প্রতিশ্রুতি পালনের শিক্ষা পরিবার থেকে শুরু হোক

ইসলামের শেষ নবী হজরত মুুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন প্রতিশ্রুতি রক্ষার ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল প্রতীক। নবী করিম (সা.) কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেননি। তিনি কখনো প্রতিশ্রুতি দিলে যেকোনো মূল্যে তা পালন করতেন। তিনি শত্রুর সঙ্গেও প্রতিশ্রুতি রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলামি দর্শনে ওয়াদা পালনের ব্যাপারে শত্রু-মিত্র, মুসলিম-অমুসলিমে কোনো ভেদাভেদ নেই। কারণ ওয়াদা পালন করা তাকওয়াপূর্ণ জীবনযাপনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইসলাম মানুষকে উন্নত চরিত্রের যেসব শিক্ষা দেয়, তার মধ্যে একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রতিশ্রুতি রক্ষা। প্রতিশ্রুতি পূরণ করার ক্ষমতা থাকা অবস্থায় এবং প্রতিশ্রুতি পালনে শরিয়তের কোনো আপত্তি না থাকলে যেকোনো মূল্যে তা পূরণ করতে হবে। এটাই ইসলামের শিক্ষা ও আদেশ।

আমরা সাধারণত অবলীলায় শিশু সন্তানদের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকি। অনেকের ধারণা বয়সে ছোট হওয়ায় তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি না মানলেও চলবে। কিন্তু এই ধারণা একেবারে ভুল। কারণ শিশু প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন দেখে নিজে যেমন কষ্ট পায় তেমনি তার মধ্যে প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের অভ্যাস গড়ে ওঠে। ওয়াদা ভঙ্গ করা মনোভাব নিয়ে সে বড় হয়। এ কারণে সন্তানকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে সেটা পালন করা উচিত। আপনি যদি তাদের দেওয়া কথা রক্ষা না করেন তাহলে সেও আপনাকে কথা দিয়ে কথা রক্ষা করবে না। আপনি যদি তার কথা রাখতে পারেন তাহলে তাকে ‘হ্যাঁ’ বলুন, আর যদি না পারেন তাহলে ‘না’ বলুন। সন্তানকে কোনো অবস্থায়ই দ্বিধার মধ্যে রাখবেন না। একই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য সন্তানকে পুরস্কার দিতে হবে।

এই অভ্যাসটি শিশুদের মাঝে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার শৃঙ্খলাবোধ তৈরি করবে। আপনাকে দেখে দেখে সে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে শিখবে, বন্ধুদের সঙ্গে করা প্রতিজ্ঞার মর্যাদা রক্ষা করবে। প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর যদি আপনি তা পালন না করেন, তাহলে শিশুর মন ভেঙে যাবে। মোট কথা, সন্তানকে কোনো কথা দিলে সে কথা রাখতে হবে। এতে সন্তানও শিখবে প্রতিশ্রুতি পালন করতে হয় অর্থাৎ কথা দিয়ে কথা রাখতে হয়। শিশুরা সার্বক্ষণিক তার বাবা-মাসহ আশপাশের লোকজনের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং তা রপ্ত করে। আর এ প্রতিফলন ঘটে পরবর্তী জীবনে। শিশুদের দৃষ্টিতে, তার বাবা-মায়ের চেয়ে বেশি মহৎ ও বেশি জ্ঞানী আর কেউ নেই। তারা বাবা-মায়ের ওপরই সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখে। এ কারণে মা-বাবাকে তাদের সন্তানদের সঙ্গে সব কাজ ও আচরণে সৎ হতে হবে এবং তাদের দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। শিশুরা যখন বুঝবে যে, তাদের বাবা-মা তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন, তখন তাদের আস্থা আরও বেড়ে যাবে এবং বাবা-মায়ের কথা আরও বেশি মনোযোগ দিয়ে শুনবে। আসলে শিশুরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে, বড়রা তাদের যা বলেন তা সব সত্য। এর ব্যতিক্রম দেখলে তারা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যায় এবং তাদের আস্থা কমে যায়।

সমাজ ও রাষ্ট্রে চলতে গিয়ে এবং অফিস-আদালতে নানা কাজকর্ম করতে গিয়ে লিখিত-অলিখিত নানা রকম অঙ্গীকার করতে হয়। অফিসের নানা ধরনের কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেন চলে বিশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে। কোনো দেশের ভিসা গ্রহণ করা হলে সে দেশের আইনকানুন মানার জন্য প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কোনো দেশে বসবাসকারীও কার্যত সে দেশের আইনকানুন মেনে চলার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ। নির্বাচনের সময় জয়ী হওয়ার জন্য নানা পর্যায়ের নেতারা জনগণকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। চিকিৎসকরা রোগীর কাছ থেকে তার ভালো সেবার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এভাবে জীবনের বহুক্ষেত্রে মানুষ মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা পরবর্তীকালে পালন করার কথা অনেকেই ভুলে যান। অনেকে মনে করেন, প্রতিশ্রুতি দিয়ে স্বার্থ আদায় করতে পারলেই হলো, এরপর তা পালনের বিষয়টি ভেবে দেখা যাবে। কিন্তু সবার মনে রাখা উচিত, যেকোনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা অপরিহার্য কর্তব্য।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় আমরা নানাভাবে নানাস্থানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এমতাবস্থায় আমরা যদি যার যার জায়গা থেকে নিজেদের দায়িত্ব

যথাযথভাবে পালন করি তাহলে সমাজের প্রায় বেশিরভাগ সমস্যা মিটে যায়। যিনি চাকরি করেন তিনি সেই কর্তৃপক্ষের কাছে দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে সততা ও নিষ্ঠার জন্য চুক্তিবদ্ধ। তিনি তার দায়িত্ব প্রতিশ্রুতিমতো পালন করলে ঘুষ ও দুর্নীতি কমে যাবে। ব্যবসায়ী তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলে, পণ্যে ভেজাল কমে যাবে। এভাবে আমরা সন্তানদের পরিবার থেকে প্রতিশ্রুতি পালনের শিক্ষা দিয়ে বড় করে একটি সোনালি প্রজন্ম গড়ে তুলে অপরাধমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে পারি। এই শিক্ষাটা আমাদের শুরু করতে হবে নিজ নিজ পরিবার থেকে। এ জন্য দরকার নিজেদের উদ্যোগ। 

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক