আগেই ক্ষতিপূরণ দিয়ে বুঝে পেয়েছি। বাদবাকি ৮০৩ একর সরকারি খাসজমি বন্দর কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়টি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। মহামারী কভিড-১৯ এর কারণে খাসজমি বুঝে পেতে এই বিলম্ব বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, পতেঙ্গা মোহনার অদূরবর্তী হালিশহর উপকূলে সমুদ্রে জেগে ওঠা চরে বে-টার্মিনালের অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। তীর থেকে ৮০০ মিটার দূরে ওই চরে সৃষ্ট নতুন একটি চ্যানেল ড্রেজিং এবং সামুদ্রিক ঢেউ কিংবা ঝড়-জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধে জল নিয়ন্ত্রক (ওয়াটার ব্রেকিং) বাঁধ নির্মাণ করে নতুন এই বন্দর তথা বে-টার্মিনাল নির্মাণ করা যাবে।

বন্দর কর্মকর্তারা জানান, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০০ মিটার প্রস্থের বাস্তবায়নাধীন বে-টার্মিনালে ১০ থেকে ১২ মিটার ড্রাফটের মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) ভেড়ানো যাবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে কেবল জোয়ারের সময় ৯মিটার ড্রাফট বা গভীরতার জাহাজ ভেড়ানো যায়। এসব ড্রাফটের জাহাজে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮০০ টিইইউস (টুয়েন্টি ফিট ইক্যুয়াল ইউনিট) কন্টেইনার বোঝাই করা যায়। পক্ষান্তরে বে-টার্মিনালে প্রতি জাহাজে ৫ হাজার টিইইউস কন্টেইনার বোঝাই করা যাবে। যা চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম অনেক গতিশীল ও কন্টেইনার জটমুক্তকরণসহ বন্দরে জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় অনেক কমিয়ে দেবে।

তাছাড়া, সমুদ্র উপকূলে চট্টগ্রাম-ফৌজদারহাট মেরিন ড্রাইভের পাশে নির্মাণ হচ্ছে বে-টার্মিনাল। এতে আমদানি-রপ্তানি পণ্য নিয়ে ট্রাক, লরি, কাভার্ড ভ্যানগুলো শহরের যানজট এড়িয়ে সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রামে চলাচল করতে পারবে। ফলে ব্যবসায়ীরা সময় ও অর্থ সাশ্রয় করে লাভবান হতে পারবেন বলে বন্দরের স্টেকহোল্ডাররা বে-টার্মিনাল নিয়ে ভীষণ আগ্রহী। নতুন এই বন্দরে পশ্চাৎসুবিধা সংবলিত ১ হাজার ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ১টি, ১ হাজার ২২৫ মিটার দৈর্ঘ্যরে ১টি ও ৮৩০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ২টি আধুনিক যন্ত্রপাতি সজ্জিত টার্মিনালসহ ১৩টি সাধারণ জেটি থাকবে।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পগুলোর অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।