দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পোশাক উৎপাদনকারী গ্রুপ অব কোম্পানি গত ৩৬ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে পোশাক রপ্তানি করছে। নামিদামি সব ব্র্যান্ডেরই কাজ করে কোম্পানিটি। কিছু ক্রেতা ৩৬ বছরই তাদের সঙ্গে ব্যবসা করছেন। তবে করোনার প্রকোপ শুরুর পর অনেক ক্রেতা পণ্য নিতে অস্বীকৃতি জানান। অনেকে ক্রয়াদেশ স্থগিতও করেন। আর এখন নতুন অর্ডারের ক্ষেত্রে তারা পণ্যের দাম স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ‘অনেক’ কমিয়ে ধরছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা ৪২ হাজার। শত শত কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ আছে। কাজ না থাকলে এই শ্রমিক নিয়ে আমি কোথায় যাব? আমাকে তো বসে থাকতে হবে। তাই বাধ্য হয়ে একেবারে কম দামে কাজ নিচ্ছি, যাতে অন্তত শ্রমিকদের বেতনটা পকেট থেকে দিতে না হয়।’ আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব দেশ। তাই যেকোনো দামে কাজ নিতে বাধ্য। ক্রেতারা অন্যায়ভাবে সেই সুযোগটি নিচ্ছেন।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রপ্তানি সমিতির সভাপতি ও বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী এমপি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার কারণে বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা কমেছে এটা ঠিক। করোনায় বিশ্বের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। এই সুযোগে ক্রেতারা দাম কমাচ্ছেন, পণ্যের মূল্য দিতে দেরি করছেন। এটার কারণে ছোট-বড় সব কারখানাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা কাজ নিতে পারছি না। আগামী তিন মাস আমাদের খুব খারাপ যাবে বলে মনে হচ্ছে।’
বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক বলেন, ‘আমাদের কারখানাগুলোর এখন গড়ে কাজ আছে ৪৫-৫০ শতাংশ। খুব খারাপ অবস্থা যাচ্ছে আমাদের। ভালো নতুন অর্ডারও পাচ্ছি না, যা আছে তারও দাম কম। সামনে কী হবে জানি না।’
পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, করোনাকালে কাজ না থাকায় তাদের ২২৭৪টি কারখানার মধ্যে ৩৪৮টি উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। গার্মেন্টস মালিকদের আরেক সংগঠন বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, তাদের সদস্যভুক্ত ৮১৩টি কারখানার মধ্যে ৫০টি বন্ধ আছে। যেসব কারখানা সচল আছে বর্তমানে কাজের পরিমাণও অনেক কমে গেছে। কিছু কিছু কারখানায় তা ৪০ শতাংশের নিচে নেমেছে। অনেক কারখানা তাই খরচ বাঁচাতে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু করেছে। এই খাতের কয়েকজন উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত কারখানাগুলোতে কাজ শুরু হওয়ার অন্তত দুই মাস আগে অর্ডার কনফার্ম হয়। এরপরে চলে স্যাম্পলিং, সুতা/কাপড় আমদানি বা প্রস্তুতের কাজ। কিন্তু বেশিরভাগ কারখানায় এখনো সেপ্টেম্বরের তেমন কোনো অর্ডার নেই। তাই কারখানা মালিকরা ধরনা দিচ্ছেন ক্রেতাদের কাছে। আর ক্রেতারাও এই সুযোগটি নিচ্ছেন। করোনাভাইরাসের কারণে ইউরোপ ও আমেরিকায় বিক্রি অনেক কম এমন অজুহাত দেখিয়ে পণ্যের দাম ইচ্ছেমতো কমিয়ে ধরছেন।
কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, অনেক ক্রেতা তাদের পণ্যের দাম ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর প্রস্তাব দিচ্ছেন। অথচ একটি পণ্যে এর অর্ধেকও লাভ করা সম্ভব হয় না। বেশিরভাগ পণ্যে লাভ হয় ৩-৫ শতাংশ। ক্রেতারা এখন যে প্রস্তাব দিচ্ছেন তা মেনে নিলে খরচই উঠবে না। অবশ্য বড় কারখানাগুলো ভালো ব্র্যান্ডের কাজ করায় কিছুটা ভালো দাম পাচ্ছে। তাদের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে কিছু বুকিংও আছে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো ছোট ব্র্যান্ডের কাজ বেশি করে। দাম কমানোয় এসব কারখানা পর্যাপ্ত বুকিং নিতে পারছে না। এ কারণে আগামী সেপ্টেম্বরে কারখানাগুলোকে নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে। ওই সময়ে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়েও সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, শুধু বাংলাদেশ না, অধিকাংশ পোশাক রপ্তানিকারক দেশই এখন দাম সংকটে ভুগছে। জার্মানির সহযোগিতায় এশিয়ার পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন স্টার নেটওয়ার্ক তাদের সদস্যদের নিয়ে গত সপ্তাহে একটি অনলাইন বৈঠক করে। বৈঠকে চীন বাদে অন্যসব দেশের কারখানা মালিকদের প্রতিনিধিরা জানান, তাদেরও আগামী আগস্ট-সেপ্টেম্বরে খুব বেশি কাজ নেই। ক্রেতারা দাম কমানোয় তারা নতুন করে অর্ডারও নিতে পারছেন না। তাই আগামী দিনগুলো নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। চীন তাদের কাজের বিষয়ে বৈঠকে স্পষ্ট করে কিছু বলেনি।
এই খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে পোশাক মালিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন আইএএফ-এর পরিচালক ফজলে শামীম এহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এতদিন ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করেছেন। এখন আবার নীতি-নৈতিকতার বাইরে গিয়ে পণ্যের দাম কমাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে অনেক ব্যবসায়ীই আর টিকে থাকতে পারবেন না।’ বিকেএমইএর এই পরিচালক আরও বলেন, ‘পোশাকের ন্যায্য ক্রয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এই মাসের শেষের দিকে স্টার নেটওয়ার্ক ও আইএএফ যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে। এ সংক্রান্ত একটি বৈঠক হবে। সঠিক ক্রয় ব্যবস্থা কীভাবে আইনের অধীনে আনা যায় এজন্য আমরা ইউরোপ ও আমেরিকার আইনজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করব। যদি এটি নিশ্চিত করা যায় তাহলে ক্রেতাদের দৌরাত্ম্য কিছুটা কমবে।’