হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং হেপাটাইটিস ‘ই’ যকৃতে প্রদাহ বা হেপাটাইটিস সৃষ্টিকারী দুটি ভাইরাস। ভাইরাস দুটি মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির মল থেকে লোকালয়ের পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। দূষিত পানি পানের মাধ্যমে এগুলো সুস্থ ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করে। এছাড়াও দূষিত পানিতে থালা-বাসন, ফলমূল, শাকসবজি ধোয়ার মাধ্যমে এগুলো সহজেই খাদ্যদ্রব্যকে দূষিত করে। দূষিত খাদ্য থেকে ভাইরাস অন্যান্য পেটের পীড়া সৃষ্টিকারী অণুজীবের মতোই অন্ত্রে বাহিত হয়। সেখান থেকে ভাইরাসগুলো রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে যকৃতে বাহিত হয় এবং যকৃতের কোষে বংশবৃদ্ধি করে ও প্রদাহ সৃষ্টি করে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসকারীদের মাঝে ভাইরাস দুটি রোগ সৃষ্টি করে।
লক্ষণ : হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’জনিত হেপাটাইটিস একই ধরনের লক্ষণ সৃষ্টি করে। হেপাটাইটিস ‘এ’ শিশু-কিশোরদের এবং হেপাটাইটিস ‘ই’ বয়স্কদের বেশি আক্রান্ত করে থাকে। শরীরে হেপাটাইটিস ‘এ’ প্রবেশের ২-৪ সপ্তাহ ও হেপাটাইটিস ‘ই’ প্রবেশের ২-৮ সপ্তাহের মধ্যে লক্ষণ দেখা যায়। অনেকক্ষেত্রেই ভাইরাসগুলো উপসর্গহীন রোগ সৃষ্টি করে থাকে ও রোগী আপনা-আপনিই সুস্থ হয়ে যায়। যাদের লক্ষণ প্রকাশ পায়, তাদের প্রাথমিকভাবে জ্বর, খাদ্যে অরুচি, বমি, পাতলা পায়খানা, মাংসপেশিতে ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা দেখা দেয়। ক্রমেই রোগীর জন্ডিস দেখা দেয় - শরীর ও চোখের সাদা অংশ হলুদাভ বর্ণ ধারণ করে, প্রস্রাব গাঢ় বর্ণের হয়ে যায় এবং পেটের ডান পাশে ব্যথা হয়। জন্ডিসসহ অন্যান্য উপসর্গ কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। শিশুরা বয়স্কদের চেয়ে তুলনামূলক দ্রুত সুস্থতা লাভ করে।
জটিলতা : হেপাটাইটিস ‘এ’ সুস্থ ব্যক্তির দেহে কোনো জটিলতা সৃষ্টি করে না। তবে স্বল্প রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাবিশিষ্ট ব্যক্তি ও যকৃতের দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের এটি মারাত্মক লিভার ফেইলিওর ঘটায়। গর্ভকালীন হেপাটাইটিস ‘ই’ সংক্রমণ মা ও শিশু উভয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী।
করণীয় : হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’জনিত হেপাটাইটিসের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। রোগীদের সাধারণত ঔপসর্গিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং চিকিৎসা রোগীর নিজ বাড়িতেই সম্ভব। সঠিক পুষ্টির জন্য রোগীকে আমিষ জাতীয় খাদ্য বেশি দিতে হবে। দৈনিক পর্যাপ্ত পানি পান ছাড়াও প্রতিবার বমি বা ডায়রিয়ার পর ২০০-৪০০ মি.লি. স্যালাইন দ্রবণ পান করতে হবে। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামলই যথেষ্ট। জ্বর বা জন্ডিসের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে বা বমি ও ডায়রিয়া বাড়িতে নিয়ন্ত্রণ না হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে তার লিভার ফাংশন টেস্ট ও ভাইরাল মার্কারসহ বিভিন্ন পরীক্ষা লাগতে পারে। গর্ভবতী নারীদের হেপাটাইটিসের লক্ষণ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।
প্রতিরোধ : খাদ্য ও পানিবাহিত হেপাটাইটিস প্রতিরোধের মূল উপায় হলো বিশুদ্ধ পানি পান ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্রস্তুতকৃত খাদ্যগ্রহণ। এজন্য পানি ফুটিয়ে পান করা, ফলমূল ও শাকসবজি পরিষ্কার পানি দিয়ে ধোয়া, পূর্ণ সিদ্ধ করে রান্না করা ও খাবার আগে হাত ধুয়ে খাওয়া অপরিহার্য। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীরা হেপাটাইটিস ‘এ’-এর টিকা নিতে পারেন। তবে হেপাটাইটিস ‘ই’-এর কোনো টিকা না থাকায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই একমাত্র পন্থা। কোনো এলাকায় একই সময়ে অধিক সংখ্যক বাসিন্দার হেপাটাইটিসের লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটকে অতিসত্বর অবহিত করতে হবে।