প্রাথমিক শিক্ষার উপর করোনার প্রভাব

গত বছরের শেষে চীনে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এর পর ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যায়। গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। করোনার প্রাদুর্ভাব কমাতে সরকার ২৬ মার্চ থেকে দেশে লকডাউন ঘোষণা করে। তার আগে ১৮ মার্চ থেকে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। ফলে দেশের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এতে স্বভাবতই শিক্ষা ব্যবস্থার উপর প্রভাব পড়ছে। এইচ,এস,সি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। মাধ্যমিকের রেজাল্ট দিতেও দেরি হয়েছিল। জে,এস,সি কিংবা পি,ই,সি পরীক্ষা কবে হবে তারও নেই কোন নিশ্চয়তা। প্রাথমিক শিক্ষার উপরও এরই মধ্যে করোনার প্রভাব গুরুতর আকার ধারণ করছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির মাধ্যমেই শিক্ষা জীবন শুরু করে শিক্ষার্থীরা,ফলে এটা তাঁদের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়।প্রায় ৪ মাস ধরে অন্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মত বন্ধ থাকার ফলে প্রাথমিকের দুই কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত এখন হুমকির মুখে।করোনা দুর্যোগ দেখা দেওয়ার পর থেকে অনেকে শিক্ষার্থীর অবিভাবকেরা কর্মহীন হতে থাকে। যা তাঁদের আর্থ- সামাজিক অবস্থার উপর প্রভাব ফেলছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের মতে, বাংলাদেশে অন্তত দেড় কোটি লোক চাকরি হারাতে পারে। যার প্রভাব পড়বে তাঁদের পরিবারের উপর। বাংলাদেশের তিন কোটি মানুষ গরিব রয়েছে। করোনা দারিদ্র্যের হার বাড়িয়ে দিবে। প্রাথমিকে অনেক শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়ার মূল কারণ দারিদ্র্য। ফলে করোনা পরোবর্তী আনেক শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়তে পারে। কারন তাদের অবিভাবকেরা কর্মহীন হলে তাঁদের সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। করোনা পরবর্তীতে সিলেবাস ঠিক রেখে মান সম্মত শিক্ষা দেওয়াটাও একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিবে। সরকার শিক্ষা কার্যক্রম অব্যহত রাখতে সংসদ টিভির মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠদান কার্যক্রম চালাচ্ছে। ইতোধ্যে জুম ও গুগল মেটের মাধ্যামে অনলাইন ক্লাসও শুরু হয়েছে। কিন্তু তাতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ সন্তোষজনক না।এর কারণ বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরই নেই ইন্টারনেটের ব্যবস্থা। তাছাড়া টেলিভিশনে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখায় আগ্রহ থাকলেও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখায় খুব বেশি আগ্রহ নেই তাদের-এমনকি তাদের অভিভাবকদেরও। সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতেও প্রাথমিক পর্যায়ে অনলাইনে ক্লাস শুরু হলেও নেটওয়ার্ক জনিত সমস্যার কারণে মানসম্মত ক্লাস নেয়া সবসময় সম্ভব হচ্ছে না।

করোনা পরবর্তী প্রথমিক শিক্ষায় কেমন প্রভাব পড়বে তা জানতে আমরা ঢাকার মিরপুর ও উত্তরার দুইটি স্কুলের ৪৫ জন শিক্ষার্থী ও কিছু অবিভাবকের সাথে কথা বলি। স্কুল দুইটির বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের বসবাস বস্তি অঞ্চলে। তাঁদের বাবারা ছোট খাটো ব্যবসা, বাসা বাড়ির দারোয়ান, চায়ের দোকান, ঝালমুড়ি বিক্রেতা ও মায়েরা ছুটা বুয়া, চায়ের দোকান, ঘরে বসে টেইলারিং ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে জীবিকার ব্যবস্থা করে। করোনার ফলে তাদের কর্মকান্ডে প্রভাব পড়ছে। অনেকে কাজ হারিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। আবার অনেকে তাঁদের স্কুল পড়ুয়া সন্তানদের গ্যারেজে কাজ শেখাচ্ছেন,কেউ বা চায়ের দোকান কাজ নিয়েছে। তাঁদের অনেক অবিভাবকেরা জানিয়েছেন আর্থিক সংকটের কারনে তাঁদের সন্তানেরা স্কুলে ফিরতে পারবে কিনা তারা নিশ্চিত নন। তবে গ্রাম অঞ্চলের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। তাঁরা স্কুলে যেতে পারলেও এত দিনের পড়ালেখার যে ঘাটতি তা পুষিয়ে উঠতে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।

ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অব গভর্ন্যান্সের একটি তথ্যে উঠে এসেছে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে শিক্ষার্থীদের ৮০ শতাংশ পড়াশোনা কম হচ্ছে এবং ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী পরিবারের আয়মূলক কাজে জড়িয়ে পড়েছে।করোনা নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের উপর বেশি প্রভাব ফেলবে। কারন বাবা মায়েরা সন্তানদের কাজে পাঠাবে সংসারের অর্থ যোগানে। অনেকের পক্ষে শিক্ষার উপকরণ ও স্কুলের অন্যান্য খরচ মেটানো সম্ভব হবে না ফলে শিশু শ্রম বাড়বে।

চিত্রে দেখা যাচ্ছে করোনা পরবর্তী স্কুলে ফিরতে সমস্যা হবে ২৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর, ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলে আসতে পারবে আর ১০ শতাংশ শিক্ষার্থীর পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ায় রয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে দেখা যাচ্ছে আনেক শিক্ষার্থী তাঁদের মৌলিক অধিকার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। ইতোমধ্যেই করোনাজনিত আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত প্রায় সতের বছরের পুরোনো “ফুলকুড়ি কিন্ডারগার্টেন” নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিক্রিত হয়েছে, যার ২৫০ জন পিইসি ও জে,এস,সি পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এখন হুমকির মুখে। নানা উদ্যোগে প্রথমিকে এখন ভর্তির হার প্রায় শত ভাগ। কিন্তু করোনা পরবর্তী একটা বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা। দেশের একটি জাতীয় দৈনিক প্রতিবেদন করেছিল করোনার পরে ৩০ ভাগ শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়তে পারে যা শুধু প্রথমিকে না শিক্ষার প্রতিটা স্তরেই প্রভাব ফেলবে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সম্ভাবনা ক্ষীন। ফলে সামনের দিনে গুণগত শিক্ষা ও শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়া রোধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।

কিছু উদ্যোগ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে-

১। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেতন, ফি সহ অন্যান্য খরচ সরকার ব্যবস্থা করবে। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চ হারে বেতন দিয়ে পড়তে হয়, ফলে এখানে শিক্ষার্থীদের স্কুলগামী ও ঝগে পড়া রোধ করতে দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে।

২। শহর অঞ্চলের আনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু রেখেছে কিন্তু গ্রামে সম্ভব হচ্ছে না। গ্রামের শিশুদের শিক্ষার যথাযথ ব্যবস্থার উদ্যোগ নিতে হবে। অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে।

৩। উপবৃত্তির পরিমান বৃদ্ধি করতে হবে। এবং যথাসময়ে এর প্রাপ্তি সুনিশ্চিত করতে হবে ।

 ৪। নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের অবিভাবকদের সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, যার ফলে তাঁরা স্ব-কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সংসারের অর্থের ব্যবস্থা করতে পারবে ফলে তাঁদের সন্তানেরা স্কুলগামী হবে।

৫। কৃষি শিল্পসহ সমস্ত সেক্টর কে গুরুত্ব দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে ফলে দারিদ্র্যের হার কমে যাবে।

৬। শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে আনন্দমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা,বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে।

৭। প্রতিটি স্কুলে ডে-মিল চালু করা প্রয়োজনে হত দরিদ্র শিক্ষার্থী পরিবারের সদস্যদের রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করা।

৮। তালিকা ধরে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার খোঁজখবর নিতে হবে।

৯। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে বা অর্ধ বেতনে পড়ার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।

১০। গ্রাম অঞ্চলে অধিক কর্মসংস্থান এর ব্যবস্থা করতে হবে যেন মানুষ অতিরিক্ত শহরমুখী না হয়।

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড । আর শিক্ষার্থীরা জাতির ভবিষ্যৎ । জাতির ভবিষ্যতকে উজ্জ্বল রাখতে তাই করোনা পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতে গুরুত্ব দিতে হবে ।

লেখক: মো. শাহিন রেজা, আফাজউদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ, কালিয়াকৈর, গাজীপুর ও রবিউন নাহার তমা শিক্ষক, জাহানাবাদ সরকারী প্রথমিক বিদ্যালয়, মুসফেরা জাহান শর্মি, নগরপরিকল্পনাবিদ।