রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সাড়ে চার বছর বয়সী নিহাল সাদমান (ছদ্মনাম) প্লে-শ্রেণির ছাত্র। দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর আগে নিয়মিত সকাল ৯টার মধ্যে ঘুম থেকে জেগে উঠত। নাশতা শেষে স্কুলের পথে রওনা হতো বাবা কিংবা মায়ের সঙ্গে। স্কুল শেষে বাসায় ফিরে সারা দিন শিশুসুলভ আচরণ ও দুরন্তপনায় মাতিয়ে রাখত সবাইকে। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর শিশু সাদমানের সেই দুরন্তপনা এখন আর নেই। সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে বসে থাকে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে। স্মার্টফোন নিয়ে জেগে থাকে মধ্যরাত পর্যন্ত। কখনো গেম খেলে, কখনো কার্টুন দেখে। আবার কখনো বড়দের নানা ওয়েবসাইটেও ঢু মারে। সাদমানকে খাওয়াতে গেলেও মোবাইল ফোন লাগে। তার কথা বলা, চিৎকার-চেঁচামেচি সবই মোবাইল ফোনে দেখা বিভিন্ন গেমসের চরিত্রের সঙ্গে মিল রেখে। দিন-রাতের অধিকাংশ সময়ই সাদমানের চোখ এখন আটকে থাকে ডিজিটাল স্ক্রিনে। তার বাবা মোহাম্মদ আলী বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার আগে আমার বাচ্চা একা একাই তিনতলা থেকে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামত। এখন তাকে ধরে ধরে নামাতে হয়। মাঝেমধ্যে রাস্তায় নিয়ে গেলে অজানা কোনো আতঙ্কে আমার হাত চেপে রাখে। কোনো ছোটাছুটি নেই। বাইরের কিছুই তাকে আকর্ষণ করে না। কেবলি তার ঘরে ফেরার তাড়া। পাগল পাগল আচরণ করে মোবাইল ফোন ছাড়া।’ শুধু মোহাম্মদপুরের সাদমান নয়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব শিশুরই এখন বিনোদনের পরিসর সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে তাই ঘরবন্দি অবস্থায় বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসে ব্যস্ত সময় কাটছে তাদের।
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল ডিভাইসে অতিমাত্রায় আসক্তির কারণেই অনেক শিশুমনে অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিচ্ছে। বদলে যাচ্ছে তাদের অভ্যাসগত চাঞ্চল্য। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে মানসিক সমস্যাসহ নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. সালাহ উদ্দিন কাওসার বিপ্লব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাচ্চারা ডিজিটাল ডিভাইস বা টেকনোলজি ব্যবহার করবে এটাই স্বাভাবিক। কোনোভাবেই এই টেকনোলজি থেকে দূরে রাখা ঠিক হবে না। আমি আপনি পেছনে পড়ে গেছি তাই বলে কি শিশুকেও দূরে রাখবেন? তবে অবশ্যই নির্দিষ্ট সময়ের অতিরিক্ত সময় ধরে যাতে ডিজিটাল ডিভাইসে কোনো শিশুর চোখ আটকে না থাকে সে বিষয়ে অভিভাবকদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। অন্যথায় ডিজিটাল ডিভাইসের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শিশুর চোখ ও মাথা ব্যথা করতে পারে। ক্ষুধামান্দ্য তৈরি হতে পারে। আবার বাচ্চার ওজন বেড়ে গিয়ে শারীরিক নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে। এর সঙ্গে মানসিক সমস্যাও হতে পারে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স ও গেমসের ধরনভেদে শিশুর বিকাশ কিংবা মানসিক সমস্যা ঘটতে পারে। সারা দিনই গোলাগুলি ও যুদ্ধের গেমস খেললে ছোট্ট শিশু অপরিচিত কাউকে দেখলেই গেমসের শত্রু মনে করতে পারে। সেক্ষেত্রে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, জন্ম থেকে আট বছর পৌঁছানোর মধ্যের সময়টুকু শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক মা-বাবা প্রারম্ভিক যতœ ও বিকাশের নিয়মগুলোর সঙ্গে পরিচিত নন। এর সঙ্গে জড়িত আছে পুষ্টি, শিক্ষা, খেলাধুলা এবং শিশুর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা। এর মধ্যে ডিজিটাল ডিভাইসের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার শিশুর ভবিষ্যৎ বিকাশে বড় অন্তরায় হতে পারে।
শিশু বিশেষজ্ঞ ড. আজহারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাকালের প্রায় ৫ মাস ধরে শিশুরা ঘরে বন্দি রয়েছে। এ সময়কালে শিশুর বাইরে বের হওয়া কমে গেছে। ফলে অনেক শিশু ঘরবন্দি থেকে স্মার্টফোনে আসক্ত হয়ে পড়ায় বিভিন্ন জটিলতায় পড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই আমার কাছে এ ধরনের অনেক শিশুকে নিয়ে তাদের অভিভাবকরা আসেন। এই শিশুরা কথা বলে না, কিন্তু মোবাইল ফোনের সবকিছু বোঝে। অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, বাবা-মার স্মার্ট ফোন ব্যবহার দেখেই শিশুরা এই ফোনের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে নানা ধরনের গেমসে আসক্ত হয়ে পড়ে। এই আসক্তি দূর করার জন্য তাদের হাতে ফোন না দিয়ে শিশুসন্তানকে অন্যান্য কাজে ব্যস্ত রাখতে অভিভাবকদের সময় দিতে হবে, যাতে ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত হওয়ার মতো কোনো সময় না পায়। ঘরের কাজ, বই পড়া, খেলাধুলা, পরিবারের সঙ্গে আড্ডা ও সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। শিশুবান্ধব ব্রাউজিংয়ের ফিচারগুলো দেখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে শিশু যাতে ক্ষতিকর বা বয়স অনুপযোগী কোনো সাইটে ঢুকে যেতে না পারে সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।’
ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশই শিশু। সেই হিসাবে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ৬ কোটির ওপর শিশু রয়েছে। দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা প্রসারের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারী, যার মধ্যে শিশুরাও রয়েছে।
বিটিআরসির ২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের প্রায় ৩.৫ শতাংশ নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকে, যার বড় একটা অংশই যুক্ত থাকে নানা ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া সাইটের সঙ্গে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম এ মোহিত কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে বিনোদনের জায়গা। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় সেই বিনোদন আর পাচ্ছে না। এতে শিশুরা দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকার কারণে বিরক্তি প্রকাশ করছে, রেগে যাচ্ছে। অল্পতেই ভাঙচুর করছে। শিশুদের শান্ত করতে গিয়ে বাবা-মা তাদের সামনে বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস তুলে দিচ্ছেন। ফলে টেলিভিশন ও ভিডিও গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে শিশুরা। এর ফলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও হীনমন্যতার শিকার হচ্ছে তারা। এতে অনেকের অটিজম, মনোযোগ হ্রাস ও তীব্র বিষণœতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।’
তার কাছে আসা রোগীদের মধ্যে একাধিক কেস স্টাডির কথা উল্লেখ করে দেশের খ্যাতনামা এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘কোনো গেমসের মধ্যে ঢুকে পড়লে তার ব্রেন নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন গেমস ছাড়া অন্য কিছু কাজ করে না। সৃজনশীলতা নষ্ট হয়ে যায়।’
করোনাকালে শিশুর এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় বলতে গিয়ে মোহিত কামাল বলেন, ‘স্মার্টফোনে কবিতা আবৃত্তি, চিত্র আঁকা, গান ও ছড়া পরিবেশন করে শিশুর সৃজনশীলতা বাড়ানো যেতে পারে। অর্থাৎ ডিজিটাল ডিভাইসের ইতিবাচক দিকগুলোতে শিশুদের ব্যস্ত রাখতে পারেন অভিভাবকরা। এক্ষেত্রে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারে অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণ রাখার কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়া করোনাভাইরাস সম্পর্কে বেশি আতঙ্কিত না করে এ বিষয়ে শিশুদের বুঝিয়ে বলতে হবে।’