সারা দিন থেমে থেমে বৃষ্টি, ভাসল রাজধানী

ভারী বর্ষণের ফলে রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলির রাস্তাগুলোও পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাও কোমরপানি জমে থাকে দিনভর। বাসা থেকে অফিসের উদ্দেশে বের হওয়া মানুষ পড়েন ভয়াবহ ভোগান্তিতে। কিছু কিছু এলাকায় রাস্তার পানি উপচে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে উঠে পড়ে। আবার ছোট যানবাহনে পানি প্রবেশ করে বিকল হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। তাৎক্ষণিক যানবাহন সরাতে না পেরে দীর্ঘ জটলা তৈরি হয়। জলজট আর যানজটে নাকাল হওয়া নগরবাসীর কেউ কেউ এ দুর্ভোগের চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেন। জলাবদ্ধতার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে দায়ী করে নিজেদের ক্ষোভের কথা বলেন।

সরেজমিন দেখা যায়, টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বেশকিছু এলাকায় পানিতে তলিয়ে যায়। সড়ক ও অলিগলির রাস্তার পানির নিচে থাকায় হেঁটে চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না। কোথাও কোথাও যানবাহন চলাচলের সময় সড়কের পানির ঢেউ লেগে ফুটপাতে থাকা পথচারীকেও ভিজে যেতে দেখা গেছে। ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলে পড়ে ছোট যানবাহনগুলো দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। গণপরিবহনের যাত্রীদের বাসে উঠতে ও নামতে গিয়ে জামাকাপড় ভিজেছে। ঢাকার রাস্তাকে কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে নদী ও সাগরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মরত শাহেদ শফিক তার নিজের ফেইসবুকে রাজারবাগ এলাকার জলাবদ্ধতার ছবি দিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের (রাজারবাগ) ছোট নদী।’ বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইফুল ইসলাম তার ফেইসবুকে লিখেছেন, ‘আজিমপুর কলোনিতে পানি এমনভাবে জমে আছে যে দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক পুকুরের ওপর বসে আছি।’ ফার্মগেট এলাকায় একটি মহিলা হোস্টেলে থাকা সালমা আফরোজ তার ফেইসবুকে ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘বন্যায় যে বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চল তলিয়ে গেছে তা কিন্তু না। রাজধানীতে আমাদের হোস্টেলও দখল নিয়েছে বন্যার পানি।’

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের ডাক্তার অধ্যাপক মো. দেলোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুপুরে শ্যামলী হাসপাতাল থেকে বের হয়ে গ্রিনরোডের চেম্বারে যেতে অন্যদিনের তুলনায় সময় অনেক বেশি লেগেছে। পান্থপথ মোড়ে গিয়ে দেখি পুরো গ্রিনরোডে পানি আর পানি। প্রাইভেট কার নিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। পরে কার ছেড়ে দিয়ে রিকশায় উঠি। কিন্তু রিকশায় ওঠা আর নামতে গিয়ে প্যান্ট আর জুতা ভিজেছে।’

কারওয়ানবাজারে নিজের অফিসে যাওয়ার জন্য মিরপুরের বাসা থেকে বের হন সাইফুর রহমান হিমেল। তিনি বলেন, ‘মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়ে শেওড়াপাড়া আসার পর পানি ঢুকে বন্ধ হয়ে যায়। কিছুদূর ঠেলে নিয়ে আসার পর এক গ্যারেজের মিস্ত্রির মাধ্যমে ইঞ্জিন চালু করে রওনা দিই। কারওয়ানবাজার ইটিভি ভবন পার হয়ে একটু সামনে যেতেই মোটরবাইকটি বেশিরভাগ পানিতে ডুবে যায়। এরপর আবারও ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও আর চালু করতে পারিনি।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসা জলাবদ্ধতা দূর করতে কাজ করে। কিন্তু সামান্য বৃষ্টি হলেই ওয়াসা ভবনের সামনে হাঁটুপানি জমে থাকে। এ সংস্থাটি মূলত কী কাজ করে তা খতিয়ে দেখা উচিত।’

গতকালের বৃষ্টিতে রাজধানীর নিউ মার্কেট, রাজারবাগ, মতিঝিল, গ্রিনরোড, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচক্কর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, কলাবাগান ও আসাদগেট, শান্তিনগর, মৌচাক ও কাকরাইল, হাজারীবাগ, কারওয়ানবাজার, পান্থপথ, ধানম-ি-১৫, মোহাম্মদপুর, আরামবাগ, খিলগাঁও, পুরান ঢাকার শহীদনগর, নাজিমউদ্দিন রোড, জুরাইন, ইব্রাহীমপুর এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এসব এলাকার বেশিরভাগ সড়কে সারাদিনই পানি জমে থাকে। সড়কের পানি উপচে গিয়ে বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উঠেছে।

নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. আমিনুল ইসলাম শাহীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের মার্কেটের ভেতরে ড্রেনগুলো ভরে পানি উপচে গিয়ে নিচতলার দোকানগুলোতে ঢুকেছে। তবে ধানম-ি হকার্স মার্কেটের দোকানগুলো রাস্তা থেকে নিচু হওয়ায় সেখানে প্রায় সব দোকানে পানি জমেছে।’

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঢাকায় গতকাল সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টিপাতের এ পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বলেও জানায় আবহাওয়া অধিদপ্তর।