রাজউকে প্রকল্পের প্ল্যান পাস করিয়ে দেওয়ার কথা বলে একটি ডেভেলপার কোম্পানির কাছ থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা মূল্যের একটি হ্যারিয়ার গাড়ি ও ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ। আর ওই গাড়িতে করেই চালাতেন নানা অপকর্ম। যেখানেই যেতেন তার বহরে থাকত চারটি দামি গাড়ি। তার সবকটি গাড়ির রেজিস্ট্রেশনই ভুয়া। সাহেদ সবকটি গাড়িই প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছেন বলে পুলিশ ও র্যাব তথ্য পেয়েছে। এদিকে সাহেদের তদবির না শোনায় পুলিশের দুই কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়ার ঘটনায় তোলপাড় চলছে। কার ইন্ধনে তাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। প্রায়ই পুলিশ কর্মকর্তাদের হুমকি দিতেন সাহেদ। ‘প্রভাবশালীদের’ দোহাই দিয়ে এসব অপকর্ম চালাতেন তিনি। রিমান্ডে থাকা সাহেদ এসব অপকর্মের কথা স্বীকারও করেছেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে প্রতারণা, দখল বাণিজ্য, বদলি ও প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডার আদায় করা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন সাহেদ। তাছাড়া দেশের বাইরে গিয়েও প্রতারণা করেছেন তিনি। তবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেই কাশি ও হাঁচি দিতে থাকেন। এ কারণে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে কিছুটা সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। তারপরও জিজ্ঞাসাবাদে সাহেদসহ অন্যরা অজানা তথ্য দিয়ে চলেছেন।
সাহেদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল গভীর রাতে উত্তরায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র, মদ, ফেনসিডিল ও পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। তাছাড়া তার প্রতারণার বিষয়ে র্যাবের খোলা হটলাইনে ১২০টি ফোনকল ও ২০টি ই-মেইলের মাধ্যমে অভিযোগ জমা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া, রিজেন্টের কর্মচারীদের বেতন না দেওয়া, সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগই বেশি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, রিজেন্ট হাসপাতাল ও প্রধান অফিসে অভিযানের পর থেকে গাড়িগুলো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার একটি গাড়ি কক্সবাজারে আটক হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তবে উদ্ধার করার কথা কেউ স্বীকার করছে না। র্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বহরের সঙ্গে থাকা গাড়িগুলোও প্রতারণা ও হুমকিধমকি দিয়ে আয়ত্তে নিয়েছেন। যেখানে যেতেন হুইসেল বাজিয়ে ভিআইপিভাবে চলাফেরা করতেন। অনেক সময় রাস্তায় যানজট থাকলে ট্রাফিক আইন অমান্য করে উল্টো পথে চলাফেরা করতেন সাহেদ। তার ব্যবহৃত গাড়ির সামনে বিভিন্ন সংস্থার লোগো লাগিয়ে নানা অপকর্ম চালানো হতো। মাজদা এসইউও, হ্যারিয়ার, নিশান প্যাট্রোল ও নিশান এক্সটেইল গাড়ি ছিল তার। পাঁচজন বডিগার্ড সার্বক্ষণিক থাকত। গার্ডরা নিশান প্যাট্রোলটি ব্যবহার করত। অভিযানের পর থেকে বডিগার্ডরা লাপাত্তা। তাছাড়া সাহেদের কয়েকটি অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। এগুলোরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। রিমান্ডে থাকা প্রতারক সাহেদ ও মাসুদ পারভেজকে এ বিষয়ে নানা কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারা বিভিন্নভাবে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। গার্ডদের নাম পাওয়া গেছে। তাদের ধরতে পুলিশ ও র্যাবের একাধিক টিম কাজ করছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, গ্রেপ্তারের পরপরই সাহেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি সব অপরাধ স্বীকার করেন। র্যাবের কাছে প্রচুর অভিযোগ আসছে। রিজেন্টের এমডি মাসুদ পারভেজের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আসছে। বিদেশ থেকেও আমাদের কাছে ফোনকল আসে। বিদেশের অনেকেই তার কাছে প্রতারিত হয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাহেদের প্রতারণা মামলার তদন্ত করতে পুলিশ সদর দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করি দুয়েক দিনের মধ্যে তদন্তের ভার তারা পাবেন। সাহেদ দামি দামি গাড়িতে চলতেন। তিনি বেশি ব্যবহার করতেন হ্যারিয়ার ও নিশান এক্সটেইল। এগুলোর দাম ৫০ লাখের কাছাকাছি। অন্য গাড়িগুলো ২০ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকার মতো। সবকটি গাড়িই প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছেন। রেজিস্ট্রেশনগুলো ভুয়া। বছরখানেক আগে টঙ্গীতে একটি ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে সাহেদের পরিচয় হয়। ওই কোম্পানির এমডির বাসা গুলশানে। কিন্তু প্ল্যান না থাকায় কয়েকটি প্রকল্পের কাজ করতে পারছিলেন না। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সাহেদ ওই এমডিকে জানান, রাজউক চেয়ারম্যান তার বন্ধু মানুষ। মন্ত্রী-মিনিস্টার তার কাছের। প্ল্যান পাস করা ওয়ান-টুয়ের ব্যাপার। তাকে টাকা ও গাড়ি দিলে এক মাসের মধ্যে প্ল্যান পাস করার ব্যবস্থা করবেন। কোম্পানির এমডি তার কথা বিশ্বাস করে ‘হ্যারিয়ার’ গাড়ি উপহার দেন। গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন না করিয়ে তিনি বিআরটির মাধ্যমে ভুয়া নাম্বার প্লেট লাগিয়ে নেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পরে প্ল্যানের কাগজপত্র নিয়ে নেন সাহেদ। কয়েক দফায় এমডির কাছ থেকে ২ কোটি টাকা নেন এই প্রতারক। কাজ দেরি হওয়ায় কোম্পানির এমডি রাজউকের সংশ্লিষ্ট শাখায় খোঁজ নেন। কিন্তু প্রতারক সাহেদ কোনো কাগজপত্রই জমা দেননি। তারপর ওই ব্যবসায়ী পুলিশ সদর দপ্তরে অভিযোগ করেন।
সাহেদের নির্যাতনের শিকার ব্যবসায়ী ড. রফিকুল ইসলাম জানান, ২০১৯ সালের জুন মাসে ৬ কোটি টাকার বালু সরবরাহের কাজ দেন সাহেদ। তখন পূর্বাচলে ও একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে বালু সরবরাহ করতেন তিনি। ৫০ লাখ পাওনা হওয়ার পর ১১ লাখ ৫৪ হাজার টাকার একটি চেক দিয়েছিলেন সাহেদ। কিন্তু ওই হিসাব নম্বরে টাকা না থাকায় চেকটি ডিজঅনার হয়। তিন-তিনবার ডিজঅনারের পর বালু দেওয়া বন্ধ করলে অস্ত্র নিয়ে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৪ নম্বর রোডের অফিসে গিয়ে ফিল্মি কায়দায় হুমকি দেন। হত্যার পর আমার লাশ গুম করার কথা বলেন। এ নিয়ে বিচার-সালিশ করলেও থানা-পুলিশমুখো হওয়ার সাহস হয়নি তার। তিনি বলেন, উল্টো সাহেদ টাকা পাবে বলে দাবি করেন। এখন এ প্রতারক ধরা পড়েছেন। আশা করি কর্র্তৃপক্ষ আমার টাকাগুলো উদ্ধারের ব্যবস্থা করবেন।
প্রত্যাহার হচ্ছে পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তি : ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার খোয়াজনগর এলাকায় ‘মেগা মোটরস’ নামক একটি কোম্পানির গুদামে অভিযান চালানোর কারণে সাহেদ পুলিশ সদর দপ্তরে তদবির করে সহকারী উপপরিদর্শক মো. আজমীর শরীফ এবং সাদেক মো. নাজমুল হককে শাস্তির ব্যবস্থা করেন। তাছাড়া উপপরিদর্শক আফতাব হোসেন ও রাজেশ বড়ুয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ এখন তদন্তাধীন। পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, অভিযানের দিন রাতে হাইপ্রোফাইল তদবির আসে পুলিশের কাছে। ৬ নভেম্বর সাহেদও চলে যান চট্টগ্রামে। সেখানে নগর পুলিশের তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনারের কক্ষে গিয়ে হুমকিধমকি দিতে থাকেন। সাহেদ তাদের বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাব, যাতে তোমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সিকিউরিটি সেল আমার হাতের মুঠোয়। তিনি আরও বলেন, পরবর্তীকালে অভিযানকারী দলের বিরুদ্ধে সিকিউরিটি সেলে অভিযোগ দেওয়া হয়। তদবির করে তাদের শাস্তি দেওয়া হয়। ঘটনাটি ফাঁস হওয়ার পর আমরা তদন্ত করছি। সাহেদ কাদের দিয়ে এই কাজ করেছে তা উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। তাছাড়া আজমীর শরীফ এবং সাদেক মো. নাজমুল হকের শাস্তি প্রত্যাহার করা হবে বলে আশা করছি।
সাহেদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল : সাহেদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করেছে সরকার। গতকাল রবিবার প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সুরথ কুমার সরকার গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, একটি পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে সাহেদ অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড নিয়েছিলেন। তার প্রতারণামূলক কাজের জন্য আমরা কার্ডটি বাতিল করেছি। এর আগে সাহেদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ডটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।