দুর্নীতির দায় এড়াতে পারে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়

করোনাভাইরাস মহামারীর কবলে পড়ে যখন দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা দুটোই চরম সংকটে তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চলছে চরম নৈরাজ্য। স্মরণকালের ভয়াবহতম এই মহামারী সামাল দেওয়ার কর্মযজ্ঞে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু দেখা গেল মহামারী সামাল দিতে গিয়ে শুরু থেকেই সিদ্ধান্তহীনতা, বিশৃঙ্খলা আর অনিয়মের কারণে করোনা পরীক্ষা করা আর করোনা রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না তারা। তার ওপর চিকিৎসক-নার্সদের নকল ও নিম্নমানের মাস্ক ও পিপিই সরবরাহের ঘটনাকে ঘিরে প্রবল জনঅসন্তোষ দেখা দেয়। এরপর জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতালের নমুনা পরীক্ষা না করেই করোনার ফল প্রকাশ জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশিত হয়। করোনা পরীক্ষা জালিয়াতির কারণে ইতালি থেকে বাংলাদেশি যাত্রী বহনকারী বিমান ফিরিয়ে দেওয়া হয়। লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে করোনা চিকিৎসা ও নমুনা পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হলেও এর দায় কেউ নিচ্ছে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একে অপরকে দায়ী করছে। অথচ এ অনিয়মের শিকার হয়ে ভুগছে সাধারণ মানুষ আর অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার লড়াই।

জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতালের প্রতারণার ঘটনা প্রকাশের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের অদক্ষতা ও ব্যর্থতা প্রশ্নাতীতভাবে সামনে চলে এসেছে। রবিবার জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ও সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক সাবরিনা আরিফ চৌধুরীকে করোনা পরীক্ষার নামে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর আগে ৬ জুলাই করোনা চিকিৎসার নামে প্রতারণার ঘটনায় রিজেন্ট হাসপাতাল সিলগালা করে দেয় র‌্যাব। এই হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমকে খুঁজছে পুলিশ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন, দোষীদের যাতে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়। বিভিন্ন সংস্থাকেও বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানও বলেছেন, সাহেদের দেশ ছাড়ার সুযোগ নেই। এদিকে, সর্বশেষ গণমাধ্যমে সাবরিনার ‘ভুয়া টেস্টের বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানতেন’ বক্তব্যের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নয়, এখন দুর্নীতির অভিযোগ থেকে নিজের পিঠ বাঁচাতেই সবাই ব্যস্ত। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সেখানকার একজন অতিরিক্ত সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, গত এক সপ্তাহ ধরে মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা সবাই নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতেই ব্যস্ত। তারা বিভিন্ন জায়গায় ধরনা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, গত কয়েক দিন ধরে একেবারেই টালমাটাল অবস্থা। শুধু ফাইল, চুক্তি এসব নিয়ে নির্দেশনা আসছে। সবার মধ্যে আতঙ্ক কে কখন ফেঁসে যান। মন্ত্রী ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময়ের কার্যক্রম খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে শুধু রিজেন্ট বা জেকেজি নয় আরও অনেক বেসরকারি হাসপাতালের জালিয়াতির তথ্য বেরিয়ে আসছে। শুধু বেসরকারি হাসপাতালেই নয় খোঁজ নিলে দেখা যাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও করোনা পরীক্ষা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। এখন অবশ্যই মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নতুন বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। জনস্বাস্থ্যবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে ঢেলে সাজাতে হবে। তারা বলেন, মন্ত্রী, অধিদপ্তরের ডিজি বা দায়িত্বশীল কেউই এই দায় এড়াতে পারেন না। মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ে যারা অবহেলা করেছে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে, মহামারীর বর্তমান বাস্তবতায় দেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কেননা, নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা কমে গেলেও সংক্রমণের হার কমতে দেখা যাচ্ছে না। তার ওপর সামনে কোরবানির ঈদকে ঘিরে পশুর হাট এবং দেশব্যাপী মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে যতটা সাফল্য অর্জিত হয়েছে সেটা নস্যাৎ হয়ে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তাই সরকারকে এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের দুর্নীতি ও অনিয়মের যথাযথ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতকে ক্রিয়াশীল রাখার ব্যাপারে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে স্বাস্থ্য খাতে বিগত ১০ বছরের দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্তে ১১ সদস্যের যে কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং একটি বিশেষ সংস্থাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অবশ্যই তা ফলপ্রসূ করতে হবে। এত কেলেঙ্কারির পরও এসব বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের যে দাবি উঠেছিল সে বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করাও জরুরি।