সিরোসিস সৃষ্টিকারী হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’

হেপাটাইটিস ‘বি’ ও হেপাটাইটিস ‘সি’ ক্রনিক লিভার ডিজিজ বা যকৃতে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টিকারী দুটি ভাইরাস। ভাইরাস দুটি মূলত রক্তবাহিত। শরীরে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত পরিসঞ্চালন করলে বা তার ব্যবহৃত সুচ শরীরে ফুটে গেলে এবং আক্রান্ত মা থেকে জন্মদানকালে নবজাতকের মধ্যে এ ভাইরাস দুটি সংক্রমিত হতে পারে।

জটিলতা ও লক্ষণ : ৫-১০% হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্ত রোগীদের এবং প্রায় ৮০% হেপাটাইটিস ‘সি’ আক্রান্ত রোগীদের যকৃতে দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ সৃষ্টি হয়। তবে তাদের অধিকাংশই উপসর্গবিহীন থাকে। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ২৫% হেপাটাইটিস ‘বি’ ও প্রায় ২০% হেপাটাইটিস ‘সি’ রোগীদের পরবর্তী ২০ বছরের মধ্যে সিরোসিস বা যকৃতের ক্যানসার দেখা দেয়। সিরোসিসের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী দুর্বলতা, অরুচি, বমিভাব ও পেটের উপরিভাগে ব্যথা অনুভব করেন। ক্রমে জন্ডিস দেখা দেয়, ওজন কমতে থাকে, শরীরে পশমের পরিমাণ কমতে থাকে, বুকে ও পেটে শিরা ফুলে ওঠে, পানি জমে পেট ও পা ফুলে যায় এবং চামড়ার নিচে রক্তপাত ঘটে। সঠিক চিকিৎসার অভাবে পোর্টাল হাইপারটেনশন নামক জটিলতার ফলে অতিরিক্ত রক্তবমি হয়। শরীর থেকে বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ নিঃসরণ বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় পদার্থগুলো মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করে। সৃষ্টি হয় হেপাটিক এনকেফালোপ্যাথি; যেখানে রোগীর মানসিক বিকার ঘটে ও ক্রমে রোগী অচেতন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত রক্তবমির ফলে কিডনিতে পর্যাপ্ত রক্ত প্রবাহিত হতে পারে না, দেখা দেয় কিডনি ফেইলিওর। যকৃতের ক্যানসারের রোগীদেরও প্রায় একই প্রকার উপসর্গ দেখা দেয়, তবে এ ক্ষেত্রে মৃত্যুহার অধিক।

করণীয় : সিরোসিসের আগ পর্যন্ত হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’ উপসর্গহীন থাকায় আক্রান্ত রোগীরা টের পান না; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিরোসিস পর্যায়েই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে আসেন। এ ক্ষেত্রে লিভার ফাংশন টেস্ট, ভাইরাল মার্কার ও পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার মাধ্যমে রোগীর সার্বিক অবস্থা নির্ণয় করা হয়ে থাকে। কোনোপ্রকার গুরুতর জটিলতা ছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয় না, কিন্তু ক্রমাগত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের আওতায় থাকতে হবে।

সিরোসিসের রোগীর পর্যাপ্ত ও সুষম পুষ্টি প্রয়োজন। পুষ্টির প্রধান উৎস হতে হবে শর্করা। যেমনÑ ভাত বা রুটি। সঙ্গে প্রচুর আঁশযুক্ত শাকসবজি খেতে হবে। সিরোসিসের রোগীর যেমন একদিকে প্রচুর আমিষ ঘাটতি থাকে, অন্যদিকে অধিক আমিষযুক্ত খাদ্য হেপাটিক এনকেফালোপ্যাথির ঝুঁকি বাড়ায়। তাই আমিষের পরিমাণে একটি ভারসাম্য আনতে হবে। ৭০ কেজি ওজনের একজন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর দৈনিক ৮৫-১০৫ গ্রাম আমিষ খাওয়া উত্তম। আমিষের মধ্যে ডিম, দুধ, মাছ ও মুরগির মাংস খাওয়া যাবে, চর্বিযুক্ত মাংস পরিহার করতে হবে। ভিটামিনের জোগানের জন্য ফলমূল ছাড়াও ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া যাবে। শরীরে পানি জমা রোধে দৈনিক লবণ ও পানির পরিমাণ সীমিত করতে হবে। রোগীর কোনোক্রমেই কোষ্ঠকাঠিন্য হতে দেওয়া যাবে না, তাই আঁশযুক্ত সবজির পাশাপাশি ল্যাক্টুলোজ খেতে দেওয়া উচিত। এর সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করে যেতে হবে।

প্রতিরোধ : হেপাটাইটিস ‘বি’ টীকার মাধ্যমে প্রতিরোধ সম্ভব। প্রথম ডোজের এক মাস ও ছয় মাস পর একটি করে ডোজ দেওয়া হয়। শেষ ডোজের কমপক্ষে ছয় সপ্তাহ পর অ্যান্টিবডি টাইটার করে টীকার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে শিশুর হেপাটাইটিস ‘বি’ রোধে ইপিআই শিডিউল অনুযায়ী ৬,১০ ও ১৪ সপ্তাহ বয়সে সরকারি উদ্যোগে পেন্টাভ্যালেন্ট টীকা দেওয়া হয়ে থাকে। হেপাটাইটিস ‘সি’-এর কোনো টীকা না থাকায় সর্বদা সতর্কতা মেনে চলাই প্রতিরোধের একমাত্র উপায়।