লিবিয়ায় সম্প্রতি ২৬ বাংলাদেশি মানবপাচারকারী চক্রের কবলে পড়ে মারা যান। এরপর দেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সক্রিয় হয়। আন্তর্জাতিকভাবেও তৎপরতা বাড়ে। তবে কড়া নজরদারির মধ্যেও কৌশলে ইউরোপ-আমেরিকায় যেতে নতুন নতুন রুট বের করছে মানবপাচারকারীরা। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে লোক সংগ্রহ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নতুন রুট দিয়ে তাদের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে। তারা জানান, মানবপাচারকারীদের ধরতে পুলিশের সবক’টি ইউনিট কাজ করছে। লিবিয়া ঘটনার পর ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তারদের থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। একইসঙ্গে পাচারকারীদের তথ্য হালনাগাদ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে র্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানবপাচারকারীদের গ্রেপ্তারে সারা দেশে কাজ করছে র্যাব। ইতিমধ্যে হাজি কামাল নামে হোতাসহ বেশ কয়েকজনকে ধরা হয়েছে।’ একই কথা জানান পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘মানবপাচারের হোতাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। দুটি তালিকা ধরে অভিযান চলছে। তালিকা আরও হালনাগাদ করা হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, মানবপাচারকারীদের পাল্লায় পড়ে একটু স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের আশায় অনেক যুবক মৃত্যুকূপে ঝাঁপ দিচ্ছে। অবৈধভাবে মরুভূমি, পাহাড়-পর্বত ও বিপদসংকুল গভীর জঙ্গল দিয়ে তারা বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে। দালালরা লোক সংগ্রহ করে দেশ থেকে পার করে। নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে তাদের ওপর মুক্তিপণ আদায়ে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। বড় ধরনের ঘটনা সামনে এলে কিছু লোক ধরা পড়ে। তবে সুবিধাভোগী ইউরোপের নতুন রুট বলকান পর্বতমালা ও মদদদাতারা আড়ালেই থেকে যায়।
সম্প্রতি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পাঠানো একটি সংস্থার প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের বরাত দিয়ে পাচারকারীদের অত্যাচার ও নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই অভিবাসন প্রত্যাশীদের বেচাকেনা হয়। এক পাচারকারীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মানুষ মাছের মতো এক হাত থেকে আরেক হাতে বিক্রি হয়। এজন্য মুক্তিপণও বাড়ে। চক্রের সদস্যরা অভিবাসন প্রত্যাশীদের নৌকায় তুলে জিম্মি করে। এরপর কেবল তাদের সামনে টাকা দিয়ে মুক্তি, আরেক চক্রের কাছে বিক্রি অথবা বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর পথ খোলা থাকে।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, দেশের ১৮টি জেলাকে মানবপাচারের ঝুঁকিপূর্ণ জোন চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব জেলায় মানবপাচারকারী ও দালাল চক্রের চার শতাধিক সদস্য সক্রিয়। তারা সিলেট, সুনামগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল, বরগুনা ও ঢাকায় বেশি সক্রিয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও দালালরা গ্রামাঞ্চলে লোক সংগ্রহ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ইউরোপ পাঠাতে ‘বলকান’ নামে বুলগেরিয়া থেকে পূর্ব সার্বিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বলকান পর্বতমালার নতুন রুট দিয়ে পাচার করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দালালরা লোকজনকে বলকান দিয়ে সার্বিয়ায় ঢোকানোর চেষ্টা করবে। সেখান থেকে ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগালসহ অন্যান্য দেশে নিয়ে যাবে। দেশের শতাধিক ট্রাভেল এজেন্সি তাদের সহায়তা করে। এসব প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’
এতদিন ইউরোপে মানবপাচারে বাংলাদেশ-তুরস্কের ইস্তাম্বুল-লিবিয়া, বাংলাদেশ-ভারত-শ্রীলঙ্কা (৪-৫ দিন অবস্থান)-ইস্তাম্বুল (ট্রানজিট)-লিবিয়া এবং বাংলাদেশ-দুবাই (৭-৮ দিন অবস্থান)-আম্মান-জর্ডান (ট্রানজিট)-বেনগাজী (লিবিয়া)-ত্রিপলি রুট ব্যবহৃত হতো।
সিআইডির ডিআইজি (অর্গানাইজড ক্রাইম) ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘আমরা মানবপাচারের ঘটনা তদন্ত ছাড়াও জড়িতদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছি। চক্রের সদস্যদের অর্থসম্পদের খোঁজ নিয়ে মানি লন্ডারিং মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি। একই সঙ্গে বিদেশে পলাতক মানবপাচারকারীদের ধরতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।’
মানবপাচারের ঝুঁকিপূর্ণ পাঁচটি জেলার পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে জানান, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে তারা মানবপাচারকারীদের তালিকা হালনাগাদ করছেন। এই চক্রের হোতাসহ দালালদের ধরতে করণীয় সব করা হবে।