প্লাবিত নতুন নতুন এলাকা

ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে দেশের প্রধান প্রধান নদনদীর পানিবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদ এবং তিস্তা, ধরলা, ঘাঘট ও সুরমা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। পানি বাড়ার ফলে নদীতীরবর্তী নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে দেশের ১১টি জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টায় এসব অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতিরি অবনতির আশঙ্কা করছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

গতকাল রবিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, নাটোর, জামালপুর, নেত্রকোনা, সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। দেশের ১০১টি পর্যবেক্ষণাধীন পানি সমতল স্টেশনের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৬টির, হ্রাস পেয়েছে ২৩টির ও অপরিবর্তিত রয়েছে ২টির। আর ১৬টি স্টেশনের পানি বিপদসীমার ওপরে রয়েছে।

দেশ রূপান্তরের নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, টানা তিন দিন তিস্তা নদীর পানি বাড়ছে। এতে ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী ও গয়াবাড়ি ইউনিয়নের ১৫টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘রবিবার সন্ধ্যা ৭টায় তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার রেকর্ড ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাটই খুলে দেওয়া হয়েছে। বানভাসিদের নিরাপদ স্থানে নিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

লালমনিরহাট সংবাদদাতা জানান, জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তিস্তার পর ধরলা নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। গতকাল বিকেলে সদর উপজেলার মোগলহাটের শিমুলবাড়ি পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সদর উপজেলার মোগলহাট ও কুলাঘাট ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত হয়। সবমিলে তিন দিনের বন্যায় আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের প্রায় ২৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি। তবে এসব বানভাসির জন্য এখনো কোনো সহায়তা আসেনি।

জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর জানান, পানিবন্দি এলাকার মানুষের জন্য ১২০ মেট্রিকটন চাল ও নগদ ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই দুর্গতদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

কুড়িগ্রামের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানান, বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে তিস্তা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি প্রবাহিত হওয়ায় নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ এখন পানিবন্দি। কাউনের চাল, চিনা ও চরে উৎপাদিত মিষ্টি কুমড়া এখন তাদের খাদ্য।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জানানো হয়, বিকেল ৩টায় ধরলা নদীর পানি কুড়িগ্রাম সেতু পয়েন্টে ৬৪ সেন্টিমিটার, তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে ২ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্র নদের নুনখাওয়া পয়েন্টে ২৫ সেন্টিমিটার ও চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানিবৃদ্ধির ফলে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। ইতিমধ্যে বালাডোবা, সরকার পাড়া, খুদিরকুঠি, শেখ পালানু মৌজা, মশালের চর ও আমিনবাজার  এলাকার ৮৭টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, ব্রহ্মপুত্র নদ, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমা আগেই অতিক্রম করেছে। এখন বাড়ছে করতোয়া নদীর পানি। যদিও গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত বিপদসীমার ৬৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে এরই প্রভাবে গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নদনদীতে পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। ভাঙনরোধে চেষ্টা চলছে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, অবিরাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গতকাল প্লাবিত হয়েছে নতুন নতুন এলাকা। এখনো পানি নামেনি পৌর শহরের। বিভিন্ন উপজেলার লাখো পানিবন্দি মানুষের জন্য খোলা হয়েছে ২৫০টি আশ্রয়কেন্দ্র।

গতকাল দুপুরে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বিগত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৫২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তলিয়ে যাওয়ায় সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর-তাহিরপুর সড়ক এবং সুনামগঞ্জ-ছাতক সড়কেও যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, মাত্র চার দিনের ব্যবধানে জেলার বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনার পানি গতকাল বিকেল ৩টায় আবারও বিপদসীমার ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে দেওয়ানগঞ্জ ও ইসলামপুর উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়। ইতিমধ্যে ইসলামপুর উপজেলার চিনাডুলি, বেলগাছা, কুলকান্দি, পাথর্শী, নোয়ারপাড়া, সাপধরী এবং দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চুকাইবাড়ী, চিকাজানী ইউনিয়নের অন্তত ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন শাখা নদী, খাল-বিল পানিতে পূর্ণ থাকায় এবং প্রথম দফা বন্যার পানি না সরায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।