বাবা আহমদিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারী হওয়ায় শিশুর মরদেহ কবর থেকে তুলে রাস্তায় ফেলে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত বৃহস্পতিবার সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুহিলপুর ইউনিয়নের ঘাটুরা গ্রামে আহমদিয়াবিদ্বেষীরা এ ঘটনা ঘটায়। শিশুটির মরদেহ পরে পুলিশি প্রহরায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কান্দিপাড়া এলাকায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের নিজস্ব কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানা গেছে, ফেনী সদর উপজেলার সাইফুল ইসলাম বিয়ে করেন ঘাটুরা গ্রামের স্বপ্না বেগমকে। ৭ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের খ্রিষ্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন স্বপ্না। নির্ধারিত সময়ের আগে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হওয়ায় তাকে ইনকিউবেটরে রাখা হয়। পরে গত বৃহস্পতিবার ভোরে শিশুটি মারা যায়। ধর্মীয় রীতি মেনে সেদিন সকাল ৭টার দিকে শিশুটিকে ঘাটুরা এলাকার একটি সরকারি কবরস্থানে দাফন করা হয়। কিন্তু আহমদিয়া সম্প্রদায়ের হওয়ায় দাফনের ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আহমদিয়াবিদ্বেষীরা এলাকায় মাইকিং করে। তারা মরদেহ কবর থেকে তোলার জন্য লোকজন জড়ো করে। এরপর নবজাতকের মরদেহ কবর থেকে তুলে কবরস্থানের বাইরের সড়কে ফেলে রেখে যায়। তবে কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে গ্রামের কেউ মুখ খোলেনি।
শিশুটির বাবা সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এই এলাকার জামাই। এলাকা সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা নেই। আমার বাচ্চাটাকে বৃহস্পতিবার সকালে ঘাটুরা কবরস্থানে দাফন করি। কিছুক্ষণ পর এলাকায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মাইকিং করে লোকজন জড়ো করা হয়। এরপর মরদেহ কবর থেকে তুলে কবরস্থানের সীমানার বাইরে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের আমি চিনিও না, জানিও না। পরে এলাকার লোকজনের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ আসে। পুলিশি প্রহরায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কান্দিপাড়া এলাকায় আমাদের সম্প্রদায়ের নিজস্ব কবরস্থানে নিয়ে মরদেহ দাফন করা হয়।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি জানতে পেরেছি ঘাটুরার এই কবরস্থানের জায়গার দাতা একজন হিন্দু ভদ্রলোক ছিলেন। এরপর থেকে এলাকার আহমদিয় সম্প্রদায়ের লোকজন মারা গেলে এখানে ৫০ বছর ধরে দাফন করে আসছেন। যদি তাদের আপত্তি থাকত তাহলে আমাদের বলতে পারত। তা না করে দুদিনের একটা শিশুর মরদেহ কবর থেকে তুলে ফেলে দিল এটা কল্পনাও করা যায় না।’
আহমদিয়া জামাতের সভাপতি এস এম ইব্রাহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সকালে এলাকার প্রতিটি মসজিদ থেকে মাইকিং করেন মৌলভীরা। তারা মাইকে আহমদিয়াবিদ্বেষীদের জড়ো করেন। তবে তাদের ডাকে স্থানীয়রা আসেননি। কারণ স্থানীয়রা জানেন, দীর্ঘদিন ধরে ঘাটুরা কবরস্থানে আহমদিয়া মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজনের দাফন হয়। তাই তারা আসেননি। তবে যারা এসেছে তারা বিপথগামী তরুণ। তারাই এসে কবর থেকে শিশুটির লাশ তুলে রাস্তায় ফেলে রাখে।’
সুহিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মহসিন খন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কবরস্থানের জমিটি পিনাকী ভট্টাচার্য নামে একজন হিন্দু দান করেছিলেন। এরপর থেকে সব সম্প্রদায়ের লোকজনকে একই কবরস্থানে কবর দেওয়া হতো। কিন্তু বৃহস্পতিবার আহমদিয়া সম্প্রদায়ের শিশুর কবর দেওয়া নিয়ে ঘটে বিপত্তি। এমন আগে হয়নি। আমি জনপ্রতিনিধি হিসেবে বলতে চাই, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ঘাটুরা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বজায় ছিল। এটা বজায় থাকবে। কারও আপত্তি থাকলে তারা অন্য কবরস্থানে কবর দিতে পারে। তাহলেই তো এ নিয়ে ঝামেলা হয় না।’
ঘাটুরা গ্রামের বাসিন্দা ইউপি চেয়ারম্যান আজাদ হাজারী আঙ্গুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রামের মাওলানা সাহেবরা কবরস্থানে আহমদিয়াদের দাফনে বাধা দিয়েছেন।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘এলাকাবাসী দুপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর শিশুটির মরদেহ কান্দিপাড়া এলাকায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের কবরস্থানে দাফন করা হয়।’