স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক শাজাহান সিরাজের মৃত্যু

চলে গেলেন স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শাজাহান সিরাজ (৭৮ (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আট বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে (সাবেক অ্যাপোলো) মারা যান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা পর্বের সাক্ষী শাজাহান সিরাজ। তিনি স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ, মেয়ে সারোয়াত সিরাজ ও ছেলে রাজীব সিরাজসহ অসংখ্য শুভাকাক্সক্ষী রেখে গেছেন। সাবেক মন্ত্রী ও চারবারের সংসদ সদস্য শাজাহান সিরাজ বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন।

শাজাহান সিরাজের সহধর্মিণী রাবেয়া সিরাজ বলেন, তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ অসুস্থ ছিলেন। বাসায় ও হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলত। আমি তার বিদেহী আত্মার জন্য কালিহাতীবাসীসহ দেশের সবার কাছে দোয়া চাই। তিনি আরও বলেন, উনার মরদেহ আগামীকাল বুধবার (আজ) টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে নেওয়া হবে। এলেঙ্গা শামসুল হক সরকারি কলেজে বেলা ১১টায় প্রথম ও বাদ জোহর কালিহাতীতে শাজাহান সিরাজ কলেজ মাঠে তার দ্বিতীয় জানাজা হবে।

এরপর বাদ এশা রাজধানীর গুলশান জামে মসজিদে তৃতীয় জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন শাজাহান সিরাজ।

রাজনীতিবিদ শাজাহান সিরাজের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়া শোক প্রকাশ করেছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপির পররাষ্ট্র উইংয়ের সদস্য প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন, গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রমুখ।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন শাজাহান সিরাজ। ২০১২ সালে তার ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ে। এর কয়েক বছর পর ক্যানসার ধরা পড়ে মস্তিষ্কেও।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শাজাহান সিরাজ। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তৈরির পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। ৩ মার্চ ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ। ছাত্রলীগের মাধ্যমে ষাটের দশকের শুরুতে রাজনীতি শুরু হলেও শেষ জীবনে বিএনপিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রী ও দলটির ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছিলেন তিনি। এরপর অসুস্থতার জন্য রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান এবং গত কয়েক বছর তিনি ছিলেন শয্যাশায়ী।

১৯৪৩ সালের ১ মার্চ টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে জন্মগ্রহণ করেন শাজাহান সিরাজ। তার বাবার নাম আব্দুল গণি মিয়া ও মায়ের নাম রাহিমা খাতুন। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতী পৌরসভার বেতডোবাতে। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে শাজাহান সিরাজ ছাত্ররাজনীতিতে প্রবেশ করেন। সেই সময় তিনি টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজের ছাত্র ছিলেন। এরপর তিনি ছাত্রলীগের মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতিতে উঠে আসেন। ১৯৬৪-৬৫ এবং ১৯৬৬-৬৭ দুই মেয়াদে তিনি করটিয়া সা’দত কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। একজন সক্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি ১১ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেন। এরপর তিনি ১৯৭০-৭২ মেয়াদে অবিভক্ত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’র (যার অন্য নাম নিউক্লিয়াস) সক্রিয় কর্মী, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা।

মুক্তিযুদ্ধের পর সর্বদলীয় সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে শাজাহান সিরাজ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠনে ভূমিকা পালন করেন, যা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিরোধী দল। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রতিষ্ঠাতা সহকারী সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। পরে জাসদ সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। জাসদের মনোনয়নে তিনবার তিনি জাতীয় সংসদের টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। শাজাহান সিরাজ ১৯৯৫ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি বিএনপির মনোনয়নেও একবার একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। খালেদা জিয়া সরকারের শেষ দিকে বন ও পরিবেশমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদের ‘চার খলিফা’ বলা হতো শাজাহান সিরাজ তাদের একজন। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব ছাত্রনেতাদের পাশাপাশি স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন আ স ম আবদুর রব। সেখান থেকেই পরবর্তী দিনে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠের পরিকল্পনা করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩ মার্চ ১৯৭১ পল্টন ময়দানে বিশাল এক ছাত্র জনসভায় বঙ্গবন্ধুর সামনে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেছিলেন শাজাহান সিরাজ। এরপর যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’ (বিএলএফ) বা মুজিব বাহিনীর কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষানুরাগী হিসেবে শাজাহান সিরাজ কালিহাতী উপজেলা সদরে কালিহাতী শাজাহান সিরাজ কলেজসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন কালিহাতী ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা।

বিএনপির শ্রদ্ধা: সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রী শাজাহান সিরাজের মরদেহে শ্রদ্ধা জানিয়েছে বিএনপি। গতকাল রাতে গুলশানের বাসায় লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে রাখা মরদেহের সামনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দলের চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান, স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ছেলে আবেদ আহমেদ প্রমূখ