প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ভয়াল ধাবায় এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে মধ্যপ্রাচ্য। একদিকে দেশগুলোতে ক্রমশ করোনা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে, অন্যদিকে দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংকট আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল কর্মক্ষেত্রের সিংহভাগের কর্মীই বিভিন্ন দেশের অভিবাসী শ্রমিক। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে দেশটির ধনী শ্রেণি তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছেন অভিবাসী শ্রমিকরা; বিশেষত সৌদি আরবের বিপুলসংখ্যক অভিবাসী শ্রমিকের সংকট যেন আরও বেশি। কারণ এমন একসময়ে করোনা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যখন অনেক শ্রমিকেরই ভিসার মেয়াদ শেষ।
আটকে পড়া অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা অবৈধভাবে সৌদিতে অবস্থান করছেন। তাদের জন্য পরিস্থিতি যেন আরও ভয়াবহ। একদিকে কোম্পানিগুলো তাদের কোনো দায়িত্ব নিচ্ছে না, অন্যদিকে মহামারীর সঙ্গে তাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ছোট ছোট ঘর ও পর্যাপ্ত রসদ ছাড়া দিনের পর দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের।
গোটা সমস্যার মূলে আছে কাফালা বা স্পন্সরশিপব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার অধীনে অভিবাসী শ্রমিকরা এক অর্থে সৌদি মালিকদের দাসে পরিণত হয় বলে এক প্রতিবেদনে জানায় এএফপি। ওই মালিকদের অনুমতি ছাড়া সৌদি আরবে প্রবেশ ও বের হওয়া ছাড়া কাজও পরিবর্তন করা যায় না। অবৈধভাবে সৌদিতে কর্মরত শ্রমিক ৪৫ বছর বয়সী হাতেম। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া থেকে বাঁচতে রিয়াদে লুকিয়ে আছেন তিনি। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘আমার ছয় সন্তান, বৃদ্ধা মা, আমার বোন সুদানে রয়েছে। তারা খুবই ভয়াবহ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। আমিও এখানে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এই কাফালা ব্যবস্থা ন্যায্য নয়।’ সৌদিতে কমবেশি এক কোটি অভিবাসী শ্রমিক রয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েক লাখ শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু হাতেমের মতো বহু শ্রমিক যারা এখনো ঋণের ফাঁদে আটকে আছেন তারা চাইলেও সৌদি ছাড়তে পারছেন না।
মাইগ্র্যান্ট রাইটস নামের একটি আইনি সংস্থার গবেষক আন্নাস সাকের বলেন, ‘সৌদি সরকারের উচিত অবৈধ শ্রমিকদের ক্ষমা করে দিয়ে তাদের দেশে ফেরার সুযোগ করে দেওয়া।’ তবে হ্যাঁ, এ অবস্থার মধ্যেও অনেকে দেশে ফিরতে পারছেন। তারা হলেন করোনায় আক্রান্ত শ্রমিকরা। শ্রমিকদের মধ্যে যাদের করোনা ধরা পড়ছে তাদের সৌদি সরকার দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। ফলে হাতেমের মতো অনেকেই এখন প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরতে নিজেদের শরীরে করোনাভাইরাস ধরা পড়–ক তা চাইছেন। সৌদিতে এখন পর্যন্ত দুই লাখ মানুষ আক্রান্ত ও দুই হাজারের বেশি মারা গেছে করোনায়। হাসপাতাল সূত্রগুলো বলছে, সৌদি হাসপাতালগুলোতে কর্মরত অনেক ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীও মারা যাচ্ছেন নিবিঢ় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে। সৌদি আরবের স্থানীয়রা তাদের দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তারের জন্য অভিবাসী শ্রমিকদের দায়ী করছেন। ফলে সামাজিক স্তরে অভিবাসী শ্রমিকবিরোধী চেতনা কাজ করছে, যা আরও শঙ্কার ব্যাপার। সৌদি আরবের একটি পত্রিকায় এক কলামনিস্ট তো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অতিরিক্ত অভিবাসী শ্রমিকদের বের করে দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কাফালাব্যবস্থায় ত্রুটি থাকার ফলে সৌদিতে অভিবাসী শ্রমিকরা এমনিতেই ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। বাড়তি হিসেবে করোনাভাইরাস মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে।