অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেপ্তার হওয়া লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য কাজী শহীদ ইসলাম পাপুলের স্ত্রী সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ সেলিনা ইসলাম ও তার বোন জেসমিন প্রধানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল বুধবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সাংসদ পাপুলের দুর্নীতি তদন্তের অংশ হিসেবে সেলিনা ও জেসমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে দুদকের পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
দুদকের অনুসন্ধান দলের একজন কর্মকর্তা জানান, সেলিনা ও জেসমিনের কাছে তাদের আয়কর নথির নানা অসঙ্গতি ও ব্যাংক হিসাবসহ বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। তারা প্রশ্নগুলোর তাৎক্ষণিক জবাব দিতে পারেননি। অনুসন্ধানের স্বার্থে কী কী নথি দরকার তার একটি তালিকা দেওয়ার জন্য বলেছেন পাপুলের স্ত্রী ও শ্যালিকা। তারা ওই তালিকা অনুযায়ী যাবতীয় নথিপত্র সরবরাহ করবেন।
জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পাপুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম দুদক কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে বলেন, দেশে-বিদেশে পাপুলের বিরুদ্ধে যা হচ্ছে সবই ষড়যন্ত্র। বিদেশের আদালতে এখনো বিচার শুরু না হলেও তার স্বামীর বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। একজন সাংসদের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এছাড়া আইনের মাধ্যমে তার স্বামী মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসবেন বলেও আশাপ্রকাশ করেন সেলিনা।
সাংসদ পাপুলকে গত ৬ জুন মানব ও অর্থ পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে কুয়েতের সিআইডি। ঘুষ দেওয়া, মানব ও অবৈধ মুদ্রা পাচার এবং রেসিডেন্ট পারমিট বিক্রির অভিযোগে তাকে ২১ দিন কারাগারে রাখার নির্দেশ দেয় কুয়েতের আদালত। পরে তার আটকাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়। পাপুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে কুয়েতের মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির অ্যাকাউন্টে পাঁচ মিলিয়ন কুয়েতি দিনার থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। যা বাংলাদেশি টাকায় ১৩৭ কোটি ৮৮ লাখ ৮৩ টাকা।
বাংলাদেশে পাপুলের বিরুদ্ধে পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে ব্যাংকঋণ নেওয়া, সম্পদ ভোগ এবং নিজের ও স্ত্রীর নামে শেয়ার কিনে ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত ১২ জুলাই পাপুলের স্ত্রী ও শ্যালিকাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিস দেয় দুদক। দুদকের উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দীন স্বাক্ষরিত ওই তলবি নোটিসে তাদের ২২ জুলাই দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়।
দুদক গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পাপুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ পাচার ও শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর দুদকের পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল আউয়ালকে অনুসন্ধান তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে দুদকের উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দীনকে কমিশন অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়। অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় গত ১৭ জুন দুদক পাপুলের স্ত্রী, মেয়ে ও শ্যালিকার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করে পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) চিঠি দেয়। এরপর গত ২২ জুন পাপুল, তার স্ত্রী সেলিনা, মেয়ে ওয়াফা ইসলাম ও শ্যালিকা জেসমিনের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক দেশি-বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা সব ব্যাংক হিসাব স্থগিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দেয় দুদক। এছাড়া তাদের আয়কর নথি তলব করে কমিশন।
পাপুল কুয়েতে আটক হওয়ার পর গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু টাকার জোরে সস্ত্রীক সাংসদ হয়েছেন তিনি। ঘাটে ঘাটে টাকা দিয়ে প্রথমে নিজে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাংসদ হন। পরে স্ত্রী সেলিনা ইসলামকেও একইভাবে সংরক্ষিত আসনের সাংসদ বানান। আর এই টাকার উৎস ভিসা বাণিজ্য ও মানব পাচার।