আবার কি ট্রাম্পের সারপ্রাইজ ভিক্টোরি

করোনা মহামারি মোকাবেলায় যথাযথভাবে ব্যবস্থা নিতে না পারা, এক লাখ ত্রিশ হাজারের বেশি মানুষের করোনায় মৃত্যু, পঁচিশ লাখের বেশি আক্রান্ত হওয়ায় বড়ো ধরণের অর্থনৈতিক সংকট, প্রায় ৪০ মিলিয়ন মানুষ বেকার হওয়া, জর্জ ফ্লয়েড নৃশংস হত্যা পুলিশ কর্মকর্তা দ্বারা, বর্ণবাদ বিরোধী বড়ো মাপের জাগরণ, আমেরিকায় মতামত গ্রহণের দৌড়ে ডেমোক্রেট প্রতিদ্বন্দী জো বাইডেনের বিপুল জনপ্রিয়তা, এসব সত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার চান্স নাই বলা যায় না। আবার হেরে যেতে পারেন সেই হিসাবও আছে। রাজনীতির হিসাব বলে কথা। রাজনৈতিক অবস্থান মানুষের সুবিধা অসুবিধার কারণে পরিবর্তন হয়। এক দলের লোক অন্য দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে আগ্রহী হয়। আগ্রহ স্বার্থের কারণে। ভোট ব্যাংকও খোয়া যায়। আমেরিকায় তা হয়।

রাজনীতির পণ্ডিতেরা আমেরিকার ১৮ অঙ্গরাজ্যকে 'ব্লু ওয়াল' চিহ্নিত করেছেন। ১৯৯২ থেকে ২০১২ পর্যন্ত এই অঙ্গরাজ্যগুলোতে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জিতেছিলেন। ২০১৬ সালে মনে করা হয়েছিল 'ব্লু ওয়াল' চিহ্নিত অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোটের কারণে হিলারি ক্লিনটন বেশি ব্যবধানে জিতবেন। কিন্তু 'ব্লু ওয়াল'র তিনটি রাজ্যে (মিশিগান, পেনসিলভানিয়া ও উইসকনসিন) পাশ করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্পের ২০১৬ সালের বিজয়ও ‘সারপ্রাইজ ভিক্টোরি’ ছিল। এবার অনেক রিপাবলিকান পণ্ডিত খুব আশাবাদী ট্রাম্পের পুন:নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে। জনমত গ্রহণে দক্ষ পরিচিত রিপাবলিকান স্ট্রাটেজিস্ট ক্রিস উইলসন বললেন মিডিয়াকে ‘আমি মনে করি সামনের শরতে পরিস্থিতি অন্যরকম হবে। পাবলিক তখন তাদের অতীতের রাগ-গোস্বা সব ভুলে যাবে’।

তবে জো বাইডেনের প্রভাব ইগনোর করা যাবে না। ট্রাম্পের জন্যে এটি বড় চ্যালেঞ্জ যে, আমেরিকার নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা বাইডেনের নাই, তা প্রমাণ করতে হবে ট্রাম্পকে। সেটা কেবল ভাষার অলংকার (রেটোরিক) ব্যবহার করে হবে না। চীনের বিরুদ্ধে মিছেমিছি হুমকি-ধমকি দেয়ার মতো বাইডেনের বিরুদ্ধে কথার চাল দিয়ে আমেরিকানদের বেকুব বানানো যাবে না। নভেম্বরের ভিতর দেশের অর্থনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আনতে হবে ট্রাম্পকে। নইলে বাইডেনের কাছে পরাজিত হতে হবে। ডেমোক্রেট প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেন খুব সচেতন। হিলারী ক্লিনটনের মতো শত্রুভাবাপন্ন মানসিকতার না।

পর্যবেক্ষকগণ এটাও গুরুত্বের সাথে নিচ্ছেন যে, ২০২০ সালের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আফ্রিকান-আমেরিকান আর সাদা আমেরিকানদের মধ্যে যদি ট্রাম্প বিরোধিতায় সমঝোতা হয়, সমগ্র দেশে বেশিভাগ থাকে ডেমোক্রেটদের পক্ষে, ২০০৪, ২০০৮, ২০১২ সালের মতো, তাহলে ট্রাম্প হেরে যাবেন।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যুদ্ধে অর্থব্যবস্থা-অর্থনীতি-অর্থ সংক্রান্ত বিষয় ‘সিলভার বুলেট’ হিসাবে কাজ করে। মানে এটি এমন অস্ত্র, যা দিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নিশ্চিত। আমেরিকান রাজনীতিবিদরা অর্থে বিত্তে প্রভাবশালী থাকতে চান। তাদের দেশ পৃথিবীর নেতৃত্ব ধরে রাখুক সেটাও চান। আর এটাও ঠিক যে আমেরিকানরা বিশ্ব রাজনীতির ময়দানে দেখাতে চায় নির্বাচনের মাধ্যমে ‘গ্রেট আমেরিকান কামব্যাক’। এই লক্ষ্যে বিশ্বের ধনকুবের অনেককেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট রাখা হয় অর্থ ব্যবস্থার চেইন মজবুত রাখার জন্যে।

তাছাড়া আরেকটি প্রধান বিষয় এই যে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যিনিই হোক, তাকে মধ্যপ্রাচ্যে খবরদারী জারী রাখতে হবে। ২০১৬ সালের নির্বাচনী সভায় হিলারি ক্লিনটন স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন, 'ইউনাইটেড স্টেট অলওয়েজ উইথ ইজরায়েল'। (ব্রাদার নাথানায়েল চ্যানেল)। খেয়াল করার বিষয়, হিলারি বলেন নি ডেমোক্রেটরা ইসরাইলের পাশে সর্বদা। বলেছেন ‘আমেরিকা সব সময় ইসরায়েলের পাশে’। মানে তার কথাতেই এটা পরিস্কার- আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যে-ই হোক, যে-দলেরই হোক, তিনি ইসরাইলের পাশে থাকেন। থাকতে হয় ইসরায়েলের স্বার্থে, মানে আমেরিকারই স্বার্থে। মানে, ইসরাইলের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারলে আমেরিকার সুবিধা মিলবে- এরকম একটা হিসাব আছে।

আবার প্রশ্নটি করা যাক—ইসরাইলের জন্যে আমেরিকা লড়াই করবার পরিস্কার কারণ কী?

বিশ্বরাজনীতির কিছু পর্যবেক্ষকের উত্তর এরকম— যারা আমেরিকার এলিট শ্রেণী, যারা নিজেদেরকে সমাজের আপারক্লাস মনে করে, যারা ধন-দৌলতে বলবান, যারা বড় বড় ব্যবসা করেন, যারা সরকার চালাতে ক্ষমতা পায়, তারা ইসরাইলকে সহায়তা করা সমর্থন করেন তাদের স্বার্থে। ইসরাইল তাদেরকে বড় ব্যবসার সুযোগ দেয়। ইসরাইল নিজে মোটা দাগের আমদানিকারক। এই আমদানী অন্য দেশে পণ্য বিক্রির জন্যে। ঐ এলিটদের ইহুদী বা খৃষ্টান পরিচয় মূখ্য ব্যাপার না। তারা আসলে ডেমোক্রেট বা রিপাবলিকান বা লিবারেল বা কনজার্ভেটিভ পরিচয় উপরে-উপরে ব্যবহার করে কেবল। তারা চায় তাদের এলিটিজম জিইয়ে রাখতে যেকোনো উপায়ে। তারা নিজেদেরকে সুপেরিওর মনে করে। মুসলিম পরিচয়ধারী অনেক এলিটও আছে দেশে দেশে। মধ্যপ্রাচ্যে আরব এলিটিজমও বেশ শক্তপোক্ত।

ওদিকে কারো মতে, মসিহি একটা ধর্মীয় গোষ্ঠীর সমর্থনও পায় ইসরাইল এই কারণে যে, বাইবেলে বলা আছে, ইহুদীদের দেশটাতেই ঈসা নবী পুনরায় আসবেন, তাই তাদের দেশটা হেফাজতে রাখবার দায় আছে খৃষ্টানদের উপর। অবসরপ্রাপ্ত ইউএস জেনারেল বয়কিন 'মর্নিংস্টারটিভি'র সাক্ষাতকারে কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, ‘এই আখেরি জমানায় আমেরিকা যদি ইসরাইলের পাশে না থাকে, তাইলে আমেরিকাকে শাস্তি পেতে হবে’।

প্রসঙ্গত যায়ো-গ্লোবালিজমের কথা আসে। সাবেক লুজিয়ানা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস-র সদস্য,  যিনি একজন রেসিয়েল রিয়েলিস্ট, মানে সকল জাতির নিজস্ব ঐতিহ্য লালন করবার অধিকার সমর্থনকারী, তিনি ডেভিড ডিউক, তিনি যায়নবাদী তৎপরতার ব্যাপারে বিস্তর লেখেন। তিনি একজন শাদা জাতীয়তাবাদী, তিনি যায়নবাদী ষড়যন্ত্রের তত্ত্ববিদ, তিনি হিউম্যান ফ্রিডমের পক্ষে, বৈচিত্রের পক্ষে।

তিনি যায়ও-গ্লোবেলিজমের চিন্তা খুলেমেলে দেখান।

তিনি দেখান, ২০১৫ সালের ২ মার্চ কংগ্রেসে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বক্তৃতাতেই এটা স্পষ্ট যে, আমেরিকা সুপারপাওয়ার না, সুপারপাওয়ার হলো যায়ও-গ্লোবেলিজম। মানে যে-গোষ্ঠী ইসরাইল চালায়, সে-গোষ্ঠী আমেরিকার রাজনীতি, অর্থনীতি, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

এছাড়া আমেরিকার একজন বিখ্যাত ইহুদী সাংবাদিক, ওয়াটারগেট কেলেংকারি উদঘাটনের অন্যতম অনুসন্ধানী কার্ল বার্নস্টাইন ২০১৩ সালের ৪ মে এমএসএনবিসি টিভি-র টক শো-তে সাফ বলেছিলেন, ইসরাইলি নিওকনজার্ভেটিভেরা আমেরিকাকে ইরাক যুদ্ধে যেতে বাধ্য করেছিল তাদের স্বার্থে। ইনি সেই বার্নস্টাইন, যিনি আর বব উডওয়ার্ড মিলে প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রশাসনের 'ডার্টি ট্রিক্স' বের করে দিয়েছিলেন, যা 'ওয়াটারগেট কেলেংকারি' নামে খ্যাত। ফলে ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে প্রেসিডেন্ট নিক্সন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ঐ টিভি টক শো-তে বার্নস্টাইন বলেছিলেন,'একটা বিনাশি যুদ্ধ করলো আমেরিকা সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে। আর ঐ যায়নবাদীদের মিথ্যাকে সমর্থন করেছিল নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টসহ তাদের নিয়ন্ত্রিত সম্প্রচার মাধ্যমগুলো।' তিনি জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক আক্রমণের কথা বলছিলেন।

আমেরিকার অনেক বুদ্ধিজীবিও তখন মিডিয়ায় গুরুত্বসহকারে বলেছিলেন আগ্রাসন না চালাতে। কারণ ওখানে বায়োলজিক্যাল ও কেমিক্যাল মারণাস্ত্র কিছু নাই।

তবু কেন বুশ ইরাকে আগ্রাসন চালাতে অনড় থাকলেন? কারণ ইসরাইলি যায়নবাদীদের কথা দিয়েছিলেন যুদ্ধে যাবেনই। ওয়াদা তারা আদায় করে নিয়েছিলেন। ওদের যুদ্ধ দরকার নানা কারণে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যায়নবাদীরা দুই পক্ষে সহায়তা দিয়েছিল। এমনকি হিটলারের নাজি বাহিনীকে পরিপুষ্ট করেছিলেন ইহুদী পরিচয়ের যায়নবাদীরা। কিন্তু ট্রাজেডি হল, পরে নাজি বাহিনী আর তাদের রাজাকারেরা প্রায় ছয় মিলিয়ন ইহুদী হত্যা করেছিল। এই হত্যাকাণ্ডকেও যায়নবাদীরা কাজে লাগিয়েছেন। মানে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার 'প্রধান কারণ' হিসাবে দেখিয়েছে দুনিয়াকে। মানে যায়নবাদীরা আওয়াজ তুলেছিলন জোরেশোরে— ইহুদীদের জন্যে নিরাপদ দেশ সুলাইমান আঃ এর রাজ্য 'কিংডম অব ইজরায়েল' এ ফিরে যেতে দাও। তারা আমেরিকার সহায়তা নিয়ে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা করে থেমে থাকে নি, তারা ইসরায়েলের সীমানা সম্প্রসারণ করে চলেছে আমেরিকার মৌন সমর্থন নিয়েই।

উল্লেখ্য, ৩ নভেম্বর ২০২০ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এ নির্বাচনের মাধ্যমে ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার জন্যে ট্রাম্পের এবারের শ্লোগান ‘কিপ আমেরিকা গ্রেট’। শ্লোগানটি জাতিগত দাম্ভিকতার। প্রায় দেড় বছর আগে থেকে এ শ্লোগান নিয়ে মাঠে ট্রাম্প। কিন্তু গত কয়েক মাসে কোভিড—১৯ মহামারি আর জর্জ ফ্লয়েড হত্যার কারণে বর্ণবাদবিরোধী জাগরণ ট্রাম্পের পুননির্বাচিত হওয়ার হিসাব সব উলটপালট করে দিয়েছে। কোভিড—১৯ বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর রাজনীতির হিসাব তছনছ করে দিয়েছে। বিশাল অনাকাঙ্খিত পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ সামনে। সেই পরিবর্তনকে নিজের পক্ষে নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি পুনরায় নির্বাচিত হন, সেটি হবে অভুতপূর্ব ‘সারপ্রাইজ ভিক্টোরি’। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক বিশেষজ্ঞ ড. এ্যান্থনি ফাউচি এরিমধ্যে জানিয়েছেন, ‘করোনায় গভীর সমস্যায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র’। দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, সরকারি হিসাবে যা এসেছে, রোগীর পরিমাণ তারও প্রায় ১০ গুণ বেশি হবে।

লেখক: কবি ও অনুবাদক। sarwarch@gmail.com