করোনা পরিস্থিতিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ইন্টারনেট সেবায় নতুন করে ৫% ভ্যাট এবং অন্যান্য স্তরে ১৫% ভ্যাট আরোপ করায় ক্ষুব্ধ এই খাতের সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এই ভ্যাট জটিলতায় গ্রাহক পর্যায়ে বিল বাড়বে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে ই-ক্যাব ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, নতুন করে ভ্যাট জটিলতায় ব্যয় বাড়লে এই খাত থেকে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যাবে। করোনা পরিস্থিতিতে যখন ভার্চুয়াল যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেট সেবায় সাধারণ মানুষের নির্ভরতা অনেক বেড়েছে, তখন ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) নেতারা বলছেন, চলতি জুলাইয়ের মধ্যে যদি এ সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে তারা আগস্ট থেকে সীমিত আকারে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করবেন। এতে করে তাদের দেওয়া হিসাবমতে প্রায় তিন কোটি গ্রাহক ইন্টারনেট সেবা থেকে বঞ্চিত থাকবেন।
আইএসপিএবি বলছে, আইএসপি সেবাদাতারা গ্রাহকদের কাছ থেকে ভ্যাট সংগ্রহ করে ৫ শতাংশ হারে। পক্ষান্তরে আইএসপিরা পাইকারি ব্র্যান্ডউইডথ আইআইজিদের কাছ থেকে কেনার সময় ভ্যাট দেয় ১৫ শতাংশ হারে ও ব্যান্ডউইডথ বহন করার জন্য এনটিটিএনদের ভ্যাট দেয় আরও ১৫ শতাংশ। মোট ৩৫ শতাংশ ভ্যাট সরকারকে দিতে হচ্ছে আইএসপিদের। একই পক্ষের ওপর বারবার ভ্যাট আরোপ এবং আইএসপিরা ভ্যাট আইনে রিবেট বা অব্যাহতি না পাওয়ার কারণে তাদের খরচ বেড়ে যায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ।
আইএসপিএবির দাবি, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যায্য ভ্যাটের শিকার হচ্ছে। এখন যে ভ্যাটের কাঠামো রয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে ক্রেতা পর্যায়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দাম ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। বিষয়টি সুরাহার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শরণাপন্ন হয়েছে সংগঠনটি। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার এনবিআরে যোগাযোগ করলে তারা আইএসপিএবির কাছে সময় চেয়েছে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য। আইএসপিএবির দাবি, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যায্য ভ্যাটের শিকার হচ্ছে।
জানতে চাইলে আইএসপিএবি সভাপতি আমিনুল হাকিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কিছু দিন আগে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলাম যে আমরা এই ভ্যাটের সমাধান জুলাইয়ের মধ্যে না হলে সীমিত পরিসরে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করব। তবে আশার খবর ইতিমধ্যে আমরা গত মঙ্গলবার এনবিআরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা বলেছে, তারা তাদের মিটিংয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের সিদ্ধান্ত জেনে আমাদের যে সাতশ সদস্য আছে তাদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব যে আমরা ইন্টারনেট সেবা দেব কি না।’
আইএসপিএবি সভাপতি আরও বলেন, ‘৫% ভ্যাট এবং ভ্যালু চেইনের অন্যান্য খাতে ১৫% ভ্যাট আরোপ ‘বৈষম্যমূলক’এবং মূসক আইনের ‘পরিপন্থী’। এক্ষেত্রে ইন্টারনেটের সকল ক্ষেত্রে ৫% অথবা ০% হারে ভ্যাট আরোপে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে (ইন্টারনেট সেবায় ৫% ভ্যাট এবং ভ্যালু চেইনের অন্যান্য ১৫% ভ্যাট) জটিলতা নিরসন হবে এবং প্রান্তিক পর্যায়ে ইন্টারনেটের মূল্য ৩০% থেকে ৪০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কাও দূর হবে। এর ফলে সর্বস্তরের ইন্টারনেট গ্রাহক ও দেশের জনসাধারণ অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে ইন্টারনেট সেবার আওতায় আসতে পারবেন।’
প্রতি ১ হাজার ব্রডব্যান্ড সংযোগের মাধ্যমে প্রায় ১০ জন কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থান হয় দাবি করে আমিনুল হাকিম বলেন, ‘ভ্যাট জটিলতা সমাধান হলে আগামী ১ বছরে প্রায় ১২ হাজার কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থান হবে। আর সেক্ষেত্রে এনবিআর ইন্টারনেটের প্রতিটি স্তরে (আইটিসি, আইআইজি, এনটিটিএন) ৫% ভ্যাট আরোপ করে প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারে।’
ফেইসবুক পেইজের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসা করেন শফিউল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার সময়ে এখন ডিজিটাল মার্কেটিংই ভরসা। এ সময় যদি কোনো কারণে ইন্টারনেট বন্ধ বা সাময়িক বন্ধ হয় তাহলে ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তাহলে ব্যবসা বলে আর কিছু থাকবে না।’
ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রগতির সঙ্গে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের প্রসার গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘খুব দ্রুত এনবিআরের সঙ্গে আইএসপিএবির সমস্যার সমাধান হওয়া দরকার। তা না হলে আমাদের মতো ছোট পুঁজির ব্যবসায়ীদের আরও ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।’
বাংলাদেশ ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন ৭০ লাখ ব্যবসায়ী আছেন। সবাই এখন ইন্টারনেটনির্ভর ব্যবসা করছেন। করোনা পরিস্থিতি ইন্টারনেটনির্ভর ব্যবসাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ই-কমার্স ভিত্তিক ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল ওয়াহেদ তমাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেখুন ব্রডব্যান্ডের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হলে ই-কমার্স ভিত্তিক সব ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। এতে গ্রাহক ও ক্রেতাদের ওপর একটা প্রভাব পড়বে। সামনের পৃথিবী হবে ডিজিটাল নির্ভর । সুতরাং সমন্বয় করে যত দ্রুত সম্ভব এই ভ্যাট সমস্যার সমাধান করা জরুরি।’