শ্রমিক নেতা শহীদুল্লাহ চৌধুরী ১৯৬৪ সালে লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর অর্ধশতকের বেশি সময় ধরে শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত আছেন। দেশের প্রতিটি গণ-আন্দোলনে শ্রমিক-জনতার নেতা হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। শ্রমিক আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক দলের নেতৃস্থানীয় পর্যায়েও আসীন হয়েছেন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি। এখন তিনি বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালনার সিদ্ধান্তের বিষয়ে মুখোমুখি হয়েছিলেন দেশ রূপান্তরের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের অনিন্দ্য আরিফ
দেশ রূপান্তর : জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পাটের চাহিদা বাড়ছে। এমনকি সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানি ১৭ শতাংশ কমলেও এই মন্দা অবস্থার মধ্যেও পাট রপ্তানি বেড়েছে। কিন্তু সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধ করে বেসরকারি খাতে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তটিকে কীভাবে দেখছেন?
শহীদুল্লাহ চৌধুরী : পৃথিবীতে বর্তমান সময়ে ৩০ লাখ টন পাট উৎপাদিত হয়। এর অধিকাংশই উৎপাদিত হয় বাংলাদেশ এবং ভারতে। এছাড়া চীন এবং থাইল্যান্ডে সামান্য কিছু পাট উৎপাদিত হয়। ভারতে উৎপাদিত হয় ১৬ লাখ টন পাট। আর দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদা ছিল ১৩ লাখ টন। এখন তাদের উৎপাদন কমে হয়েছে ১০ লাখ টন। অর্থাৎ তাদের প্রায় ৪ লাখ টন ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। তাই এখন বাংলাদেশের সম্ভাবনা ছিল। আমাদের কিছু আমলার কারণে সেটা বাস্তব পরিণতি লাভ করতে পারেনি। ভারত ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের পাটপণ্যের ওপর টনপ্রতি ৩৫২ ডলারসহ বিভিন্ন হারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপ করে। ফলে পাট ও পাটজাত পণ্যের উল্লেখযোগ্য রপ্তানি হ্রাস পেয়েছিল। কিন্তু এ মুহূর্তে ভারতের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের পাটকে কেন্দ্র করে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। কেননা এখন বাংলাদেশের সঙ্গে এ খাতে প্রতিযোগিতা করার মতো কেউ ছিল না। পাটের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বাজার বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে ৫০ হাজার টনের চাহিদা ছিল, আর এখন তা বেড়ে দেড় লাখ টন হয়েছে। সরকার যদি উদ্যোগ নেয়, তাহলে এটাকে আড়াই লাখ টন করা সম্ভব। তাই এজন্য পাটকলগুলোকে আধুনিকায়ন করার বিকল্প নেই। কিন্তু এগুলোকে বেসরকারি খাতে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী। প্রকৃত অর্থে, সরকার এটা করেছে ব্যক্তিমালিকদের চাপে। এক্ষেত্রে আমার কাছে মনে হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের একটি শক্তিশালী লবি সরকারের মধ্যে কাজ করছে। তারা পরামর্শ দিয়েছেন যে, এই করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফকে সন্তুষ্ট করা উচিত। ১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে বিশ্বব্যাংক পাটকলের কাঠামো ব্যক্তিমালিকানায় দিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। সেটা স্থগিত থাকলেও তা একেবারে বিলোপ হয়নি। মাঝে মাঝেই তাদের এহেন কর্মতৎপরতা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ১৯৯৩ সালে যখন ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তখন শ্রমিকরা জীবন দিয়ে তা প্রতিরোধ করে। এরপর ২০০৬ সালে এক-এগারোর সেনাসমর্থিত সরকারের সময় পাঁচটি কল বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন খুলনার পাটকল শ্রমিকরা রুখে দাঁড়ায়। সেজন্য তারাও বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেনি। বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে ওই পাঁচটি পাটকল চালু করে। কিন্তু তা বিজেএমসিকে কার্যকর না করে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক দিয়ে চালু করা হয়েছিল। এখন সরকারের মধ্যে যে বিশ্বব্যাংকের লবি রয়েছে তারা হয়তো বোঝাচ্ছে যে, এবারের বিশাল বাজেটের অর্থের জোগান পেতে হলে বিশ্বব্যাংককে সন্তুষ্ট করা প্রয়োজন। তাহলে তাদের ঋণ পাওয়া যেতে পারে।
আরেকটি বিষয়ও আছে। এ পাটকলগুলো অনেক জমি অধিকৃত করে রেখেছেপ্রায় ৩ হাজার ৩শ একর। যেমন ঢাকার ডেমরাতে লতিফ বাওয়ানী জুট মিল এবং করিম জুট মিলস রয়েছে। এখানকার এক কাঠা জমির দামই ৩০ লাখ টাকা। তাহলে এ মিল দুটির দেড়শ একর জমির দাম কত হতে পারে? নিশ্চয়ই অনেক। এখন এখানে নামকাওয়াস্তে বেসরকারিভাবে পাটকল চলতে পারে, বাকি অধিকাংশ জমিই অপব্যবহারের শিকার হবে। অর্থাৎ, এটাকে ঘিরে লুটপাটের মচ্ছব চলবে। এখন শিল্পটিকে উন্নতি করার জন্য বন্ধ করা হয়নি, ধ্বংস করার জন্যই বন্ধ করা হয়েছে।
দেশ রূপান্তর : এর আগের পাটকল বেসরকারিকরণের দৃষ্টান্ত খুব একটা সুখকর নয়। আমরা জানি, পাটকল ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার নাম করে সস্তায় জমি ও যন্ত্রপাতি বিক্রি করা, বিশাল জমি দেখিয়ে ব্যাংকঋণ নিয়ে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে না পারার নজির স্থাপন করা হয়েছে। এ রকম তিনটি পাটকল যেমন এজ্যাক্স, সোনালি, মহসিন পাটকল বন্ধের কথা জানা আছে। এ রকম পরিস্থিতিতে সরকারের বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্তে শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে কতটুকু আস্থা পোষণ করেন?
শহীদুল্লাহ চৌধুরী : একদম না। কিন্তু শ্রমিকরা এখন রক্ত দিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত নয়। তারা দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক জীবনে ছিল না। অনেক দিন ধরে তারা মজুরি পায়নি। তীব্র আন্দোলন করে কিছুদিনের মজুরি আদায় করা গেছে, তবে বাকি রয়ে গেছে অনেক। আর মিল চালানোর মতো অর্থ দেওয়াই হয়নি। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন হয়তো মাঝে মাঝে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পাটের জন্য এবং যন্ত্রাংশের জন্য অর্থ দেওয়া হয়নি। এজন্য আটশত টনের উৎপাদন আড়াইশত টনে নেমে আসছে। লোকসানটা এভাবেই তৈরি হয়েছে। তারাই লোকসানের সৃষ্টি করে এখন বলছে চালানো যাচ্ছে না। একটা পাটকলে একজন শ্রমিক যদি ১৮ বছরে যোগদান করেন, তাহলে তিনি সর্বোচ্চ ৬০ বছর পর্যন্ত চাকরি করতে পারেন। অর্থাৎ ৪২ বছর পর্যন্ত তার কর্মপরিধি রয়েছে। এ সময়ে তিনি প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং অন্যান্য ব্যবস্থাদির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের একটা অর্থ অর্জন করে থাকবেন। যারা দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক আছেন, তারা হিসাব অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পেতে পারেন। আর যারা অল্প সময় ধরে কর্মরত ছিলেন, তারাও সর্বনিম্ন হিসাবে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পাবেন। এখন তারা দীর্ঘদিন ধরে মজুরি পাচ্ছেন না। অনশন আর আন্দোলনে নেমে তারা কিছু মজুরি আদায় করতে পেরেছেন, তারপরও মাসের পর মাস মজুরি ছাড়াই কাটাতে হয়েছে। এখন এই শ্রমিকরা যদি মিল বন্ধ হওয়ায় এককালীন কিছু টাকা পান, তাহলে তো কিছুদিন চলতে পারবেন। আর ব্যক্তিমালিকানায় কারখানা চলে গেলে সেখান থেকে যে কিছু পাওয়া যাবে না, সেটাও তারা জানেন। তাই এখন ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও, তাদের সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে জেনেও রাজপথে নামতে চাইবেন না। কিন্তু এই শ্রমিকেরই যখন ছয় মাস পর জীবনযাত্রায় সংকট দেখা দেবে, তখন আবার ফুঁসে উঠবেন।
দেশ রূপান্তর : সরকার বলছে, তারা বন্ধ হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপির মাধ্যমে চালাবে। কিন্তু অবকাঠামো খাত ছাড়া বাংলাদেশে আর কোনো পিপিপিরই ফলপ্রসূ হওয়ার তেমন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। পাটকলের ক্ষেত্রে পিপিপি ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে?
শহীদুল্লাহ চৌধুরী : অবকাঠামো খাতে যে পিপিপি হয়েছে, সেখানে তো শ্রমিকের বিষয় হ্যান্ডেল করতে হয়নি। কোনো ধরনের ঝামেলাও সেখানে পোহাতে হয়নি। আর শতভাগ অর্থই রিটার্ন পাওয়া গেছে। কিন্তু যেসব কারখানায় পিপিপি হয়েছে, সেগুলোর কোনোটাই ভালোভাবে চলার নজির নেই। এক্ষেত্রে সব জায়গাতেই ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হয়েছে। সুতরাং সরকার পাটকলের ক্ষেত্রে যে পিপিপির সম্ভাবনা দেখাচ্ছে, তা ফলপ্রসূ হবে না। কেননা, শ্রমিকরা তো বিদায় হবে। তারপর আমার আশঙ্কা, লুটপাট শুরু হবে। ১৯৯৭ সালে ১৪টি টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় দেওয়ার পর একই ধরনের উন্নতি ও আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরিণতিটা কী হলো? পাটকলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পুনরাবৃত্তি হবে। আমরা এখানে একটা বিকল্প প্রস্তাব রেখেছিলাম। কিন্তু আমাদের প্রস্তাবসংবলিত চিঠিটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ২০১৯ সালে চীনের একটি প্রতিনিধি দল এসেছিল। তারা প্রস্তাব রেখেছিল যে, পুরনো মেশিন উঠিয়ে দিয়ে তাদের মেশিন স্থাপনের। তারা দাবি করেছিল যে, নতুন মেশিনে এখনকার চেয়ে তিনগুণ বেশি উৎপাদন করা যাবে। আর খরচও অনেক কমানো যাবে। তারা বলেছিল উৎপাদিত পণ্যের ৬০ শতাংশ চীনে নেওয়া হবে আর বাকি ৪০ শতাংশ এখানে ব্যবহৃত হবে এবং রপ্তানি করা যাবে। তারা সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে চেয়েছিল। কিন্তু আমলারা এটা পছন্দ করেনি। কেননা, চীনারা যদি এখানে দায়িত্বে আসে, তাহলে তাদের বাড়তি রোজগার বন্ধ হবে এবং অব্যবস্থাপনার বিষয়টি উন্মোচিত হবে। আমরাও আগে এরকম চিন্তা করেছিলাম। আমরা চাইতাম যে, এখানে বাইরের কোনো কোম্পানি এলে শ্রমিকদের মজুরি মানসম্মত জায়গায় পৌঁছাতে পারবে। চীনাদের প্রস্তাবটা আমাদের কাছে খুবই গ্রহণযোগ্য ছিল। একটা তাঁত চালাতে ৫ জন শ্রমিক লাগে। তারা ৩০০ দিন কাজ করলে ১৫ টন পণ্য উৎপাদন করতে পারে। আমাদের এখানে প্রচলিত এই তাঁতে এর বেশি উৎপাদন করা যায় না। অথচ চীনের রিপিয়ার লুমে ৩৬ টন পণ্য উৎপাদন করা যায়। এই একটা মেশিনের দাম ১০ লাখ টাকা। আমরা বলেছিলাম ৬ হাজার তাঁত উঠিয়ে যদি ৩ হাজার তাঁত বসানো যায়, তাহলে এতে আগের চাইতে অন্তত তিনগুণ বেশি উৎপাদন করা যাবে। শ্রমিককে ২৫ হাজার টাকা দিলেও প্রচুর মুনাফা থেকে যাবে। এ রকম মেশিনের জাদুর পরশ না নিয়ে আমরা এখন পিপিপির অলীক রাস্তায় হাঁটছি।
দেশ রূপান্তর : রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিকের সঙ্গে একটা বড় পরিমাণ বদলি শ্রমিক কাজ করত। অথচ তাদের বিষয়টি বিবেচনাতেই আনা হয়নি। এক্ষেত্রে আপনারা কোনো প্রস্তাবনা দিয়েছেন কী?
শহীদুল্লাহ চৌধুরী : পাটকলগুলোতে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার বদলি শ্রমিক রয়েছেন। এটা আগে ২০ হাজারের মতো ছিল। কমে গিয়ে এই সংখ্যক রয়ে গিয়েছিল। এই বদলি শ্রমিক কেন লাগত? বিজেএমসির যে উৎপাদন, তাতে ৪৬ হাজার শ্রমিক প্রয়োজন। কিন্তু স্থায়ী শ্রমিক তো ছিল ২৫ হাজারের কাছাকাছি। অর্থাৎ প্রায় ২২ হাজারের মতো শ্রমিকের ঘাটতি ছিল। একজন স্থায়ী শ্রমিক বছরে ক্যাজুয়াল লিভ, আর্ন লিভ এবং ফেস্টিভ্যাল লিভ মিলিয়ে ৫০ দিনের সবেতনে ছুটি পেত। এখন ৩০০ কর্মদিনের ১৬ শতাংশ হলো এই ৫০ দিন। এই ১৬ শতাংশ দিনের কাজ চালাতে তো বদলি লাগবেই। এছাড়া শ্রমিকরা অনুপস্থিত থাকলেও তো বদলি লাগবে। কিন্তু এই বদলি শ্রমিকদের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তই হয়নি। তাদের কোনো বিবেচনাতেই আনা হয়নি। এখন এই ১৩ হাজার শ্রমিক কী করবে? তাদের সবারই তো বয়স হয়েছে। কেননা, দীর্ঘদিন ধরে পাটকলগুলোতে নিয়োগ না থাকায় যারা চাকরিতে যোগদানে সবচেয়ে কনিষ্ঠ, তাদেরও প্রায় ৪০ বছর বয়স হয়ে গেছে। এখন এই বয়সে তো তারা নতুন কাজ পাবে না। এরা তো চরম দুর্বিপাকের মধ্যে পড়েছে। আমরা ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র থেকে প্রস্তাব করেছি, এইসব বদলি শ্রমিককে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত মাসিক ৫ হাজার টাকা ভাতা প্রদান করা হোক।