করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসায় রিজেন্ট হাসপাতালের জালিয়াতির ঘটনায় এবার ফাঁসছেন স্ব্যস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অন্তত ডজনখানেক কর্মকর্তা। ওইসব কর্মকর্তার সঙ্গে বহুমাত্রিক জালিয়াতিতে আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ও মিরপুর ও উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার অনুমোদন দিতে তারা সুপারিশও করেছিলেন। আর এ সুপারিশের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন হয়েছিল কি না তাও খতিয়ে দেখছে সংস্থাগুলো। এরই অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার বিকেলে ডিবির একটি টিম মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যায়। দলটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সদ্য পদত্যাগ করা মহাপরিচালক (ডিজি) আবুল কালাম আজাদ, অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা আক্তার ও পরিচালক (হাসপাতাল) আমিনুল হাসানকে আধঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ডিবির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সাহেদের সহযোগিতাকারীদের একটি তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে ওই তালিকার কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে র্যাবের হেফাজতে নিয়ে সাহেদসহ তার অন্য সহযোগীদের রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোন কোন কর্মকর্তার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল তা সাহেদ তদন্তকারীদের জানিয়েছেন বলে তদন্তকারী সংস্থার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, সদ্য অব্যাহতি নেওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ ও পরিচালক (হাসপাতাল) আমিনুল হাসানের সঙ্গে গভীর সখ্য ছিল সাহেদের। তার হাসপাতালে করোনার চিকিৎসার প্রতিবাদে এলাকাবাসী বিক্ষোভ করলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি টিম দিয়ে মিথ্যা প্রতিবেদন দিতেও বাধ্য করেছিলেন সাহেদ। আসলে ওই হাসপাতালে কোনো সুযোগ-সুবিধাই ছিল না।
সাহেদের মামলার দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার নির্দেশ : ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাহেদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দিতে বলেছে পুলিশ সদর দপ্তর। তাছাড়া যে কটি মামলা আদালতে বিচারাধীন সেগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির কাজ চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাহেদ আন্তর্জাতিক প্রতারক। এমন কোনো কাজ নেই সে করেনি। তার বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো দ্রুত তদন্ত করে অভিযোগপত্র দিতে বলা হয়েছে। তার সবকটি মামলাই আমরা খতিয়ে দেখব। তাকে যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এত মামলা থাকার পরও সাহেদ কীভাবে অপকর্ম চালিয়ে আসছিল তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সাহেদের সহযোগীদের ধরতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কাজ করছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, দখল, প্রতারণা এবং নারী ও টাকার বিনিময়ে প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করা সম্পর্কে সাহেদ গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করছেন। জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া তথ্যের মধ্যেও কোনো প্রতারণা রয়েছে কি না তা পুনঃযাচাই করতে দুই সহযোগী মাসুদ পারভেজ ও তারেক শিবলীর মুখোমুখিও করা হচ্ছে। এছাড়া আলাদাভাবে ওই দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদে সাহেদ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটন হচ্ছে। সাহেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এমন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত চার-পাঁচ বছর ধরে নিজেকে কথিত বুদ্ধিজীবী বা রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে পরিচয় দিতেন তিনি। সেন্টার ফর পলিটিক্যাল রিসার্চ বা রাজনীতি গবেষণা কেন্দ্র নামে একটি প্রতিষ্ঠানও চালাতেন তিনি। এজন্য টাকা খরচ করে বিভিন্ন টক শোতে অংশ নিতেন। টক শোতে বিরোধী রাজনীতিকদের বিষয়ে বেশি বেশি সমালোচনা করতেন সরকারের উচ্চপর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সুবিধা আদায়ের জন্য একটি নামসর্বস্ব পত্রিকাও খুলেছেন তিনি। নিজেকে সেই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে পরিচয় দিতেন তিনি। এসবই ছিল তার বিভিন্ন অপকর্ম থেকে নিজেকে বাঁচানোর ঢাল। গত বছর ডেঙ্গু মহামারীর সময় রিজেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ কামিয়েছেন। এমনকি ওই সময় সরকারের কাছ থেকেও টাকা নিয়েছেন। আর সেই সুযোগে করোনা মহামারীতে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ওপরের মহলে তদবির করতে থাকেন। তার সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভালো সম্পর্ক থাকার কথাও সাহেদ স্বীকার করেছেন। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, অন্তত ডজনখানেক কর্মকর্তার নাম পাওয়া গেছে। আমরা তাদের নজরদারি করেছি। তাদের প্রোফাইল সংগ্রহ করা হচ্ছে। তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
র্যাবের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিজেন্টে হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার অনুমতি দিতে সাহেদ কী পরিমাণ অর্থ লেনদেন করেছেন তা উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। গ্রেপ্তারের পর তাকে আমরা কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ পেয়েছি। ওই সময় অর্থ লেনদেনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেও তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। বর্তমানে আমাদের হেফাজতে রয়েছেন সাহেদসহ তার সহযোগীরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বড়বড় কর্মকর্তার সঙ্গে তার ওঠাবসা ছিল। বিশেষ করে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও পরিচালকের (হাসপাতাল) সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল বলে সাহেদ আমাদের জানিয়েছেন। তার তথ্যগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, করোনার চিকিৎসার প্রতিবাদে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের এলাকাবাসী প্রতিবাদ করেছিল। ওই সময় স্থানীয় কাউন্সিলর ও ১১ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদককে কার নির্দেশে র্যাব-১-এর কার্যালয়ে অনেক সময় ধরে আটকে রাখা হয়েছিল তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
মামলাগুলো দ্রুত তদন্ত করে চার্জশিট দেওয়ার নির্দেশ : ঢাকাসহ সারা দেশে সাহেদের বিরুদ্ধে প্রতারণাসহ নানা ধরনের মামলা হয়েছে। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৬৩ মামলার হদিস পেয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২৯ মামলা হয়েছিল। বাকি মামলাগুলো হয় এই কয়েক বছরে। তার মধ্যে একটি মামলার সাজাও হয়েছিল সাহেদের। তথ্য অনুযায়ী, পুরনো মামলাগুলোর মধ্যে চারটি মামলায় খালাস পেয়েছেন সাহেদ। পাঁচটি মামলার বিচার স্থগিত হয়ে আছে। দুটির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় তাকে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয় দুটি। বাকি মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। ১০ বছর আগে একটি প্রতারণা মামলায় ছয় মাসের কারাদ- দিয়েছিল আদালত। পাশাপাশি ৫৩ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়। ২০০৯ সালের জুলাই মাসে দুটি প্রতারণা মামলা থেকে আদালত তাকে অব্যাহতি দিয়েছিল। আবার কয়েকটি মামলায় জামিনে ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতারক সাহেদের বিরুদ্ধে হওয়া সবকটি মামলা দ্রুত তদন্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত করার সময় পুলিশের কোনো কর্মকর্তা গাফিলতি করার প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সাহেদের যেসব সহযোগী পালিয়ে ছিল তাদের ধরতে পুলিশ ও র্যাবের একাধিক টিম কাজ করছে। আশা করি অল্প সময়ে তারাও পাকড়াও হবে।
রিজেন্ট হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসেন চিকিৎসক : রিজেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসক নেওয়া হবে ফেইসবুকে মো. সাহেদের এমন পোস্ট দেখে যোগাযোগ করেন এক নারী চিকিৎসক। এ হাসপাতালের মিরপুর শাখায় চাকরি হলেও মাস দেড়েক পর তিনি পালিয়ে আসেন। ঘুমানো ছাড়া দিনের বাকি সময় পুরোটাই তাকে কাজ করতে হতো। ওই হাসপাতালে তখন তিনিই ছিলেন একমাত্র চিকিৎসক। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীও সেখানে ছিল না। কিন্তু জোড়াতালির এ হাসপাতালটিতেই ভরসা খুঁজে পায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। রিজেন্ট ও অধিদপ্তরের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল, তাতে হাসপাতালটিকে একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই চিকিৎসক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, তার চাকরি হওয়ার এক মাস পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সেখানে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর তিনি এক ভোরবেলায় পালিয়ে আসেন। কিন্তু ১০ দিন পর গাড়ি পাঠিয়ে তাকে আবারও নিয়ে যাওয়া হয়। এবার তাকে উত্তরা শাখায় নিয়োগ দেওয়া হয়। দৈনিক আট কর্মঘণ্টা হিসাবে মাসিক বেতন ৫০ হাজার টাকা ঠিক হলেও দেড় মাস পর তাকে দেওয়া হয় ৩০ হাজার টাকা। একপর্যায়ে তিনি উত্তরা থেকেও পালিয়ে আসেন। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরাও সেখানে থাকতে পারেননি।
সাহেদ নিয়মিত মাদক সেবন করতেন : গতকাল ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন জানান, সাহেদকে নিয়ে অভিযানে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের ঘটনায় করা মামলাটি তদন্ত করবে ডিবি। পাঁচ দিন সাহেদসহ অন্যরা আমাদের কাছে রিমান্ডে ছিল, অনেক তথ্য পেয়েছি। তাকে নিয়ে অভিযানে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র কোনো কাজে ব্যবহৃত হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অস্ত্রটি কোথাও ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়নি। আমরা তদন্ত করছি। মাঝেমধ্যে অপরাধীরা বৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি অপরাধ আড়াল করতে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। ইতিমধ্যে দুজন সাক্ষী আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। আশা করি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে অস্ত্র মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন থানায় সাহেদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা রয়েছে। সেগুলো সংশ্লিষ্ট থানা তদন্ত করবে। ডিএমপিতে এ পর্যন্ত ২০টির মতো মামলা রয়েছে, এগুলোর মধ্যে কিছু আমরা (ডিবি) আর কিছু সংশ্লিষ্ট থানা তদন্ত করবে। কী পরিমাণ করোনার নমুনা পরীক্ষায় সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতাল প্রতারণা করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্তে জানতে পেরেছি, রিজেন্ট হাসপাতাল থেকে ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার করোনার রিপোর্ট প্রদান করা হয়েছিল। সাড়ে ৫ হাজার রিপোর্টই যে গরমিল ছিল সেটা বলা যাবে না। যে সার্টিফিকেটের মধ্যে একজন ব্যক্তি করোনা পজিটিভ না হয়েও পজিটিভ দেওয়া হয়েছে কিংবা পরীক্ষায় নেগেটিভ এসেছে কিন্তু অনুমান করে বলা হয়েছে পজিটিভ, সেসব প্রতারণা প্রমাণের জন্য তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। মাদক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার কাছ থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। হয়তো তিনি মাদক সেবন করতেন। তবে মাদক কারবারি ছিলেন কি না সে বিষয়ে আমরা কোনো তথ্য পাইনি।