যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর পর বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোয় জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল ও গ্যাসের সরবরাহে ব্যাপক বিঘœ ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নয়, এটি বিশ্ব ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর বিশ্বের স্থিতিশীলতার রক্ষক নয়, বরং বিশৃঙ্খলার হোতা হয়ে উঠেছে। এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক দেশ এখন নতুন বাস্তবতা মেনে নিয়ে নিজেদের অর্থনীতি ও কৌশল পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের তেল সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এর মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। ২০২৫ সালে এই প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেল ও তেলজাত পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশের গন্তব্য ছিল এশিয়া। কিন্তু ইরানের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপে প্রণালিটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখান দিকে নৌযান যাতায়াত ৯০ শতাংশ কমে গেছে। ফলে এশিয়ার দেশগুলোয় জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।
ভারত সরকার সাধারণ নাগরিকদের রক্ষায় প্লাস্টিক শিল্পে তরলীকৃত গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। কারণ, এলপিজি ভারতে রান্নার প্রধান জ্বালানি। নেপাল সরকার গ্যাস রেশনিং করেছে। ফিলিপাইন সরকারি কর্মসপ্তাহ চার দিনে নামিয়ে এনেছে, সেখানে জারি করা হয়েছে ‘জ্বালানি জরুরি অবস্থা’। বাংলাদেশে জ্বালানি সাশ্রয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণাসহ জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে।
এশিয়ার অর্থনীতি গড়ে তাদের খরচের এক-তৃতীয়াংশের বেশি জ্বালানি আমদানি করে। দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় ৮০ শতাংশ জাপান ৯০ শতাংশ এবং থাইল্যান্ড ৫৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানি করে, যার বড় অংশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। এই সংকটের ফলে এশিয়ায় মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইউরোপ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর কম নির্ভরশীল হলেও আমদানিকৃত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। যুদ্ধ শুরুর পর প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়েছে। বড় ধরনের পতন হয়েছে ইউরোপ ও এশিয়ার পুঁজিবাজারগুলোতে।
বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ইনডেক্স মাত্র ৫ শতাংশ পড়েছে। এ ছাড়া সার্বিকভাবে দেশটির অর্থনীতিও তুলনামূলক স্থিতিশীল। এর কারণ, দেশটির অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রাচুর্য। এটি যুক্তরাষ্ট্রের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৩৬ শতাংশ মেটায়; যা দেশটির ভোক্তাদেরও আন্তর্জাতিক দর ওঠানামা থেকে অনেকাংশে রক্ষা করে।
গার্ডিয়ান বলছে, উল্লেখিত তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা দেখালেও বিশ্ব অর্থনীতিতে সেটি একটি অস্বস্তিকর অধ্যায় যোগ করেছে। এক সময় যুক্তরাষ্ট্র ছিল নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার রক্ষক। এখন সে নিজেই সেই ব্যবস্থার শত্রুতে পরিণত হয়েছে। শত্রু-মিত্র উভয়ের মধ্যে বিভেদ- সংঘাত ছড়িয়ে দিয়ে নিজে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গত বছর এপ্রিলে ট্রাম্প যে শুল্কের ঝড় শুরু করেছিলেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নতুন অভিযানের প্রথম ধাপ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই শুল্কের বোঝা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরাই বহন করছেন। কিন্তু ক্ষতি ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী। যুক্তরাষ্ট্রে অনেক দেশের রপ্তানি কমে গেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি মূলত অক্ষত রয়েছে। ইরান যুদ্ধের আগে জানুয়ারিতে আইএমএফ যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস করেছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের অক্টোবরের পূর্বাভাসের চেয়ে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য, জাপান, কানাডা, ভারত, ইউরো এলাকা এবং লাতিন আমেরিকার প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার পর নিম্নমুখী হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ইরান যুদ্ধের ক্ষতি মূল্যায়ন করেছে। সংস্থাটি বলছে, যদি জ্বালানির দাম উচ্চ থাকে, তাহলে এ বছর পণ্য বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৫ শতাংশ হবে। উত্তর আমেরিকার রপ্তানি প্রবৃদ্ধি সামান্য কমবে। আর ইউরোপে রপ্তানি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধির পরিবর্তে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হবে। ডব্লিউটিও বলছে, উত্তর আমেরিকায় জ্বালানির উচ্চমূল্য জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশে বাড়াবে, এশিয়ায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ১ শতাংশ হবে এবং ইউরোপে ১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছাড়াও এই যুদ্ধের প্রভাব অন্যান্য ক্ষেত্রে পড়ছে। ব্রাজিলের ৭০ শতাংশ এবং ভারতের ৪০ শতাংশ ইউরিয়া আমদানি গালফের মাধ্যমে হয়, যা কৃষিতে অপরিহার্য। গালফ দেশগুলো তাদের খাদ্যের বড় অংশ আমদানি করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ।
এ ছাড়া বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে গালফে কর্মরত লাখ লাখ প্রবাসীর রেমিট্যান্স কমে যাবে।
গার্ডিয়ান বলছে, জ্বালানি অর্থনীতির এই বিঘœ জলবায়ুর জন্যও ভালো নয়। পরিবেশবাদীরা আশা করতে পারেন যে, এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে উৎসাহিত করবে, কিন্তু বাস্তবতা হয়তো তেমন না। কারণ, এশিয়ায় ইতিমধ্যে কয়লার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, লিবারেল পশ্চিমের প্রাক্তন মিত্ররা এখন বুঝতে পারছে যে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র আর আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার নির্ভরযোগ্য অংশীদার নয়, বরং বিশ্ব অনিশ্চয়তার প্রধান উৎস। ট্রাম্প তার আগ্রাসনের জন্য নানা অজুহাত দিচ্ছেন। তিনি বলেছেন, ইরান পরমাণু হুমকি দিচ্ছে, অথচ গত বছরই তিনি দাবি করেছিলেন ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করেছেন। শুল্ক বাড়ানোর জন্যও তিনি নানা যুক্তি দিচ্ছেন। ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড ও পানামা খাল দখলের মতো পদক্ষেপের জন্য হয়তো নতুন কোনো অজুহাত দাঁড় করাবেন।
দ্য গার্ডিয়ানের কলাম লেখক কেনেথ রথ বলছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা প্রমাণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেষ্টা রিচার্ড নিক্সনের ভিয়েতনামে ‘সম্মানজনক শান্তি’ (পিস উইথ অনার) খোঁজার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। এই অধরা লক্ষ্যের খোঁজে নিক্সন বছরের পর বছর মৃত্যু ও ভোগান্তি ডেকে এনেছিলেন।
১৯৭৩ সালের জানুয়ারির প্যারিস শান্তিচুক্তি থেকে ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে সাইগনের পতনদুই বছরের বিরতি নিশ্চিত করতে নিক্সন ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ভিয়েতনামের জনগণের ওপর চার বছর ধরে বোমাবর্ষণ করেন। প্রতিবেশী দেশ কম্বোডিয়া ও লাওসেও তা ছড়িয়ে যায়। এ সময় ২০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়। আর ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাওসের মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল এর বহুগুণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানেও ঠিক একই কাজ করছেন ট্রাম্প। একেক সময় ট্রাম্পের একেক কথার কারণে সংঘাত হয়তো না কমে বাড়তে থাকবে। আর ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট হবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়। যার দায় বর্তাবে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই।
তাদের মতে, ২০২৮ সালের নির্বাচনের পর বা কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণের পরও যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসন শেষ হবে না। ট্রাম্পের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী রিপাবলিকান সমর্থকদের (মাগা বা মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) একটি বড় অংশ বিশ্বের বাকি অংশকে বিশ্বাসঘাতক ও শোষক হিসেবে দেখে। এ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো মানুষকে তাদের তাদের সমকক্ষ মনে করে না। এই রাজনৈতিক শক্তি সহজে যাবে না। আর সেই শক্তিই বিশ্বকে অশান্ত করার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতুন পরিচয়’ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবে।
