গ্রেপ্তারের পর থেকেই ক্ষণে ক্ষণে অসুস্থতার ভান করছেন করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদসহ বহুমাত্রিক জালিয়াতিতে আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম। কখনো বলছেন, বুকে ব্যথা। আবার কখনোবা মাথা ঘোরানোর কথা। তাতেও কাজ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত নিজেকে করোনা রোগী হিসেবে দাবি করেন। কিন্তু এত সব করেও নিস্তার মেলেনি। তদন্তকারী সংস্থাগুলো তার ভাষ্য আমলে নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এরপর গতকাল বৃহস্পতিবার কোমরে মোটা দড়ি বেঁধে ঢাকার আদালতে হাজির করা হয় রিজেন্ট চেয়ারম্যান সাহেদকে।
এদিকে ২০১৬ সালে চেক জালিয়াতির এক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর সাংসদ ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাসহ কিছু প্রভাবশালীর তদবিরের প্রেক্ষাপটে সাহেদ এক সপ্তাহের মধ্যে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন বলে তথ্য মিলেছে।
গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ডিবি কার্যালয় থেকে সাহেদ করিমকে আদালতে নেওয়া হয়। বেলা ১১টার দিকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত শুনানি নিয়ে সাহেদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। একই মামলায় রিজেন্ট হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ পারভেজকে ১০ দিন ও কর্মী তরিকুল ইসলামের ৭ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।
গতকাল আদালতে আনার পর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কান্না জুড়ে দেন সাহেদ। সাহেদকে কোমরে মোটা দড়ি বেঁধে আদালতে হাজির করা হয়। তার গায়ে ছিল নীল রঙের শার্ট। শরীরে ছিল বুলেট প্রুফ জ্যাকেট। মাথায় হেলমেট। চোখে কালো চশমা। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে সাহেদ বলেন, ‘স্যার, আমি একটু কথা বলতে চাই।’ বিচারক তখন অনুমতি দেন। এ সময় সাহেদ বলতে থাকেন, ‘আমার দুটি হাসপাতালসহ একটি হোস্টেল গভারমেন্টকে দিই। এরই মধ্যে যে জিনিসটা হয় স্যার, সেটি হলো আমাদের লাইসেন্স এক বছরের জন্য নবায়ন করা হয়নি। ওনারা লাইসেন্স নবায়নের জন্য আমাদের কাছ থেকে সোনালী ব্যাংকের ট্রেজারিতে টাকা জমা নেয়। টাকা জমা নিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে স্যার। আমি দেড় মাস ধরে নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। আমার বাবা করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। যখন কেউ করোনার চিকিৎসা দিতে এগিয়ে আসেনি, তখন বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে আমরাই প্রথম এগিয়ে এসেছিলাম। বাংলাদেশে যখন কোনো হাসপাতাল করোনা চিকিৎসা দিচ্ছিল না, তখন রিজেন্ট হাসপাতাল চিকিৎসা দিয়েছে। কিন্তু আকস্মিকভাবে এই রিপোর্টগুলো সামনে আসে। শুধু তা-ই নয়, আমাদের হেড অফিসকে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। হেড অফিসের তো কোনো অন্যায় নেই। আমাদের একটি ল ফার্ম ছিল, সেটিও সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের সব প্রতিষ্ঠান সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।’ তখন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সাহেদকে থামিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি আইনজীবী যে ল ফার্ম দিয়েছেন?’ এ সময় আইনজীবীরা বিচারককে বলেন, ‘দেখেন স্যার, এখানেও প্রতারণা করেছে এই আসামি।’
করোনা সংক্রমিত ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু চুক্তি ভঙ্গ করে করোনা সংক্রমিতদের চিকিৎসার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা নিতে থাকে রিজেন্ট হাসপাতাল। এ ছাড়া করোনার নমুনা সংগ্রহ করে ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ারও অভিযোগ ওঠে রিজেন্টের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ পাওয়ার পর ৬ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালায় র্যাব। করোনার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার প্রমাণ পেয়ে র্যাব রিজেন্ট চেয়ারম্যান সাহেদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করে। একই সঙ্গে রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখা সিলগালা করে দেওয়া হয়। হাসপাতালে অভিযানের দিন থেকে পলাতক থাকার পর গত বুধবার ভোরে সাতক্ষীরা থেকে সাহেদকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় র্যাব। ওই দিন বিকেলে তাকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করে র্যাব। রিজেন্টের বিরুদ্ধে করা জালিয়াতির মামলা তদন্ত করছে ডিবি।
আদালতে গতকাল প্রতিবেদন দিয়ে ডিবি বলেছে, সাহেদ নিজেকে ক্লিন ইমেজের লোক বলে দাবি করেন। তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে সাহেদ একজন ধুরন্দর, অর্থলিপ্সু ও পাষ- প্রকৃতির লোক। অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে তাদের কাছে মানুষের জীবন-মৃত্যুর কোনো মূল্য নেই। সাহেদ তার সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট ও চিকিৎসা দেওয়ার নামে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সাহেদের প্রতারণার বিষয়টি জানার পর কোনো রোগী যদি প্রতিবাদ করতেন, তাদের তিনি বিভিন্নভাবে হুমকি দিতেন। এর ফলে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না। গত মার্চ মাস থেকে এখন পর্যন্ত সাহেদ করোনার ভুয়া রিপোর্ট ও চিকিৎসার প্রতারণার মাধ্যমে তিন থেকে চার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু বলেন, আদালতে মো. সাহেদ বলেছেন যে তিনি নিজেই করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী। অভিযুক্তরা করোনাভাইরাসের ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে রাষ্ট্রের ক্ষতি করেছেন। এমনকি বিদেশ থেকেও এ জন্য অনেককে ফেরত আসতে হয়েছে। তাই তদন্তের স্বার্থে রিমান্ডের আবেদন মঞ্জুরের অনুরোধ করেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. আবদুল বাতেন জানিয়েছেন, করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে প্রতারণা এবং রোগীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সাহেদ স্বীকার করেছেন। তার কাছ থেকে প্রতারণার ব্যাপারে নানা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘সাহেদ অনেক কিছুই বলেছেন ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে। তবে এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। পালিয়ে থাকার ব্যাপারেও কথা বলেছেন। টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়েও কথা বলেছেন তিনি। প্রতিদিনই নতুন নতুন মামলার তথ্য আসছে। অনেক মামলা। সব মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করা এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে ধীরে ধীরে সব তথ্য বের হয়ে আসবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘র্যাবের অভিযানের আগে রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা শাখা থেকে যন্ত্রপাতিসহ বেশ কিছু সরঞ্জাম সরিয়ে ফেলা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সাহেদ। ডিবির অভিযানে এসব যন্ত্রপাতি উদ্ধার করা হবে। করোনাকালে দুই মাসে অন্তত চার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন প্রতারক সাহেদ। হাসপাতাল ছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বেশি দামে পণ্য এনে কম দামে বিক্রি করে টাকা পকেটে ভরেছেন। অথচ কারও টাকা তিনি পরিশোধ করেননি। তার বিরুদ্ধে আরও যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলো একে একে স্বীকার করছেন। রিমান্ডে সাহেদ ও মাসুদকে আলাদা এবং মুখোমুখি করেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
র্যাব জানিয়েছে, গত বুধবার সাহেদের উত্তরার বাসা থেকে জাল টাকা উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় এবং সাতক্ষীরায় র্যাব বাদী হয়ে দুটি মামলা করেছে। তার দুদিন আগে ৫৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করায় রাকিবুল ইসলাম হেলালী নামে এক ব্যবসায়ী আরেকটি মামলা করেছেন।
২০১৬ সালে গ্রেপ্তার হয়ে এক সপ্তাহের মধ্যেই ছাড়া পান : ঢাকা মহানগর পুলিশের ( ডিএমপি) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৬ সালে ৬০ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করেন এক ব্যবসায়ী। ইসলামপুরে তার একটি কাপড়ের দোকান ছিল। ভারত থেকে এক ব্যবসায়ী কাপড় এনেছিলেন। কিন্তু চেক দিলেও ব্যাংকে কোনো টাকা ছিল না। ওই মামলায় সাহেদকে গ্রেপ্তার করার পর উল্টো চাপে পড়ে পুলিশ। সাংসদ থেকে শুরু করে পুলিশের বড় কর্মকর্তারা তখন ফোন করে সাহেদকে ছেড়ে দিতে বলেছেন। সেসব চাপ উপেক্ষা করে সাহেদকে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। কার অনুমতি নিয়ে সাহেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তার কৈফিয়তও দিতে হয়েছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের। পরে তদবিরের মুখে দুর্বল প্রতিবেদন দিয়ে তাকে আদালতে পাঠানো হয়। এরপর আদালত জামিন দেয় সাহেদকে।
ডিএমপির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এখন উচিত যারা সাহেদের জন্য তদবির করেছিল তাদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া। তাহলেই তদবিরবাজি বন্ধ হয়ে যাবে।’
প্রতারণার আরেক মামলায় এরও আগে একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাহেদ করিম। ২০১০ সালে রাজধানীর ধানম-ি থানায় করা ওই মামলায় গ্রেপ্তারের পর তিন মাস কারাগারে ছিলেন তিনি। পরে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে সাহেদ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বের হয়ে আসেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
ক্ষণে ক্ষণে অসুস্থতার ভান : গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, সাহেদ জীবনের প্রতিটি পদে প্রতারণাকে এত নিপুণতার সঙ্গে উপস্থাপন করেন যে বিভ্রান্ত না হয়ে পারা যায় না। বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করার আগ মুহূর্ত থেকেই সাহেদ করোনা রোগী বলে দাবি করতে থাকেন। এমনকি আদালতে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাহেদ নিজেকে করোনা রোগী বলে দাবি করেন। এ ছাড়া তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকায় আনার পর দাবি করেন, তার বুকে ব্যথা হচ্ছে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে তার এক্স-রে ও ইসিজি করা হয়। যদিও চিকিৎসক ও র্যাব কর্মকর্তারা জানান, সব রিপোর্ট ভালো এসেছে, কোনো সমস্যা নেই।
সাহেদের অসুস্থতার খবর কতটা সত্য জানতে চাইলে পুলিশ ও র্যাবের দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাহেদের দাবিগুলো হাস্যকর। সাতক্ষীরায় তাকে নৌকা থেকে আটক করার পরই তিনি ভালো লাগছে না, শরীর খারাপ বলে দাবি করেন। ঢাকায় আনার পর হেলিপ্যাড থেকে মাইক্রোবাসে তোলার সময়ও চরম উত্তেজিত হয়ে তার শরীর খারাপ লাগার কথা জানান। র্যাব অফিসে কয়েক ঘণ্টা রাখার পর ডিবিতে নেওয়ার সময় তিনি জানান, বুকে প্রচ- ব্যথা। সেটা আমলে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। তারপর বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই করোনা আক্রান্ত বলে দাবি করতে থাকেন। মূলত তিনি জিজ্ঞাসাবাদ এড়ানোর জন্যই এমন ধূর্ততা ও কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন।