গাজীপুরের শ্রীপুর থানার ওসি হিসেবে কালিয়াকৈর থানার ওসি আলমগীর হোসেনকে এবং কালিয়াকৈর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সানোয়ার হোসেনকে একই থানার ওসি হিসেবে বদলি করা হয় গত ১৯ জুন। জেলা পুলিশ সুপারের আদেশ অনুযায়ী ১৯ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আলমগীর হোসেন শ্রীপুর থানায় ওসির দায়িত্ব বুঝে নেন। পরদিন ২০ জুন ভোরে খবর পান তাকে শরীয়তপুর জেলায় বদলি করা হয়েছে। ২০ জুন বেলা ১০টা ৩৫ মিনিটে আলমগীর দায়িত্ব হস্তান্তর করে শরীয়তপুর চলে যান। নিয়োগ ও বদলিতে জটিলতায় ৭ দিন থানার ওসি পদ শূন্য ছিল। রাতে যোগদান করলে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে অন্য জেলায় বদলি করা হয়। এভাবেই পুলিশের ননক্যাডার ও বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বদলিতে রয়েছে নানা জটিলতা।
আবার ১৯৯০ সালে এসআই হিসেবে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্য তার চাকরি জীবনে পদোন্নতি পেয়েছেন মাত্র একবার। একই ব্যাচের ক্যাডার কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়েছেন ৫-৬ বার। বিভাগীয় পুলিশ সদস্যদের পদোন্নতি নিয়েও রয়েছে দীর্ঘ জটিলতা। এসব জটিলতা নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। আজ ডাকা হয়েছে পুলিশের পলিসি গ্রুপের ভার্চুয়াল সভা। এই সভার সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে মাঠপর্যায়ের দেড় লাখের বেশি পুলিশ সদস্য।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি মইনুর রহমান চৌধুরীর কাছে পলিসি গ্রুপের সভার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে অন্য একজন অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, ‘বিষয়টি কনফিন্সিয়াল তাই কোনো মন্তব্য করব না।’
জানা গেছে, পদ শূন্য থাকলেও দীর্ঘদিন থেকে পুলিশে পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) থেকে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে পদোন্নতি আটকে আছে বহু বছর ধরে। এতে বিভাগীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। পরিদর্শক থেকে এসএসপি পদে পদোন্নতি না হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উপ-পরিদর্শক বা সাব-ইন্সপেক্টরাও (এসআই) পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পাচ্ছেন না। এতে মাঠ পুলিশের বড় একটি অংশ পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েই দায়িত্ব পালন করছে। কাক্সিক্ষত সেই পদোন্নতি পেতে পেতে অনেকের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার সময় চলে আসে। আবার বেশি বয়সে পদোন্নতি পেলেও তারা বয়সজনিত কারণে ওসিসহ ভালো পদে পদোন্নতি পাচ্ছেন না। ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা দেখা যায়।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া নথিতে দেখা গেছে, পুলিশের বিভিন্ন পদে বিভাগীয় পদোন্নতির (বিসিএস ক্যাডার বাদে) জটিলতা নিরসন করতে আজ বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তরে পলিসি গ্রুপের সভা ডাকা হয়েছে। আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদের সভাপতিত্বে ভার্চুয়াল এই সভায় ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেবেন সারদা পুলিশ অ্যাকাডেমির প্রিন্সিপাল, এসবি প্রধান, শিল্প পুলিশের মহাপরিচালক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, এপিবিএনের অতিরিক্ত আইজিপি, র্যাব মহাপরিচালক, এন্টি টেররিজম ইউনিটের প্রধানসহ ১৩ অতিরিক্ত আইজিপি, সিএমপি, কেএমপি, আরএমপি, বিএমপি, জিএমপিসহ সব মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশালসহ সব রেঞ্জ ডিআইজি (১২ জন), পিবিআই, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও নৌপুলিশের ডিআইজি। প্রত্যেক কর্মকর্তাকে বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটের আগেই স্ব স্ব ভিডিও কনফারেন্সিং ডিভাইসের মাধ্যমে সভায় সংযুক্ত হতে বলা হয়েছে।
সভায় ৭টি এজেন্ডা রাখা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে ‘ইন্সপেক্টর থেকে এএসপি পদে পদোন্নতি প্রদান সংক্রান্ত নীতিমালা স্পষ্টকরণ, পুলিশ ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি ও স্থায়ীকরণ ক্ষেত্রে নীতিমালা স্পষ্টকরণ, বিভাগীয় এসএসপি থেকে অ্যাডিশনাল এসপি পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা নীতিমালা স্পষ্টকরণ, প্রমোশন অ্যাপ্রুভ লিভের (পিএএল) নামকরণ, আউটসাইড ক্যাডেটের পরিবর্তে এসআই (নিরস্ত্র) নামকরণ, পুলিশের অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষায় মেধাতালিকা কেন্দ্রীয়ভাবে প্রণয়ন এবং বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনার নিমিত্তে গঠিত কমিটির প্রস্তাবনা উপস্থাপন।
রাজধানীর পাশের একটি থানার এক ওসি নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এমএ পাস করে ২০০০ সালে এসআই হিসেবে পুলিশে চাকরি নেই। আমার ক্লাসমেট যারা এসএসপি হিসেবে প্রবেশ করেছে তাদের অধিকাংশই এখন অতিরিক্ত ডিআইজি। ওইসব ক্যাডার কর্মকর্তারা ৪ থেকে ৫টি পদোন্নতি পেয়েছেন অথচ চাকরি জীবনে আমি মাত্র একবার পদোন্নতি পেয়েছি। চাকরির বয়স প্রায় শেষ পর্যায়ে, কিন্তু পদ থাকার পরও পদোন্নতি হচ্ছে না। পরিদর্শক থেকে এসএসপি পদোন্নতি আমাদের প্রাণের দাবি।’
প্রায় একই ধরনের আক্ষেপ প্রকাশ করে রাজধানীর একটি থানার ওসি বলেন, ‘বলা হচ্ছে তিনবার কেউ ওসির দায়িত্ব পালন করলে আর ওসি হতে পারবেন না। তাহলে আমাদের যারা পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য তাদের পদোন্নতি দেওয়া হোক।’
মাঠ পুলিশ ও পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পলিসি গ্রুপের কাছে মাঠ পুলিশ সদস্যরা যেসব দাবি পেশ করেছেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে : এসআই থেকে পরিদর্শক পদে পদোন্নতির জন্য ৬ বছর সময় নির্ধারণ করে দেওয়া, পরিদর্শক থেকে সহকারী পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতির জন্য ৫ বছর নির্ধারণ করে দেওয়া, পরিদর্শক পদে পদোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষানবিস ঘোষণা করা এবং এক বছর চাকরি শেষে ওই পদে স্থায়ী করা, সহকারী পুলিশ সুপারের শূন্য পদের ৫০ ভাগ পদ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা, পুলিশ পরিদর্শকদের (প্রথম শ্রেণি) র্যাংক ব্যাচ পরিবর্তন করা, তাদের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার সুযোগ সুবিধা দেওয়া, এসআই পদে নিয়োগের সময়ে প্রশিক্ষণকালকে সার্ভিসকাল হিসেবে গণ্য করা, সকল বিভাগীয় পদোন্নতি কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যবস্থা, সার্জেন্টদের টিআই পদে পদোন্নতির জন্য ৬ বছর নির্ধারণ এবং ১৮ মাসের আগে কোন থানার ওসিকে সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক কারণ ছাড়া বদলি না করা ইত্যাদি।