জুনেও ‘ভুতুড়ে’ বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ!

রাজধানীর দক্ষিণখানের কাওলার বাসিন্দা মোরশেদা বেগম গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে বিদ্যুৎ বিল দিয়েছিলেন যথাক্রমে ২ হাজার ২৭ টাকা ও ২ হাজার ৪৮১ টাকা। কিন্তু মে মাসে অস্বাভাবিকভাবে তার বিল বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৯০১ টাকা। তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল জুনের বিলের সঙ্গে বাড়তি বিল সমন্বয় করা হবে। কিন্তু জুনেও তার বিল এসেছে ৪ হাজার ৬৯৯ টাকা। এতে হতবাক হয়েছেন তিনি।

মোরশেদা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মার্চ-এপ্রিল মিলে বিল দিয়েছি সাড়ে ৪ হাজার টাকা, আর মে-জুনে তা হয়ে গেল ৯ হাজার টাকারও বেশি। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য! মিটার না দেখে এমন ভুতুড়ে বিল করা করোনাকালে এক প্রকার যন্ত্রণা।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘করোনার ঝুঁকির মধ্যে কে এই টাকা কমানোর জন্য ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) অফিসে ধরনা দেবে। আর বাংলাদেশের সেবা ব্যবস্থায় এক কাজের জন্য তো একাধিকবার যেতে হয়। আর বিল জমা না দিলে তো আবার লাইন কেটে দেবে।’

মোরশেদার মতো এমন তিনজন গ্রাহক দেশ রূপান্তরের কাছে গত জুনে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল এসেছে বলে অভিযোগ করেছেন। তারা সবাই ডেসকোর গ্রাহক। তারা প্রত্যেকেই মে মাসেও দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেছিলেন। তাদের প্রত্যেকেরই দাবি, এই বিল অবাস্তব, মিটার না দেখেই এই বিল করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কাওসার আমির আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা তো হওয়ার কথা না। আমাদের প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নির্দেশ দেওয়া ছিল বাসায় গিয়ে রিডিং মিলিয়ে বিল করার। মে মাসে যে বাড়তি বিল দেওয়া হয়েছিল তা বাদ দিয়ে বিল করার নির্দেশনা ছিল। এরপরেও এমনটা হয়ে থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তদন্তের স্বার্থে গ্রাহকের অনুমতি সাপেক্ষে তিনি অভিযোগকারীদের বিদ্যুৎ বিলের কপি এই প্রতিবেদকের কাছ থেকে সংগ্রহও করেছেন।

এর আগে গত মে মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল করে বিপণনের দায়িত্বে থাকা কোম্পানিগুলো। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর বাড়িতেও বাড়তি বিল করা হয়। দায়িত্বে অবহেলার দায়ে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয় সরকার। তখন সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার বলা হয়েছিল মে মাসে যেসব গ্রাহক বাড়তি বিল দিয়েছেন তাদের পরবর্তী জুন মাসের বিলের সঙ্গে তা সমন্বয় করা হবে। এর পরেও যদি বাড়তি থাকে তবে তা পরের মাসে সমন্বয় করা হবে। কেবল ডেসকোর আওতাধীন এলাকাতেই মে মাসে অভিযোগের ভিত্তিতে ৪৪ কোটি টাকার বিল সংশোধন করে দেওয়া হয়েছে। দেশে বিদ্যুতের গ্রাহকসংখ্যা বর্তমানে ৩ কোটি ৭০ লাখ।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের কারণ খতিয়ে দেখতে গত ২৫ জুন একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। বেঁধে দেওয়া সাত দিনের মধ্যে ভুতুড়ে বিল সমন্বয় করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং ভুতুড়ে বিলের জন্য দায়ী চার বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে টাস্কফোর্স। এরপরেও এমন বিলে হতাশ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তরা। তারা বলছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মাকসুদা খাতুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুনের বিলেও এমন অভিযোগ অপ্রত্যাশিত। কোনো গ্রাহকের যদি এমন হয়ে থাকে তাহলে তিনি যেন অভিযোগ দাখিল করেন। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তদন্ত করে দোষীদের কঠোর শাস্তি দেবে।’

ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য একজন গ্রাহকের অনুমতি সাপেক্ষে তার মোবাইল ফোন নম্বরসহ বিলের যাবতীয় তথ্য তিনি এই প্রতিবেদকের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন।