করোনা পরীক্ষার সনদ কারবারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া জেকেজির (জোবেদা খাতুন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা) চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী ও তার স্বামী প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আরিফুল হক চৌধুরীর জালিয়াতিসংক্রান্ত যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে গোয়েন্দারা। এসব তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে যথেষ্ট বলে মনে করছে মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (ডিবি)। আরিফ ও সাবরিনার কাছ থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে সে অনুযায়ী মামলা সাজানো হবে বলে দেশ রূপান্তরকে ডিবির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
গতকাল রবিবার ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারা কোন কোন প্রতিষ্ঠানে জালিয়াতি করেছে সে বিষয়ে আমাদের কাছে স্বীকার করেছে। তাছাড়া তাদের কম্পিউটারেও জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।’
এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আরিফ ও সাবরিনার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির প্রয়োজন নেই। তাদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হবে। আগামীকাল (আজ সোমবার) তাদের জেলহাজতে পাঠানোর আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠানো হবে।’
এদিকে ডিবির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, মামলার তদন্তে সম্পৃক্ততা আসায় আরিফের বোন জেবুন্নেসা রিমা এবং সাবরিনার এক ছেলে বন্ধু ও এক বান্ধবীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। জেকেজিকে কাজ পাইয়ে দেওয়া ও নথিপত্রে তাদের সম্পৃক্ততা মিলেছে। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য গতকাল রাতে রাজধানীর কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়েছে ডিবি। রিমার নামে জেকেজি হেলথ কেয়ারের ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে। গত ৬ জুন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে রিমার নামে জেকেজি হেলথ কেয়ারের ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। করোনা সনদ জালিয়াতির অভিযোগে আরিফ গ্রেপ্তার হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এই লাইসেন্স ইস্যু করা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। রিমার স্বামী সাঈদ চৌধুরীকে আগেই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকেও আরিফের সঙ্গে রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং একসঙ্গে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তদন্তের স্বার্থে সাবরিনার ছেলে বন্ধু ও বান্ধবীর নাম প্রকাশ করেননি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউকশন বিভাগের উপকমিশনার জাফর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, রবিবার বিকেলে আরিফ ও তার ভগ্নিপতি সাঈদ চৌধুরীকে আদালতে হাজির করা হয়। পুনরায় রিমান্ড আবেদন না থাকায় তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত। আরিফ ও সাঈদের জেলহাজতে পাঠানোর আবেদনের বিরোধিতা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। তাদের আবেদন খারিজ করে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী ওরফে সাবরিনা শারমিন হুসাইনকে দ্বিতীয় দফায় দুই দিনের রিমান্ড শেষে আজ আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। গতকাল রবিবার ছিল তার দ্বিতীয় দফায় দুই দিনের রিমান্ডের শেষ দিন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে কারাগারে পাঠানোর আবেদন জানিয়ে আজ তাকে আদালতে হাজির করা হবে বলে ডিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তদন্ত তদারকিতে জড়িত ডিবির একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডা. সাবরিনা ও তার স্বামী আরিফ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হননি। তারা জবানবন্দি না দিলেও মামলার তদন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তদন্তে যেসব প্রমাণ পাওয়া গেছে তা আসামির দোষ প্রমাণে যথেষ্ট। তাছাড়া পরবর্তীকালে যদি আমাদের তদন্তে মনে হয় মামলার কোথাও ঘাটতি আছে, আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন তাহলে আমরা পুনরায় রিমান্ড চাইতে পারি।’
অন্য আসামিদের রিমান্ডে নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘না সেটার প্রয়োজন নেই। আরিফ ও সাবরিনার স্বীকারোক্তি ও অন্যান্য উৎস থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে সেটাই মামলার চার্জশিটের জন্য যথেষ্ট।’
ডিবির কর্মকর্তারা জানান, করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য সরকারি থোক বরাদ্দের অর্থ হাতিয়ে নিতে অনুমোদনের চেয়ে অধিকসংখ্যক নমুনা সংগ্রহ করে জেকেজি। তারা করোনাকালে সরকারি থোক বরাদ্দ থেকে অর্থ পাওয়ার চেষ্টা করছিল। সেজন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের চার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দেওয়ার লোভ দেখানো হয়। তারা করোনার নমুনা নিয়ে সেটি ডাস্টবিনে ফেলে দিত। বিনে পয়সায় নমুনা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তারা বাংলাদেশিদের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ও বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে ১০০ ডলার করে নিতে শুরু করে। এভাবে ১৫ হাজার ৪৬০টি ভুয়া নমুনা দিয়ে তারা হাতিয়ে নিয়েছে ৬০ কোটি টাকা। জেকেজি নমুনা পরীক্ষা না করেই যাদের ৫টির কম উপসর্গ ছিল তাদের নেগেটিভ এবং যাদের ৫ বা তারও বেশি উপসর্গ ছিল তাদের পজিটিভ সনদ দেওয়া শুরু করে। ডিবির জেরার মুখে এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন আরিফ ও সাবরিনা এবং আরিফের ভগ্নিপতি সাঈদ। রিমান্ডে ডিবি তাদের মুখোমুখি ও আলাদা জিজ্ঞাসাবাদ করে।
করোনা পরীক্ষার সনদ জালিয়াতির অভিযোগে গত ২৩ জুন জেকেজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আরিফুল হক চৌধুরীসহ প্রতিষ্ঠানটির ছয় কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ। জেকেজির বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর ২৪ জুন করোনার নমুনা সংগ্রহের জন্য জেকেজির অনুমতি বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পুলিশি তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে করোনা সনদ জালিয়াতিতে ডা. সাবরিনার নাম আসে। তিনি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন ও কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার। গত ১২ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ এবং ওই দিনই জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতাল থেকে ডা. সাবরিনাকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাকে ১৩ জুলাই তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। জেকেজির সিইও আরিফুল হক চৌধুরীকে গত বুধবার দ্বিতীয় দফায় চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। আর সাবরিনাকে দ্বিতীয় দফায় দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় গত শুক্রবার। ডিবি কার্যালয়ে দুজনকেই জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আরিফকে গতকাল জেলহাজতে পাঠানো হয়।