সাহাবউদ্দিন হাসপাতালেও করোনা পরীক্ষায় জালিয়াতি!

করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসায় রিজেন্ট হাসপাতালের জালিয়াতির পর এবার রাজধানীর গুলশানের খ্যাতনামা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। গতকাল রবিবার প্রতিষ্ঠানটিতে র‌্যাবের অভিযানে মিলেছে করোনাভাইরাস পরীক্ষা ও চিকিৎসার নামে জালিয়াতির ভয়ংকর সব তথ্য। র‌্যাব বলছে, অনুমোদন না নিয়েই হাসপাতালটির কর্তৃপক্ষ করোনাভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। শুধু তাই নয়, পরীক্ষা ছাড়াই নেগেটিভ ও পজিটিভ সনদ প্রদান এবং করোনা নেগেটিভ ব্যক্তিকে পজিটিভ দেখিয়ে ভর্তি করার মতো গুরুতর তথ্যও পায় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া সেখানে অননুমোদিত অ্যান্টিবডি টেস্ট করারও প্রমাণ মিলেছে। রাতে অভিযান শেষে হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানায় র‌্যাব। এজন্য চিকিৎসাধীন সব রোগীকে সরিয়ে নিতে এক দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক আশিক বিল্লাহ গতকাল রাত ১২টায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্যক্রম সিলগালা করে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যেসব রোগী রয়েছেন, তাদের সরানোর জন্য এক দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।’

অভিযানে অংশ নেওয়া র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, গতকাল রবিবার বেলা ৩টা থেকে রাজধানীর গুলশান-২-এর সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযান শুরু করেন তারা। এ সময় করোনাভাইরাস পরীক্ষার নামে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় হাসপাতালটির সহকারী পরিচালক আবুল হাসনাতসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া সেখান থেকে করোনা পরীক্ষা নিয়ে জালিয়াতির বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক আশিক বিল্লাহ গতকাল রাত ৮টার দিকে মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনুমোদন না নিয়ে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করছিল হাসপাতালটি। এছাড়া কোনো পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট প্রদানের তথ্যও পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বেলা ৩টা থেকে অভিযান শুরু হয়। অভিযানে অননুমোদিত করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডি টেস্টের রিপোর্টও পাওয়া গেছে। অভিযান সম্পন্ন হওয়ার পর বিস্তারিত জানানো হবে।

অভিযানে অংশ নেওয়া র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অভিযান পরিচালনাকারী র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত মোট ৯টি অনিয়মের তথ্য পেয়েছে। এর মধ্যে করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডি টেস্টের রিপোর্ট তারা পেয়েছেন, যা বাংলাদেশে অনুমোদিত নয়। এছাড়া হাসপাতালটি থেকে অবৈধভাবে অ্যান্টিবডি পরীক্ষার র‌্যাপিড কিট, অন্য হাসপাতালে করা পরীক্ষায় নিজেদের প্যাডে দেওয়া রিপোর্ট, পুরনো সার্জিক্যাল সামগ্রী এবং অবৈধভাবে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়। অভিযানের সময় হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. আবুল হাসনাত ও হাসপাতালের ইনভেন্টরি অফিসার শাহরিজ কবির সাদিকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা পরীক্ষার অনুমোদন বাতিল করলেও তারা অবৈধভাবে করোনার অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করছিল। এ পরীক্ষার নামে রোগীদের কাছ থেকে ৩ থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছিল। অন্য হাসপাতালে পরীক্ষা করিয়ে নিজেদের প্যাডে চালানো, অবৈধভাবে সরঞ্জাম ব্যবহার এবং মাস্ক-গ্লাভস একাধিকবার ব্যবহারের আলামত পেয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

জানা যায়, গতকাল বেলা ৩টার দিকে র‌্যাবের দল গুলশান-২ নম্বরের ১১৩/এ নম্বর সড়কের সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযান শুরু করে। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে তল্লাশি ও যাচাই। অভিযানকালে করোনা পরীক্ষায় ও চিকিৎসায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম, উপকরণ, রিপোর্ট ও নথিপত্র যাচাই করে আদালত। অভিযানে অসহযোগিতা করায় বিকেল ৫টার দিকে ডা. আবুল হাসনাতকে হেফাজতে নেয় র‌্যাব। এর আগেই হাসপাতালের ইনভেন্টরি অফিসার শাহরিজ কবির সাদিকেও হেফাজতে নেয় র‌্যাব। তল্লাশি করে বেশকিছু কিট ও রিপোর্ট জব্দ করা হয়। একে একে পুরো হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটার এবং ফার্মেসিতেও ওষুধ যাচাই করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। সেখান থেকে ১১ বছর আগের সার্জিক্যাল সামগ্রী জব্দ করা হয় বলে জানান অভিযান সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া করোনা নেগেটিভ ব্যক্তিকে পজিটিভ দেখিয়ে ভর্তি করার তথ্যও পায় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

আদালত পরিচালনাকারী র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘হাসপাতালটি অনুমোদন ছাড়াই র‌্যাপিড কিট দিয়ে কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের অ্যান্টিবডি টেস্টের কাজ করছিল। এছাড়াও তারা অ্যান্টিবডি পরীক্ষার নামে রোগীদের কাছ থেকে ৩ থেকে ১০ হাজার টাকা করেও নেয় বলে অভিযোগ পেয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালটির বিরুদ্ধে আমরা একাধিক অভিযোগ পেয়েছি। এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের কভিড-১৯ পরীক্ষার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের কভিড-১৯ পরীক্ষার স্বয়ংক্রিয় মেশিন না থাকায় এ অনুমোদন বাতিল করা হয়। এরপরও তারা গোপনে কভিড-১৯ পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছিল। তারা বাইরের রোগীদেরও টেস্ট করেছে। এ টেস্টগুলো তারা ডিভাইসের মাধ্যমে করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ডিভাইস ব্যবহারের অনুমোদন নেই। আর যেসব রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে তার সবই ভুয়া। এছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিছু পরীক্ষা বাইরের অন্যান্য হাসপাতাল থেকে করে তা নিজেদের হাসপাতালের প্যাডে লিখে রোগীদের দিয়েছে। তারা কিছু প্রোডাক্ট যেমন মাস্ক, গ্লাভস এগুলো একাধিকবার ব্যবহার করছে। এগুলো মূলত ওয়ানটাইম ইউজেবল। কিন্তু তারা এগুলো বারবার ব্যবহার করছে।’

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, কভিড-১৯ (করোনাভাইরাস) রোগীদের চিকিৎসায় যুক্ত বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে অন্যতম ৫০০ শয্যার সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সম্প্রতি বেশকিছু অনিয়মের অভিযোগ ওঠে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে। রোগীরা বেশি টাকা আদায়েরও অভিযোগ তুলেছেন। বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল অভিযানে যায় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহাবউদ্দিনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৩ সালে। এ হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সেবায় ২৪/৭-সেন্ট্রাল হাই-ফ্লো অক্সিজেন ব্যবস্থাসহ ভেন্টিলেশন সুবিধার ১২ শয্যার আইসিইউ, ১০ শয্যার এনআইসিইউ এবং ৩০০ শয্যার বিশেষায়িত আইসোলেশন সেন্টারের কার্যক্রম চলছে বলে হাসপাতালটির ওয়েবসাইট ও ফেইসবুক পেজে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়। এছাড়া সার্জারি, গাইনি ও মেডিসিনসহ সব বিভাগের নিয়মিত কার্যক্রম চালু রয়েছে বলেও জানানো হয়।

র‌্যাবের অভিযান চলাকালেও হাসপাতালটির ফেইসবুক পেজে প্রচার চলছিল ‘প্রয়োজনে করোনাক্রান্ত রোগীর জন্য পূর্ণ ডায়ালাইসিস রিপোর্টও দিচ্ছি।’ তবে র‌্যাবের অভিযান শুরু হওয়ার পর পেজটিতে উল্লেখ করা হয়, ‘আপাতত করোনা টেস্ট করা হচ্ছে না।’ এসব বিষয়ে জানতে হাসপাতালের হটলাইন নম্বর হিসেবে দেওয়া মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করলে মানিক পরিচয়ে এক ব্যক্তি বলেন, ‘এখন কথা বলা সম্ভব হচ্ছে না, পরে ফোন দেন’ বলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।

করোনাভাইরাস শনাক্তের জন্য নমুনা পরীক্ষা নিয়ে জালিয়াতির প্রথম ঘটনা ধরা পড়ে গত ৪ জুন। এদিন সাভার থেকে দুই ব্যক্তি গ্রেপ্তার হওয়ার পর জানা যায়, তারা সাভারের ডেনিটেক্স নামে একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের করোনার জাল সনদ সরবরাহ করে। এরপর মুগদা জেনারেল হাসপাতালসহ দেশের একাধিক জায়গায় করোনা পরীক্ষা নিয়ে জালিয়াতির তথ্য প্রকাশ হতে থাকে। সর্বশেষ রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ ও জেকেজির আরিফ-সাবরিনার প্রতারণার ভয়ংকর তথ্য বের হয়ে আসতে থাকে। তাদের প্রতারণার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

গত ৬ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসায় প্রতারণার ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে। এর আগে পুলিশের অভিযানে ধরা পড়ে জেকেজি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। যারা করোনা পরীক্ষার নামে জালিয়াতি করে ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে আসছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।