বরখাস্ত জনপ্রতিনিধিরা আদালতের কাঁধে ভর দিয়ে ফিরছেন স্বপদে

সরকারি ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে গত ১৫ এপ্রিল সাময়িক বরখাস্ত হন বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের আন্দারমানিক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাজী সহিদুল ইসলাম। তবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত খুব বেশি সময় তাকে চেয়ারম্যান পদের বাইরে রাখতে পারেনি। তিনি সরকারের বরখাস্তের আদেশকে আদালতের মাধ্যমে স্থগিত করে আবারও স্বপদে ফিরেছেন। গত ১৪ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে তাকে বহাল করা হয়। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের খয়েরপুর আবদুল্লাহপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শুক্কুর আলীকেও ত্রাণ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়। এই জনপ্রতিনিধিও আদালত থেকে সরকারের আদেশকে স্থগিত করে স্বপদে ফিরতে স্থানীয় সরকার বিভাগে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ জুলাই তাকে স্বপদে ফিরিয়ে অফিস আদেশ জারি করা হয়। পটুয়াখালী সদর উপজেলার কমলাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনির রহমান মৃধাকে সরকারি চাল আত্মসাতের অভিযোগে হাতেনাতে ধরার পর কারাগারে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের চিঠির পর স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে গত ২৩ এপ্রিল তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একইভাবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এ জনপ্রতিনিধিও আদালত থেকে আদেশ এনে স্বপদে ফিরছেন।

দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর সরকরের পক্ষ থেকে দেওয়া ত্রাণসামগ্রী ও অর্থ বিতরণ না করে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে বেশকিছু জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে। এমন অবস্থায় কঠোর অবস্থানে গিয়ে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের সাময়িক বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৫ জন ইউপি চেয়ারম্যান, ৬৬ ইউপি সদস্য, ১ জন জেলা পরিষদ সদস্য, ৪ পৌর কাউন্সিলর, ১ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানসহ ১০৭ জনকে বরখাস্ত করেছে সরকার। কিন্তু তারা আবারও স্বপদে ফিরতে শুরু করেছেন। করোনাকালীন সময়ে ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমে সরকারের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে আসছেন তারা। এরপর তারা আবারও নিজ দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অপরাধ করে এভাবে পদ ফিরে পেলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হবে।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমদ গত বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ত্রাণে অনিয়ম হলে আমরা কোনো ছাড় দিচ্ছি না। এ পর্যন্ত একশর বেশি বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করেছি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে কেউ কেউ হাইকোর্টের ভার্চুয়াল আদালতে গিয়ে সরকারের আদেশকে স্থগিত করছে। স্থগিতাদেশ পাওয়ার পর আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের বলেছি। আবার যারা স্থগিতাদেশ নিয়ে এসেছে তাদের বিষয়ে সরকারি আইনজীবীকে আপিল করতেও বলা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীন বিচার ব্যবস্থায় আদালত যে রায় দিচ্ছে তা তো আমরা মেনেই নিচ্ছি। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলকেও বলা হয়েছে। আশা করছি এ ধরনের আদেশ আর হয়তো আসবে না।’

স্থানীয় সরকার বিভাগ জানায়, ত্রাণে অনিয়ম ঠেকাতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি তারা বিতরণ ও তালিকা তৈরিতে নিয়েছেন কিছু পদ্ধতিগত পরিবর্তন। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন এলাকায় সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের সহায়তা সুষ্ঠুভাবে বিলি-বণ্টন করতে ওয়ার্ড পর্যায়ে গঠন করা হয়েছে কমিটি। স্থানীয় কাউন্সিলরের নেতৃত্বে এ কমিটিতে আছে এনজিও প্রতিনিধি, মসজিদের ইমাম, বিশিষ্ট তিনজন ব্যক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের প্রতিনিধি, নারী সমাজকর্মী ও শিক্ষক প্রতিনিধি। ঢাকার দুই সিটিসহ ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রও এ কাজের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন। এছাড়া জেলা পর্যায়ের অফিস প্রধান ও উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। এ কাজে উপজেলা পর্যায়ে সমবায় কর্মকর্তা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, সাব-রেজিস্ট্রার, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকল্প উন্নয়ন কর্মকর্তাসহ ৩০ কর্মকর্তাকে যুক্ত করা হয়েছে। এরপরও গত কয়েক মাসে ১০৭ জন জনপ্রতিনিধি নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ এর ধারা (২৫)১ মামলা করা হয়েছে। বিধিমতে এসব মামলা তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে লিখিতভাবে অভিযোগ পাওয়ার পর ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অপরাধমূলক কার্যক্রম জনস্বার্থের পরিপন্থী বিবেচনায় স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯-এর ৩৪(১) ধারা অনুযায়ী তাদের পদ হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন আদালতের স্থিতিবস্থা নিয়ে আসায় বিষয়টি নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব (ইউনিয়ন পরিষদ) মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি ত্রাণ ওজনে কম দেওয়া, তালিকা অনুযায়ী না দিয়ে বিক্রি করে দেওয়া, গায়েবি লোকজনের নামে বরাদ্দ দেওয়া, স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বরাদ্দ দিয়ে সেখান থেকে একাংশ নিয়ে নেওয়া ও নগদ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে আমরা এ পর্যন্ত ১০৭ জন তৃণমূল জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করেছি। অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের এ শক্ত অবস্থানের পর পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন চিন্তার বিষয় হলো গত কিছুদিন বেশ কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান আদালত থেকে তাদের বরখাস্তের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে এসেছে। আদালতের আদেশের কপি এনে মন্ত্রণালয়ে আবেদন জমা দিচ্ছে। আইনি বাধ্যবাধকতায় আমরা তাদের স্বপদে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছি। এতে করে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া জনপ্রতিনিধিরা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। তবে সরকার এ বিষয়ে অধিকতর আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে।’