সর্বনিম্ন অবস্থানে ব্যাংকের গড় সুদহারের ব্যবধান

দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক গড় সুদহারের ব্যবধান। চলতি বছরের মে মাস শেষে সব ব্যাংকের ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান নেমে এসেছে ৩ শতাংশের নিচে। ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনায় ব্যাংকগুলোর ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। 

চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ঋণের সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দিলেও আমানতের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকটের কারণে অনেক ব্যাংকই উচ্চ সুদে আমানত গ্রহণ করছে। আবার সুদহার তুলনামূলক বেশি থাকলেও স্থায়ী আমানতের মেয়াদ শেষ না হওয়ায় ব্যাংকগুলোর এ খাতে ব্যয় বেড়েছে। এসব কারণেই গড় সুদহারের ব্যবধান সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে।

চলতি বছরের মে মাস শেষে সব ধরনের ব্যাংকের ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৯৪ শতাংশীয় পয়েন্ট, যা মার্চে ছিল ৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে কার্যকর করার প্রথম মাস এপ্রিলে ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান ছিল ২ দশমিক ৯২ শতাংশীয় পয়েন্ট।

ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান হচ্ছে ব্যাংকের ঋণের ভারিত গড় সুদহার ও আমানতের ভারিত গড় সুদহারের তফাত। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সব ব্যাংকের ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান ছিল ৪ দশমিক ১৯ শতাংশীয় পয়েন্ট, যা একই বছরের ডিসেম্বরে এসে ৩ দশমিক ৯৮ শতাংশীয় পয়েন্টে নামে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, মূলত ঋণের সুদহারের সীমা বেঁধে দেওয়ার কারণে ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান কমেছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুবিধার্থে ঋণের সুদহার কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান কমে আসাটা সন্তোষজনক।     

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ঋণের সুদহার বেঁধে দেওয়ার প্রভাবে এসএমই ঋণ বন্ধ হয়ে গেছে। এসএমই ঋণের পরিবর্তে ব্যাংকগুলো বড় ঋণগ্রহীতাদের দিকে ঝোঁক বাড়াবে। ব্যাংকগুলো আয় কমে যাওয়ায় এখন কর্মী ছাঁটাই করে টিকে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে। অপরদিকে আমানতের সুদহার কমে যাওয়ায় ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা ব্যাংকে অর্থ রাখতে নিরুৎসাহিত  হচ্ছেন।   

এ বিষয়ে সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামাল হোসেন বলেন, ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার কারণেই সুদহারের ব্যবধান কমে আসার প্রধান কারণ। ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামলেও সব ধরনের আমানতের সুদহার কিন্তু এখনো ৬ শতাংশে নামেনি। অনেক ক্ষেত্রেই ৭ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশে আমানতের সুদহার চলছে। এ কারণেই সুদহারের ব্যবধান কমে গেছে।

কামাল হোসেন আরও বলেন, সুদ আয় ব্যাংকের প্রধান আয়ের খাত। এখন সুদহারের ব্যবধান এত নিচে নেমে আসায় ব্যাংকগুলোর মুনাফায় বিরূপ প্রভাব ফেলবে। অনেক ব্যাংকের মুনাফা অর্ধেকের বেশি কমে আসবে। ইতিমধ্যেই ব্যাংকগুলোর অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে তার প্রভাব দেখা গেছে। এখন প্রধান আয়ের খাত কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো ব্যয় কমিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে। এর মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ কারণেই কর্মী ছাঁটাই, বেতন কমানোসহ অন্যান্য ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে। কভিড আমাদের জীবনব্যবস্থায় যেমন পরিবর্তন আনছে, তেমনি আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনবে।

ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনায় চলতি বছরের মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে আসে, যা এপ্রিলে ছিল ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

ব্যাংক খাতে সামগ্রিক সুদহারের ব্যবধান কমে এলেও এখনো ১৩টি ব্যাংকের ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট সীমার ওপরে রয়েছে। গড় সুদহারের ব্যবধান বেশি থাকা বেশিরভাগ ব্যাংকই বিদেশি মালিকানাধীন। দেশে কার্যক্রম চালানো ৯টি ব্যাংকের ভারিত গড় সুদের ব্যবধান ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।

যেসব ব্যাংকের ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান বেশি রয়েছে, সেগুলো হলো মধুমতি, ডাচ-বাংলা, উরি, সিটি ব্যাংক এনএ, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, দি হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি), ব্যাংক আল-ফালাহ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ, সীমান্ত ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক।

২০১৮ সালের মার্চে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ঋণ ও আমানতের সুদের হার যথাক্রমে ৯ ও ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোর গড় সুদহারের ব্যবধান ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে। তবে সীমা নির্ধারণ করলেও বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান সব সময়ই বেশি ছিল। চলতি মে মাস শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের ভারিত গড় সুদহার ছিল যথাক্রমে ২ দশমিক ৭৪ ও ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ।

মে মাস শেষে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান ২ দশমিক ৯৭ পয়েন্টে নেমে আসে। এ সময় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের গড় সুদহার ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৬৪ ও ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এ সময়ে সরকারি ব্যাংকগুলোর ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান ২ দশমিক ২৩ শতাংশে নেমে আসে। মে মাস শেষে সরকারি ব্যাংকগুলোতে আমানত ও ঋণের গড় সুদহার ছিল ৪ দশমিক ৩৪ ও ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের গড় সুদহার ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৬২ ও ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এ সময়ে ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান দাঁড়ায় ২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।