করোনার এই টালমাটাল সময়ে অন্যান্য অনেক বিষয়ের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য বিষয়টিও বেশ আলোচনায় এসেছে। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও আবেগীয় নিপীড়ন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু লেখা পড়ে, পরিচিত ও কাছের মানুষজনের অভিজ্ঞতা শুনে এবং আমাদের (কাউন্সেলরদের) কাছে এই বিষয়টি নিয়ে আসা ক্লায়েন্টদের গল্প শুনে এটা অন্তত পরিষ্কার যে অনেকের ভেতরেই কর্মপরিবেশ নিয়ে অভিযোগ, অশান্তি ও মানসিক ক্ষত আছে। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য বিষয়টি নতুন কিছু নয়। লিঙ্গ, বয়স, ধর্ম, শারীরিক সৌন্দর্য, প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি নানা কিছুর ভিত্তিতে এই বৈষম্য হয়ে আসছে। তবে পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপ্রীতির বিষয়টি আজকাল বিশেষভাবে আলোচনায় আসছে। বৈষম্যের স্বীকার হওয়া যে কারোর জন্যই অনাকাক্সিক্ষত, অপ্রীতিকর ও হতাশার হলেও এর প্রতি সবার প্রতিক্রিয়া এক হয় না। যেকোনো বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার। আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা হলো কোনো একটি পরিস্থিতিতে নিজের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে নিজের আবেগ-অনুভূতিকে বুঝতে ও সামলে নিতে পারা এবং সেইসঙ্গে অন্যদের আবেগ-অনুভূতিকে বুঝে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা।
যেকোনো বৈষম্যমূলক পরিস্থিতিতে সাধারণত চারটি দল বা পার্টি থাকে যেমন- ১. সুবিধাদাতা : যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ যোগ্যতা নয় বরং পক্ষপাতিত্বের ভিত্তিতে জৈবিক, বৈষয়িক, মানসিক, সামাজিক, আবেগীয় বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা বা সমর্থন দেয়। ২. সুবিধাভোগী : যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ এভাবে সুযোগ-সুবিধা বা সমর্থন নেয়। ৩. ভুক্তভোগী : যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ এই ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৪. সেই গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান বা পরিবারের অন্যান্য সদস্য যারা ঘটনার ফলে সরাসরি ভুক্তভোগী না হলেও একই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায় মীনা কার্টুনের ‘বুদ্ধিমতি মীনা’ পর্বটিতে মীনার দাদী ও মা এক নম্বর অবস্থানে অর্থাৎ তারা পক্ষপাতিত্বের ভিত্তিতে সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, রাজু দুই নম্বর অবস্থানে অর্থাৎ সুবিধা নিচ্ছে, মীনা রয়েছে তিন নম্বর অবস্থানে অর্থাৎ পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের ফলে সরাসরি ভুক্তভোগী এবং চার নম্বর অবস্থানে রয়েছে মীনার বাবা ও মিঠু। ‘বুদ্ধিমতি মীনা’ পর্বে আমরা দেখেছি যে মীনা গাছের উঁচু ডাল থেকে একটি পাকা আম পেড়ে এনে মায়ের হাতে দেয়। মেয়ে হয়েও মীনার গাছে চড়ে আম পাড়ার বিষয়টি নিয়ে দাদী খুব বিরক্ত হয়। এরপর আম খেতে গিয়ে মীনা খেয়াল করে আমের বেশিরভাগ অংশই তার ভাই রাজুকে দেওয়া হচ্ছে। মীনার মন খারাপ হয়, সে অভিমানী গলায় মাকে বলে, ‘মা, রাজু তো আমার চেয়ে বেশি পাইল’। মীনার কথা শুনে দাদী রাজুকে বেশি দেওয়ার পক্ষে মতামত দিয়ে বলে যে, এটাই স্বাভাবিক এবং এমনই হয়ে থাকে। রাতে খাবার খেতে গিয়েও মীনা দেখল রাজুর থালায় ভাত, ডাল, সবজির সঙ্গে ডিম আছে, কিন্তু তার থালায় ডিম নেই। যদিও তাদের হাত ধুতে যাওয়ার ফাঁকে মিঠু (মীনার টিয়া পাখি) ডিমটি সমান ভাগ করে মীনার থালায় অর্ধেক তুলে দেয় কিন্তু মিঠুর এই উদ্যোগ কোনো কাজে আসে না। রাজু বড় হচ্ছে, তার বেশি খাবার দরকার দাদীর এমন বক্তব্যে ডিম আবারও রাজুর থালায় ফেরত আসে। বাবা তখন যুক্তি দেয় মীনাও তো বড় হচ্ছে, তাছাড়া সে বাড়ির অনেক কাজ করে, তাই তারও খাবারের দরকার আছে। বাবার মুখে এমন কথা শুনে রাজু তাচ্ছিল্য করে বলে, ‘মীনার কাম তো খুবই সোজা, আমি এমনে এটা করতে পারি।’ বুদ্ধিমতী মীনা এবার নিজের কাজের গুরুত্ব বোঝাতে খেলার ছলে রাজুকে প্রস্তাব দেয় একদিনের জন্য কাজ বদল করে করার। অর্থাৎ একদিনের জন্য মীনা রাজুর কাজগুলো করবে আর রাজু মীনার কাজগুলো করবে। মীনার এমন প্রস্তাবে দাদী আবারও মীনার প্রতি বিরক্ত হয়ে বলে, ‘যতসব বাজে কথা’। পরদিন মীনার কাজগুলো করতে গিয়ে রাজুর রীতিমতো নাভিশ্বাস বেরিয়ে যায়। সে বুঝতে পারে মীনার কাজগুলো কত কঠিন এবং গুরুত্বপূর্ণ। রাতে খেতে গিয়ে রাজু যখন দেখে কাজ বদলের মতো আজ তাদের খাবারের থালাও বদল হয়ে গেছে, তখন সে খুব হতাশ হয়ে পড়ে এবং বলতে থাকে, ‘আজ সারা দিনে আমি মেলা কাম করছি চুলা জ¦ালাইসি, ঝাড়– দিসি, মুরগিরে খাওন দিসি, পানি আনসি, কাপড় ধুইসি, বাসন মাজছি, মীনার সব কাম করসি’। রাজুর এমন কথায় দাদীসহ সবারই দৃষ্টিগোচর হয় মীনার কাজ আসলেও কতটা ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ।
মীনার এই পর্বটিকে যদি আমরা মার্শাল রোজেনবার্গের নন-ভায়োলেন্ট কমিউনিকেশনের (NVC) ) মাধ্যমে ব্যাখ্যা করি তাহলে দেখব যে দাদী ও মা ওপরে উল্লিখিত যে আচরণগুলো (observation)) করছে তার পেছনে তাদের কিছু অনুভূতি (feelings)) ও চাহিদা (needs) আছে। আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায় বৃদ্ধ বয়সে এসে বাবা-মা বা অভিভাবক পুত্র সন্তানের আশ্রয়, ভরণপোষণ বা সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। অর্থাৎ তাদের চাহিদা এখানে মূলত আশ্রয়, নিরাপত্তা ও সহযোগিতা যা পুত্রসন্তান হিসেবে রাজু দিতে পারবে বলে সমাজ তাদের শিখিয়েছে। ফলে রাজুর পরিচর্যা করা তাদের ভেতরে এক ধরনের তৃপ্তি ও স্বস্তির অনুভূতি এনে দেয়। নিজেদের চাহিদা পূরণের হাতিয়ার হিসেবে এমন বৈষম্যমূলক পন্থাকে অবলম্বন করা মূলত একটি কৌশলগত ভুল যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবারের কারোর জন্যই মঙ্গলজনক নয়।
যেকোনো প্রতিষ্ঠানের বৈষম্যমূলক আচরণকারী কর্তাব্যক্তিরা আসলে এই কৌশলগত ভুলটাই করে থাকে। ভুল বলছি কারণ সফল ও আবেগীয়ভাবে বুদ্ধিমান নেতারা বৈষম্যমূলক আচরণ করে না। কারণ যেকোনো ধরনের বৈষম্য শুধু বৈষম্যের শিকার হওয়া ব্যক্তির জন্যই যে ক্ষতিকর তা নয়, এটি কর্তাব্যক্তিরও মানসিক ও আত্মিক বিকাশ রোধ করে এবং সেইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানেরও ক্ষতি বয়ে আনে। নেতৃত্বের বিকাশে তাই আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ একটি যুগান্তকারী পদচারণা। সাধারণত দেখা যায় যে গতানুগতিক চিন্তাধারার এবং নৈতিক বা আত্মিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিরাই পক্ষপাতদুষ্ট ও বৈষম্যমূলক আচরণ করে থাকে। আর সুবিধাভোগীরা এতে প্রণোদনা জোগায় কারণ এতে করে তাদের চাহিদাগুলোও খুব সহজেই পূরণ হয়ে যায়। বৈষম্যের শিকার হওয়া ব্যক্তির কর্তাব্যক্তি ও সুবিধাভোগীর প্রেক্ষাপট বা চাহিদার জায়গাটি বুঝতে পারা জরুরি, কারণ এতে করে নিজেকে তার ছোট, অযোগ্য, দোষী বা অসহায় মনে হবে না।
এবার আসা যাক ভুক্তভোগীর চাহিদার ব্যাপারে, মীনার এই পর্বে দেখা যাচ্ছে বৈষম্যের কারণে মীনার পরিচর্যা, বিকাশ, স্বীকৃতি, সম্মান, ভালোবাসা এই ধরনের চাহিদাগুলো বিঘ্নিত হচ্ছে। একদিকে সে খাবার বা পরিচর্যা কম পাচ্ছে, আবার অন্যদিকে দাদীর নানারকম সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছে। ঠিক তেমনিভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানে যে ব্যক্তি বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, সবার আগে তার নিজের অনুভূতি (feelings) ও চাহিদার (needs) সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে নিজেকে সামলে নেওয়া দরকার। সাধারণত বৈষম্যমূলক পরিস্থিতিতে মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে বিকাশ, স্বীকৃতি, সম্মান, ভালোবাসা এসব চাহিদা বিঘিœত হওয়ার কারণে। তাই এক্ষেত্রে প্রথম কাজ হলো নিজের কষ্ট ও হতাশা সামলে নেওয়া এবং তারপর পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ (request/ action) ) গ্রহণ করা। যেমন
১. নিজের অনুভূতি ও চাহিদার কথা শান্ত ও দৃঢ়ভাবে কর্তাব্যক্তিকে বলা।
২. নিজের কাজ ও দায়িত্বের ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণা নিয়ে কর্মদীপ্ত থাকা এবং প্রয়োজনে বিশ্বস্ত সহকর্মীদের কাছে কাজের ফিডব্যাক নেওয়া।
৩. প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর অন্য যেসব বিশ্বস্ত ও দায়িত্বশীল সদস্য রয়েছে তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা নেওয়া।
৪. প্রয়োজন মনে হলে কাউন্সেলর বা সাইকোথেরাপিস্টের কাছে মানসিক সহায়তা নেওয়া এবং আইনি পরামর্শের জন্য আইনজীবীর সহযোগিতা নেওয়া।
৫. নিজের চাহিদাগুলোকে শনাক্ত করে তা পূরণের জন্য ভিন্ন রাস্তা বা কৌশলগুলো ভেবে রাখা। যেমন, আমরা কাজ করি মূলত অর্থ, নিরাপত্তা, স্বীকৃতি, বিকাশ, আত্মপ্রকাশ এসব চাহিদা থেকে। ফলে এক প্রতিষ্ঠান থেকে বা একভাবে এসব চাহিদাপূরণে বাধা এলে আমরা অন্যভাবেও যেন এই চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারি তার প্রস্তুতি রাখা।
৬. নিয়মিত মনের যত্ন নেওয়া যেমন পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার গ্রহণ, শরীরচর্চা ও মেডিটেশন করা, বন্ধুবান্ধব ও কাছের মানুষজনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা, প্রার্থনা করা, পছন্দের কাজগুলো করা ইত্যাদি।
নিয়মিত মনের যত্ন কঠিন পরিস্থিতিতে শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী থাকতে সহযোগিতা করে।
লেখক
শিক্ষক, এডুকেশনাল ও কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়