তিন বড় হাসপাতাল ও একাধিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা

স্বাস্থ্যসেবার নামে নৈরাজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম-প্রতারণায় জড়িত দুষ্টচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে সরকার। রিজেন্ট হাসপাতালের জালিয়াতি ও প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসার পর রাজধানীসহ সারা দেশে অনিয়মে সম্পৃক্ত অন্য হাসপাতালগুলোতে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবা খাতে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। একই সঙ্গে বিতর্কিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া (জিকে)  শামীম ও ক্রিসেন্ট গ্রুপের মোহাম্মদ সাহেদের মতো সশস্ত্র দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে দামি গাড়িতে চলাফেরা করা ব্যক্তিদের বিষয়েও খোঁজখবর নিচ্ছে গোয়েন্দারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), র‌্যাব, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিআইএফইউ), ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (ডিবি), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা স্বাস্থ্যসেবার নামে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত প্রতিষ্ঠান ও দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরা করা ব্যক্তিদের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছে। একই সঙ্গে তারা বিদেশে অর্থ পাচার করেছে কি না সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে রাজধানীর অভিজাত তিনটি হাসপাতালসহ সারা দেশে বেশ কয়েকটি হাসপাতালে অনিয়ম ও প্রতারণার খোঁজ পেয়েছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। আগামী সপ্তাহে রাজধানীর গুলশান এলাকার একটি ও ধানমণ্ডির দুটি হাসপাতালে অভিযান চালানো হতে পারে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত একাধিক গ্রুপ অব কোম্পানির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। তাদের বিরুদ্ধেও অভিযানে নামবে র‌্যাব। এর মধ্যে একটি গ্রুপ অব কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ কয়েকজনকে শিগগিরই আইনের আওতায় আনা হবে বলে আভাস মিলেছে।

অনিয়মকারী হাসপাতালে অভিযান অব্যাহত থাকবে কি না, জানতে চাইলে র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অনিয়মকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম অনুসন্ধানে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখা কাজ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা জনগণের অসহায়ত্ব নিয়ে ব্যবসার নামে অবৈধ কারবার করছে, প্রতারণা করছে তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে একশ্রেণির ‘ব্যবসায়ী’ নামধারী ব্যক্তি সশস্ত্র দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে চলাফেরা করেন। তাদের কারও কারও ছোটখাটো রাজনৈতিক পরিচয়ও আছে। তারা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা ও আমলাদের সঙ্গে তোলা ছবি ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবারসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহার করে নিজেদের জাহির করার চেষ্টা করেন। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে ভিভিআইপিদের ছবি ‘সুপার ইম্পোজিং’ করে ব্যবহারেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব সুবিধাভোগী ব্যক্তি নিজেদের অফিস ও বাসায়ও ভিভিআইপিদের সঙ্গে তোলা ছবি টানিয়ে রেখে নানামুখী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। সশস্ত্র দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত ও জাহির করা ব্যক্তিরা মসজিদে যাওয়ার সময়ও দেহরক্ষী নিয়ে যান। তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক টিম। তারা কীভাবে অস্ত্রের লাইসেন্স পেল, কত অস্ত্রের লাইসেন্স আছে, তাদের আয়ের উৎস কী এসব বিষয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের বিষয়ে অভিযানে নামার জন্য ডিবি কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের সবুজ সংকেত পেয়েছেন। এ ছাড়া একাধিক ব্যক্তিকে ডিবি কার্যালয় ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দপ্তরে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। তার মধ্যে গুলশানের একটি এমএলএম কোম্পানির প্রধান নির্বাহী (সিইও) কর্মকর্তাও রয়েছেন।

ডিবি পুলিশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, “আমরা পর্যবেক্ষণে দেখেছি, জিকে শামীম ও মোহাম্মদ সাহেদের মতো একশ্রেণির ‘নব্য ব্যবসায়ী’ ছোটখাটো রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সব সময় সশস্ত্র দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে চলাফেরা করেন। তাদের মধ্যে যারা অনিয়ম, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিতে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ঢাকা মহানগর পুলিশের ধানমণ্ডি বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার আব্দুল্লাহিল কাফী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লাইসেন্স করা অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করার পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র নিয়েও একশ্রেণির রাজনৈতিক কর্মী এলাকায় নানামুখী প্রভাব বিস্তার করেন। এমন পাঁচজনের একটি দলকে গত সোমবার গ্রেপ্তারও করেছে হাজারীবাগ থানা পুলিশ। পরে জানা গেছে তাদের মধ্যে একজন ঢাকা মহানগর উত্তরের ১৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও একজন ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক।’

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি), স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, নার্সিং অধিদপ্তর ও বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের দুর্নীতি অনুসন্ধানের জন্য টিম গঠন করে কাজ করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে অর্ধশত কর্মকর্তা ও দুই ডজনেরও বেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭ জনকে ইতিমধ্যে দুদক জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। গতকাল মেডিটেক ইমেজের পরিচালক হুমায়ুন কবীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ ছাড়া তলব করা হলেও গতকাল হাজির না হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে বক্তব্য পাঠান লেক্সিকোন মার্চেন্ডাইজ ও টেকনোক্র্যাট লিমিটেডের মালিক মো. মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু। তবে দুদক সেটি গ্রহণ করেনি।

দুদক সচিব মোহাম্মদ দিলওয়ার বখত গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্য মিলেছে। কমিশনের অনুসন্ধানে যার নাম আসবে তাকেই তলব করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রিজেন্ট হাসপাতালের অনিয়মের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা এ বিষয়ে তদন্ত করব। অনুসন্ধানের পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে বিএফআইইউ গতকাল রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে। সব ব্যাংকে চিঠি দিয়ে আগামী ৩০ দিনের জন্য এ নির্দেশনা পরিপালন করতে বলা হয়েছে। বিএফআইইউর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘শুধু সাহেদ নয়, আমরা আরও কিছু ব্যক্তির বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের বিষয়ে আমরা কাজ করছি।’