আইপিও পর্যালোচনায় পরিদর্শন ও নিরীক্ষা জরুরি

দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরেই বিপর্যস্ত। বাজারের ইতিবাচক মোড় পরিবর্তনে শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি যত বেশি সম্ভব ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রথম ধাপ হলো কোম্পানির আইপিও বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাব যাচাই-বাছাই করা। স্টক এক্সচেঞ্জগুলোই এই যাচাইয়ের কাজ করে থাকে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে যথাযথভাবে আইপিও যাচাই না করে কিংবা আইপিও জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানহীন কোম্পানির পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি মানহীন বা মন্দ কোম্পানির তালিকাভুক্তি বন্ধ করতে জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ করার ইতিবাচক ঘোষণা দিয়েছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) নতুন চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম।  কিন্তু এখন ‘সন্দেহের ভিত্তিতে’ কোম্পানির প্রসপেক্টাসের ওপর পর্যবেক্ষণ জমা দেওয়া নিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে এসইসি যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তাতে  আইপিও যাচাইয়ে পরিদর্শন ও নিরীক্ষার গুরুত্বহানি ঘটছে কি না তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।  

বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘আইপিও পর্যালোচনা : স্টক এক্সচেঞ্জকে এসইসির হুমকি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিধিবিধানের বাইরে গিয়ে সন্দেহের ভিত্তিতে আইপিও প্রসপেক্টাসের ওপর পর্যবেক্ষণ জমা দিলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। সম্প্রতি ডিএসই কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর বুধবার এক চিঠিতে ডিএসইকে সতর্ক করেছে এসইসি, যা চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এসইসির নির্বাহী পরিচালক রুকসানা চৌধুরী স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে এখন থেকে আইপিও পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক ইস্যু) রুলস, ২০১৫ কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।  অন্যথায় এসইসি সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ও যথাযথ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এদিকে ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, আইপিও পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এসইসির কঠোর অবস্থানে অস্বস্তিতে পড়েছে ডিএসইর লিস্টিং বিভাগ। 

দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর অনুমোদন নিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া মানহীন বিভিন্ন কাগুজে কোম্পানি শেয়ারবাজারে বিশৃঙ্খলার একটি অন্যতম কারণ। এসব কোম্পানির কারণে বিপুলসংখ্যক সাধারণ ক্রেতা প্রতারিত হন। সবচেয়ে বড় জালিয়াতি করা হয় আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে। অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের মানহীন কোম্পানিগুলো এনবিআর, ব্যাংক আর শেয়ারবাজারের জন্য প্রয়োজনানুসারে আলাদা আলাদা তিনটি আর্থিক প্রতিবেদন বানিয়ে জমা দেয়। এমন জালিয়াতি রোধে এসইসির নতুন চেয়ারম্যান যে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তা হয়তো একটি ভালো সমাধান নিয়ে আসতে পারে। তিনি জানিয়েছেন, এখন সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল-এফআরসির কাছে কোম্পানির মূল আর্থিক প্রতিবেদন থাকবে।  এফআরসির ওয়েবসাইট থেকে সেই প্রতিবেদন অনুসরণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক, এসইসি ও এনবিআর। ফলে আগামী দিনে তিন ধরনের ব্যালান্সশিট বানিয়ে তিন জায়গায় দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে জালিয়াতি রোধে এসইসির এই পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।  

পাবলিক ইস্যু রুলস অনুযায়ী কোনো কোম্পানি সিকিউরিটিজ আইন, হিসাব মান কিংবা দেশের অন্য কোনো আইন লঙ্ঘন করতে পারে না। আইপিওতে এমন কোনো ক্ষেত্রে কোনো অসংগতি কিংবা লঙ্ঘন থাকলে স্টক এক্সচেঞ্জের পর্যবেক্ষণে তার উল্লেখ থাকতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোম্পানির বিক্রি থেকে আয় ও মুনাফার তথ্য অতিরঞ্জিত বলে সন্দেহ পোষণ করা হয়, যা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বাস্তব পরিদর্শন অথবা অধিকতর তদন্তের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু সিকিউরিটিজ আইনে স্টক এক্সচেঞ্জের সেই এখতিয়ার নেই। অথচ দেখা যাচ্ছে, কোম্পানিগুলো প্রসপেক্টাস জমা দেওয়ার পর একাধিকবার সেসব সংশোধন করা হয়। এই সুযোগ বন্ধ করতে পরিপূর্ণ তথ্যসংবলিত প্রসপেক্টাস একবারে জমা দেওয়ার বিধান চালু করতে হবে। একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিবেদনে সন্দেহ দেখা গেলে বাস্তব পরিদর্শন ও নিরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা উচিত। নইলে কেবলই কাগজ-কলমের নিরীক্ষায় জালিয়াতির সুযোগ রয়েই যাবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আইপিও নিয়ে বিতর্কের কারণে ২০১৯ সালে ডিএসইকে প্যানেল গঠনের অনুমোদন দেয় এসইসি। ডিএসই গঠিত বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সুপারিশগুলোও বিবেচনা করে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি কোনো কোম্পানির প্রসপেক্টাসে জালিয়াতি ধরা পড়লে ইস্যু ম্যানেজার, নিরীক্ষক ও কোম্পানির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে পাবলিক ইস্যু রুলস সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে ভাবতে পারে এসইসি। কিন্তু কোনোভাবেই আইপিও যাচাই-বাছাইয়ে পরিদর্শন ও আরও নিরীক্ষার সুযোগ রহিত করে স্টক এক্সচেঞ্জের হাত-পা বেঁধে দেওয়া উচিত হবে না।