এই করোনাভাইরাসের মধ্যেও কোনো ঝুঁকি নেই; বরং আছে পদোন্নতি। রীতি অনুযায়ী জুলাই মাসে বেড়েছে বেতন। মহামারীর মহাসংকটের মধ্যেও তাদের আছে আর্থিক প্যাকেজের হাতছানি। এই যখন সরকারি চাকরিজীবীদের অবস্থা, ঠিক তার উল্টো চিত্র বেসরকারি চাকরিতে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কারও চাকরির নিশ্চয়তা নেই। ব্যাংক, বীমা ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তো নেইই। চাকরির নিশ্চয়তা নেই ছোট-বড়-মাঝারি কোনো পুঁজির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের। দীর্ঘ এই তালিকায় রয়েছেন পাড়া-মহল্লার হোটেল-রেস্তোরাঁর বয়-বেয়ারারাও। করোনার ছোবলে চাকরি গেছে রাজধানী ঢাকার গলি-কানাগলির সেলুনকর্মীদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষদেরও।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার সরকারি আর বেসরকারি চাকরির ঝুঁকি নিয়ে তুলনা করতে চান না। তিনি মনে করেন, সরকারি চাকরির সুরক্ষা বেশি হবেই। সরকারের প্রয়োজনে, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সরকারি চাকরির পদ তৈরি করা হয়। এসব নিয়োগের নেপথ্যে থাকে গণমানুষের সেবা দেওয়া। আর বেসরকারি চাকরির পদ সৃষ্টির অন্যতম উদ্দেশ্য মুনাফা। দুই চাকরির অবস্থান দুই মেরুতে। মহামারীর সময় বেসরকারি খাত সমস্যায় পড়েছে। বেসরকারি খাতকে সুরক্ষা দেওয়াও সরকারে দায়িত্ব। ক্ষতিগ্রস্ত খাতকে সহায়তা করতে সরকার এগিয়েও এসেছে। আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তা ছাড়া বেতন বাড়ানোর পরও বেসরকারি খাতের তুলনায় সরকারি খাত এখনো পেছনে পড়ে আছে। একটি প্রাইভেট ব্যাংকের এমডির বেতন সরকারি ব্যাংকের এমডির বেতনের কয়েক গুণ বেশি। আর সব বেসরকারি খাত সমস্যায় পড়েছে বিষয়টি এমনও নয়।
করোনাভাইরাস মহামারী শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন প্রকৌশল সংস্থার আয়ে ভাটা পড়েছে। প্রকৌশলীদের বেতন দিতে দেরি হচ্ছে। একই অবস্থা চিকিৎসকদের বেলায়ও ঘটছে। অনেক বেসরকারি হাসপাতালে রোগী যাচ্ছে না। রোগীর অভাবে হাসপাতালগুলোর আয় বন্ধ হয়ে গেছে। আয় না থাকায় চিকিৎসকদের বেতন-ভাতাও অনিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে।
চিকিৎসক-প্রকৌশলীদের মতো ‘প্রেস্টিজিয়াস জব’ পাইলটদেরও; তাদেরও একই অবস্থা। যাত্রী না থাকায় বেকার বসে সরকারি-বেসরকারি সব এয়ারলাইনস। সরকারি এয়ারলাইনসের মতো বেসরকারি এয়ারলাইনসেও পাইলটদের বেতন বকেয়া পড়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সব শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন নির্দিষ্ট হারে কেটে নিচ্ছে। বেসরকারি এয়ারলাইনস রিজেন্ট এয়ারওয়েজের পাইলটদের বেতন বকেয়া পড়েছে মার্চ মাস থেকে। আগামী দুই মাসেও তাদের ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক হবে না। এ কারণে এই প্রতিষ্ঠানের পাইলটদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কর্মীদের পাঠানো হয়েছে বিনা বেতনের ছুটিতে।
করোনাভাইরাস শুধু চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা পাইলটের চাকরিতেই থাবা বসায়নি। রাস্তাঘাটের ব্যবসায়ীদের আয়েও থাবা বসিয়েছে। রাজধানীর গ্রিন রোডে ভ্যানগাড়িতে করে মুরগি বিক্রি করেন ফাহিম মিয়া। করোনা পরিস্থিতিতে পুলিশের তাড়ায় এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে মুরগি বিক্রি করতে পারছেন না। পুলিশ দেখলেই ভ্যানগাড়ি চালিয়ে তিনি অন্য দিকে চলে যান। কিন্তু সারা দিন গ্রিন রোডেই তিনি মুরগি বিক্রি করেন। গত বুধবার গ্রিন লাইফ হাসপাতালের উল্টো দিকে মুরগির ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। ব্যবসা কেমন চলছে জানতে চাইলে ফাহিম মিয়া বলেন, করোনাভাইরাসের আগে ব্যবসা খুব ভালো ছিল। মুরগি জবাই, পরিষ্কার আর ওজন করার কাজ একা সামাল দিতে পারতেন না। একজন কর্মচারী রেখেছিলেন। সেই কর্মচারীর দৈনিক ২০০ টাকা বেতন দেওয়ার পরও প্রতিদিন কমপক্ষে ১ হাজার টাকা লাভ নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু করোনাভাইরাস তার সব কেড়ে নিয়েছে। করোনা-পূর্ব সময়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ মুরগি বিক্রি করতে পারতেন। করোনা আসার পর সেই সংখ্যা ২০টিতে নেমে এসেছে। আয় কমে যাওয়ায় কর্মচারী বিদায় করেছেন। নিজের সংসার কোনোমতে টেনেটুনে চালাচ্ছেন।
রাজধানীর কলাবাগানের একটি সেলুনে কাজ করতেন মুরাদ হাসান। সেলুনের আয় দিয়ে তার ভালোই চলছিল। মালিকের পাওনা বুঝিয়ে দিয়েও তিনি দিন শেষে ৫০০ টাকা নিয়ে ঘরে ফিরতেন। করোনাভাইরাস দেখা দেওয়ার পর মার্চ মাস থেকে অনেক দিন তার সেলুনটি বন্ধ ছিল। গত এক সপ্তাহ খুললেও সেলুনে এখনো স্বাভাবিকভাবে যাচ্ছেন না এলাকার লোকজন। করোনার আগে স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে তিনি শুক্রাবাদ থাকতেন। তিন মাসে জমানো টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় শুক্রাবাদের বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। কম ভাড়ার কারণে সাভারে বাসা নিয়েছেন। বাসে করে প্রতি দিন আসা-যাওয়া বেশ ঝক্কি-ঝামেলার বিষয় তার জন্য। তাই করোনাভাইরাস দূর হওয়ার আশায় বসে আছেন মুরাদ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার কলাবাগানে সেলুনের আশপাশে বাসা ভাড়া নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
বেসরকারি চাকরি আর ব্যক্তি উদ্যোগের ব্যবসায় যখন শুধু ধস নামার কথা শোনা যায় চারদিকে, তখন সরকারি চাকরিজীবীরা নিশ্চিন্তে জীবন পার করছেন। মাস শেষে নির্দিষ্ট বেতন পেতে তাদের কোনো চিন্তা করতে হয় না। নতুন অর্থবছর আসায় তাদের বেতনের সঙ্গে অটোমেটিক্যালি যোগ হয়ে গেছে ইনক্রিমেন্ট। মার্চে মহামারী শুরু হলেও এপ্রিলে সবকিছু বন্ধের মধ্যেও তাদের বৈশাখী ভাতা পেতে কোনো বেগ পেতে হয়নি। উৎসবভাতা পেয়ে রোজার ঈদ করার পর এবার এসেছে কোরবানির ঈদ। তারা বোনাস পাওয়ার আগেই হিসাব-নিকাশ শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু বেসরকারি খাতে উল্টো চিত্র। আড়াই মাসের মধ্যে দুটি বেতন আর দুটি বোনাস জোগাড় করতে হিমশিম অবস্থা বেসরকারি উদোক্তাদের। বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে রোজার ঈদেই বোনাস দেওয়া হয়নি। এবার তারা আশা করাই ছেড়ে দিয়েছেন। নীলক্ষেতে একটি বইয়ের দোকানে কাজ করেন সবুজ ওয়ারেছ। তিনি জানিয়েছেন, গত ঈদে মালিক বোনাস দেননি। তাই এবারের ঈদে বোনাস আশাই করেন না। ‘বেতন দিতেই মালিকের টানাটানি অবস্থা, বোনস দেবে কীভাবে।’ বলেন সবুজ।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, দেশে কর্মসংস্থানের অর্ধেকের বেশি ব্যক্তিমালিকানাধীন। সরকারি চাকরি করেন মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ কর্মজীবী। বেসরকারি চাকরিতে আছে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। ব্যক্তিমালিকানার অধীনে কাজ করেন ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যান্য সেক্টরে রয়েছেন ২১ দশমিক ১ শতাংশ কর্মজীবী।
করোনাভাইরাসের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীরা পদোন্নতি পাচ্ছেন। গত ৫ জুন জনপ্রশাসনের ১২৩ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে যুগ্ম সচিব করা হয়েছে। পদের চেয়ে বেশি যুগ্ম সচিব আগেই ছিলেন। এই পদোন্নতির পর পদের তুলনায় বেশি যুগ্ম সচিব হওয়ার সংখ্যাটা আরও বেড়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উপসচিব পদেও পদোন্নতির আলোচনা চলছে। এ ক্ষেত্রে এবার নতুন করে ২৭তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের উপসচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে। থেমে নেই পুলিশ ক্যাডারও। সহকারী পুলিশ সুপার থেকে অ্যাডিশনাল পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি হয়েছে। আরও পদোন্নতি হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দেশে একটা রেওয়াজ আছে, যখন একজন প্রতিবেশী দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে যায়, তখন অপর প্রতিবেশীর খুশির খবর থাকলেও তা প্রকাশ করে না। ধুমধাম করে উৎসব করে না। এটা সহমর্মিতার একটা বড় উদাহরণ। কিন্তু আমাদের সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে তা নেই। তাদের পদোন্নতিটা আর কটা দিন পরে হলে কী হতো? করোনাভাইরাসটা নিয়ন্ত্রণে এলে এই পদোন্নতি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলত না। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠেছে। কারণ প্রতিবেশীর চাকরি নেই। চাকরি থাকলেও বেতন নেই। বেতন হলেও তা অর্ধেক। এ অবস্থায় পদোন্নতি দেওয়া ও নেওয়া কোনোটাতেই মানবিকতা নেই। যে সমাজে মানবিকতা থাকে না তা ক্রমে ক্রমে বাস অযোগ্য হয়ে পড়ে।’
করোনা রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনায় আক্রান্ত হলে ও মারা গেলে সরকার তাদের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার ঘোষিত নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী ও প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত অন্যান্য কর্মচারী দায়িত্ব পালনকালে করোনায় আক্রান্ত হলে ও মারা গেলে তাদেরও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। সরকারের এ সিদ্ধান্ত করোনা রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের উৎসাহিত করছে। কিন্তু আক্রান্ত হলেই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণার সুযোগ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে অনেকেই। ইতিমধ্যে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে টাকার বিনিময়ে করোনাভাইরাসের পজিটিভ সনদ ইস্যু করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত ভুয়া সনদ ইস্যুকারী চক্রকে পুলিশ আটক করেছে। এসব জাল সনদ ব্যবহার করে অনেকেই সরকারি তহবিলের টাকা তুলে নেওয়ার সুযোগ নিতে পারেন।