১৪ ব্রোকারেজে সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি

পুঁজিবাজারের দীর্ঘ মন্দা ও করোনাভাইরাসের প্রভাবে ক্ষতির মধ্যে ব্রোকারেজ হাউজগুলো এখন গ্রাহকদের জমা রাখা অর্থে হাত দিয়েছে। ব্যাংকে আলাদা হিসাবে রাখা গ্রাহকদের অর্থে অফিস খরচ, কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানো হচ্ছে। জুন মাস পর্যন্ত অন্তত ১৪ ব্রোকারেজ হাউজের সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে প্রায় ৪৭ কোটি টাকার ঘাটতি পাওয়া গেছে। গ্রাহকের অর্থ নিয়ে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের মালিকের পালিয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজের দেওয়া তথ্য ও তাৎক্ষণিক পরিদর্শনে এমন অনিয়মের চিত্র দেখতে পেয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এতে বিনিয়োগকারীদের জমা রাখা অর্থ নিয়ে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

স্টক এক্সচেঞ্জটির আশঙ্কা, করোনা পরিস্থিতির কারণে আয় না থাকায় ব্রোকারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রাহকদের জমা টাকায় নিজেদের খরচ চালিয়েছে। কোনো কোনো ব্রোকারেজ হাউজ ব্যক্তিগত প্রয়োজনেও গ্রাহকের অর্থ ব্যবহার করেছে। ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের মালিকের পালিয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও তাৎক্ষণিক পরিদর্শনে মোট ১৪টি ব্রোকারেজ হাউজে গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি পেয়েছে ডিএসই। অবশ্য এরই মধ্যে কয়েকটি ব্রোকারেজ গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি সমন্বয় শুরু করেছে। তবে সবগুলো ব্রোকারেজ হাউজের তথ্য পর্যালোচনা করা হলে সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন ডিএসইর কর্মকর্তারা।

ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের মালিক গ্রাহকদের টাকা হাতিয়ে পালানোর ঘটনার পর ডিএসই ১৭টি হাউজে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে ১০টিতেই গ্রাহক হিসাবে ঘাটতির প্রমাণ পায়। এর বাইরে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে আরও ৪টিতে ঘাটতি পাওয়া যায়। বেশির ভাগ ব্রোকারেজ হাউজের এ ঘাটতির পরিমাণ দুই কোটি টাকার কম। যদিও এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে আপাতত অনেক ব্রোকারেজ হাউজ ধার করে বা সরিয়ে নেওয়া অর্থ ফিরিয়ে এনে ঘাটতি মিটিয়ে নিচ্ছে। কোনো কোনো ব্রোকারকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ঘাটতি পূরণ করার নির্দেশ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি। আর কয়েকটি ব্রোকারকে চলতি মাসের মধ্যে ঘাটতি পূরণের নির্দেশ দিয়েছে ডিএসই। এর বাইরে এসব প্রতিষ্ঠানকে ঘাটতির কারণ দর্শানো নোটিস দেওয়ার পাশাপাশি সরাসরি উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে তলব করেছে ডিএসই।

কোনো অজুহাতেই যেন কোনো ব্রোকারেজ হাউজ গ্রাহকদের অর্থ সরাতে না পারে, তা বন্ধ করতে যেকোনো সময় বিনা নোটিসে ব্রোকারেজ হাউজ সরেজমিন পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর একজন পরিচালক জানান, বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার কেউ সরিয়ে নিচ্ছে কি না, তা রিয়েল টাইমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করতে ব্রোকারেজ হাউজ, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি প্রতিষ্ঠান সিডিবিএল, ব্যাংক হিসাব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির সঙ্গে একটি সমন্বিত (ইন্ট্রিগেটেড) সফটওয়্যার ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি পাওয়া গেছে অ্যাপেক্স ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের। গত ২৪ জুন ডিএসইতে দেওয়া তথ্যে সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে ২১ কোটি টাকারও বেশি ঘাটতি থাকার তথ্য নিজেরাই দিয়েছে এই ব্রোকারেজ হাউজটি। একইভাবে ইউনিক্যাপ সিকিউরিটিজও ৬ কোটি টাকা ঘাটতির কথা জানিয়েছে। আর ডিএসইর তাৎক্ষণিক পরিদর্শনে সিনহা সিকিউরিটিজে ৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি পাওয়া গেছে। এছাড়া এক্সপো ট্রেডার্স নামের ব্রোকারেজ হাউজে ৫ কোটি টাকার ঘাটতি পাওয়া গেছে। এর বাইরে সাদ, জয়তুন, ফারইস্ট, মিরর, এএনএফ, বিএলআই, এসিই, হাবিবুর রহমান, নুরে আলম, গেটওয়ে সিকিউরিটিজে ঘাটতি পাওয়া গেছে।

ঘাটতির বিষয়ে অ্যাপেক্স ইনভেস্টমেন্টসের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দিলীপ কাজুরি দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার কারণে লকডাউনের সময় পুঁজিবাজার বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানের কোনো আয় ছিল না। কিন্তু আমরা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাই করিনি। নিয়মিত বেতন-ভাতা চালিয়ে গেছি। ওই সময়ে আয় না থাকায় গ্রাহকদের টাকা অন্য একটি ব্যাংক হিসেবে নেওয়া হয়। এটা আত্মসাৎ নয়। ইতিমধ্যেই ওই টাকা গ্রাহকদের হিসাবে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

করোনা সংকটে অফিস ও কর্মী খরচ চালিয়ে নিতে গ্রাহক হিসাবের টাকা ব্যবহারের কথা জানিয়ে ইউনিক্যাপ সিকিউরিটিজের সিইও ওয়ালি-উল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার সময়ে দীর্ঘদিনের ছুটি ও ফ্লোর প্রাইসের কারণে আমরা নিজেদের পোর্টফোলিওর শেয়ার বিক্রি করতে পারিনি। তাই অফিস ব্যয় মেটাতে সাময়িকভাবে গ্রাহকের অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে। গ্রাহকদের দেড়শ কোটি টাকার মধ্যে ৬ কোটি টাকা ঘাটতি ছিল। বেশিরভাগই এরই মধ্যে সমন্বয় করা হয়েছে। এসইসি আমাদের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দিলেও আমরা অবশিষ্ট অর্থ দ্রুত সমন্বয় করা হবে। পুঁজিবাজারে আমাদের মূল কোম্পানিরও বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। আর মূল কোম্পানিও আমাদের গ্রাহক হিসাবে রয়েছে। পুঁজিবাজার স্বাভাবিক আচরণ করলে এমন পরিস্থিতি কখনোই তৈরি হতো না বলে জানান ওয়ালি-উল ইসলাম।

জানা গেছে, গত এক যুগে অন্তত ১০টি ব্রোকারেজ হাউজের গ্রাহকদের বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষটি হলো ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ। এর আগে গত বছর প্রায় একই ধরনের ঘটনায় শাহ্্ সগীরের ব্রোকারেজ হাউজটি জব্দ করে ডিএসই। ওই ব্রোকারেজ হাউজটি বিক্রি করে গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা নেয়। চার বছর আগে ২০১৬ সালে একই রকম ঘটনা ঘটেছিল সিএসইর ব্রোকারেজ হাউজ সিলেট মেট্রোসিটিসহ একাধিক ব্রোকারেজ হাউজে। ২০১৭ সালে এ স্টক এক্সচেঞ্জটিরই মোহারাম ও জালালাবাদ সিকিউরিটিজের লেনদেন স্থগিত করা হয়েছিল।

গ্রাহকদের হিসাবে ঘাটতি থাকার অভিযোগে গত বছর বেশ কিছু ব্রোকারেজ হাউজকে জরিমানা করেছিল বিএসইসি। এর মধ্যে ২০১৮ সালে ডিএসইর এম সিকিউরিটিজে ৭ কোটি এবং ২০১৭ সালে সিএসইর ফার্স্টলিডে প্রায় ১০ কোটি টাকা ঘাটতির তথ্য পেয়ে লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এম সিকিউরিটিজকে একই রকম ঘটনায় ২০১৭ সালে ২০ লাখ টাকা জরিমানা এবং প্রত্যেক পরিচালককে ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছিল। পরের বছরও একই কারণে ১০ লাখ টাকা জরিমানার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির সিইও তৌফিক বলেন, ঘাটতি পূরণ করায় নতুন করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন কোনো ঘাটতি নেই।