স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী শাজাহান সিরাজকে গতকাল বুধবার রাতে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এর আগে বাদ এশা গুলশান সোসাইটি মসজিদে তার তৃতীয় দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে শাজাহান সিরাজের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো এক শোকবার্তায় শেখ হাসিনা মহান মুক্তিযুদ্ধে শাজাহান সিরাজের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মরহুমের স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ ও তার মেয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে শোকাহত পরিবারকে সান্ত¡না দেন এবং গভীর সমবেদনা জানান।
এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের পৃথক এক শোক বার্তায় শোকপ্রকাশ করেন।
গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে টাঙ্গাইলের কালিহাতী থেকে শাজাহান সিরাজের মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। এরপর এশার নামাজের আগে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় সোসাইটি মসজিদে। এখানে জানাজায় পরিবারের সদস্য ছাড়াও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী,
বিএনপি পররাষ্ট্র বিষয়ক উইংয়ের সদস্য প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন, তাবিথ আউয়াল, ঢাকা বারের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম, বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইং সদস্য শায়রুল কবির খানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
গতকাল বেলা ১২টার অ্যাম্বুলেন্সযোগে তার মরদেহ ঢাকা থেকে এলেঙ্গায় পৌঁছালে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর চোখের জলে তাকে বিদায় জানিয়েছেন টাঙ্গাইলের কালিহাতীর মানুষ। প্রিয় নেতাকে একবার দেখার জন্য তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী, ভক্ত-অনুসারীসহ দলমত-নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে।
এরপর কালিহাতীর এলেঙ্গা সরকারি শামসুল হক কলেজ মাঠে প্রথম জানাজা ও দুপুর আড়াইটার দিকে কালিহাতী সদরের শাজাহান সিরাজ কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় জানাজার আগে কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা নিপার উপস্থিতিতে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় এই বীর সন্তানকে। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। করোনাভাইরাসের কারণে সামজিক দূরত্ব মেনে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ায় মাঠে লোক সংকুলান হয়নি। পরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অনেক মানুষ জানাজায় অংশ নেন।
দুই স্থানেই প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষে ফুল দিয়ে মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে সবার উদ্দেশে কথা বলেন শাজাহান সিরাজের মেয়ে ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা। জানাজায় অংশগ্রহণ করেন টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনের সংসদ সদস্য হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারী, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনছার আলী বিকম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদার, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য লুৎফর রহমান মতিন, টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবাল, টাঙ্গাইল জেলা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম রফিক, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শুকুর মাহমুদ, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও কালিহাতী পৌরসভার মেয়র আলী আকবর জব্বার, এলেঙ্গা পৌরসভার মেয়র নূর এ আলম সিদ্দিকী ও উপজেলা বিএনপির যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক হিরোসহ জেলা ও উপজেলা বিএনপি, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নেতারা।
৭৮ বছর বয়সী শাজাহান সিরাজ গত মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে টাঙ্গাইলে শোকের ছায়া নেমে আসে। ঢাকায় বসবাসরত শাজাহান সিরাজের স্ত্রী রাবেয়া সিরাজকে ফোন করে সান্ত্বনা দেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা মরহুমের বাসভবনে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। শাজাহান সিরাজ ৮ বছর ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন।
বর্ণাঢ্য রাজনীতিবিদ শাজাহান সিরাজ ১৯৪৩ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আব্দুল গণি মিয়া এবং মাতার নাম রাহিমা খাতুন। বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতী পৌরসভার বেতডোবাতে। ৩ মার্চ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ। তিনি স্ত্রী, ছেলে রাজিব সিরাজ শুভ ও মেয়ে ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।