মহামারীর দুর্যোগে অবারিত দুর্নীতির দায় কার

করোনা মহামারীর দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি চুরি আর দুর্নীতির অনেকগুলো রাস্তা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। কিছু ব্যক্তি ও তাদের সিন্ডিকেটসমূহ মহামারীর এই দুর্যোগকে বিরাট সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং রাতারাতি প্রতারণা, চুরি, দুর্নীতি ও অনিয়মের মধ্য দিয়ে বেশুমার অর্থবিত্ত গড়ে তুলছে। অতীতেও নানা মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ব্যবহার করে একশ্রেণির মানুষ জালিয়াতি, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও অর্থসম্পদ আত্মসাতের মধ্য দিয়ে দ্রুত বিত্তবৈভব গড়ে তুলেছে। মহামারীর দুর্যোগ ধনে-প্রাণে লাখ লাখ, কখনো কোটি কোটি মানুষকে নিঃস্ব-রিক্ত অবস্থায় মৃত্যুমুখে ঠেলে দিলেও, অনেক গ্রাম, জনপদ, মানববসতি উজাড় করে ফেললেও এর মধ্য দিয়ে আবার আমাদের এই অঞ্চলসহ পৃথিবীর দেশে দেশে মুনাফাখোর নতুন এক শ্রেণিও গড়ে তুলেছে। মহামারী বা দুর্যোগোত্তর সময়ে শ্রেণিবিভাজন নতুন চেহারা ও বৈশিষ্ট্য নিয়েছে। এসব তৎপরতা শাসকগোষ্ঠীর নজরের বাইরে ছিল না; বরং অনেক ক্ষেত্রে শাসককুলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদেই এসব অপতৎপরতা সংঘটিত হয়েছে। আমাদের এখানকার অভিজ্ঞতাও এ রকমই।

এখন এসব অপকর্ম-অপতৎপরতা আরও খোলামেলা, আরও প্রকাশ্য। একবার ক্ষমতার বলয়ে ঢুকে পড়তে পারলে এখানে যা খুশি তাই করা যায়। পুরো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গিলে খেয়ে ফেললেও পার পেয়ে যাওয়া যায়। সবকিছু হজম করে নেওয়া যায়। রাষ্ট্রক্ষমতা এখন শাসকগোষ্ঠী ও তাদের ছত্রছায়ায় থাকা একশ্রেণির মানুষের জন্য দ্রুত অর্থবিত্ত গড়ে তোলার প্রধান বাহনে পরিণত হয়েছে। নিজেদের সুবিধা ও সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রের মধ্যে তারা আবার নানা ছোট ছোট রাষ্ট্র গড়ে তোলে। কখনো কখনো এখানে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলে কেউ কেউ ছিটকে পড়ে। তখন এদের দৌরাত্ম্য আর চুরি-দুর্নীতি-প্রতারণার অবিশ্বাস্য কাহিনীর কিছুটা মানুষ জানতে পারে। কিছুদিন এসব নিয়ে হরেক রকম ‘গসিপ’ চলে। আমাদের রাজনীতিমনস্ক মানুষ কতভাবেই না রাজা-উজির মারে; হতাশা-নৈরাজ্য আর ক্ষোভ-বিক্ষোভও প্রকাশ করে। রাষ্ট্র প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কখনো কখনো এদের গ্রেপ্তার করে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হেফাজতে রাখে, মামলা ঠোকে। একসময় এদের অধিকাংশই বেরিয়ে আসে। পুরো প্রক্রিয়ায় অবৈধ ও অনুপার্জিত আয়ের যে অংশ খরচ হয়, তার থেকে শতগুণ অর্থসম্পদ সুরক্ষিতই থেকে যায়। ক্ষমতার সিন্ডিকেটসমূহ বহাল-তবিয়তেই থাকে।

প্রতারক ও জালিয়াত সাহেদ তার রিজেন্ট হাসপাতালে ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট প্রদান ও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অসংখ্য অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে। সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানের পর পালিয়ে থেকে স্ত্রীকে সাহেদ জানিয়েছিলÑ যেখানে আছি নিরাপদেই আছি। প্রায় চার দশক আগে কুখ্যাত সন্ত্রাসী ইমদু গ্রেপ্তার হয়েছিল তৎকালীন বিএনপি সরকারের যুববিষয়ক মন্ত্রী আবুল কাশেমের বাড়ি থেকে। ইমদুর মতো সাহেদের নিরাপদ আশ্রয় কোথায় ছিল জনমনে এই নিয়ে বহু প্রশ্ন ও কৌতূহল রয়েছে।

আটক হওয়ার পর সাহেদ দম্ভ প্রকাশ করে বলেছে, ছয় মাসের বেশি তাকে আটকে রাখা যাবে না, তারপর সে সবাইকে দেখে নেবে। অনুমান করা যায় রিমান্ড শেষ হওয়ার পর সাহেদ কিছুদিন জেলে থাকবে, তারপর জি কে শামীম ও সম্রাটদের মতো অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাবে, জামাই আদরে থাকবে; তারপর একসময় জামিনে বেরিয়ে আসবে।

আপাতত কদিন সাহেদকে নিয়ে মেতে থাকা! কিছুদিন পর আমরা আবার এ রকম আরেকজনকে নিয়ে মেতে থাকব, নতুন সাহেদের জন্য অপেক্ষা করব। সাহেদের মুখোশ খসে পড়েছে। বাকি হাজার হাজার প্রতারকদের মুখোশের কী হবে? এরা তো সাফসুতরো হয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এসব ব্যাপারে দায়দায়িত্ব স্বীকারে এখন আর কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবেই আমরা বছরের পর বছর আর দশকের পর দশক পার করছি।

করোনা মহামারীকে কেন্দ্র করে চুরি, দুর্নীতি, জালিয়াতি, অনিয়ম, প্রতারণা ইতিমধ্যে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ডা. সাবরিনা ও তার স্বামী আরিফের এক ল্যাপটপ থেকেই নাকি করোনা পরীক্ষার ১৫ হাজার ভুয়া সার্টিফিকেট দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৪ সালের পর থেকে যে রিজেন্ট হাসপাতালের রেজিস্ট্রেশনই নেই করোনা চিকিৎসার জন্য ‘নির্ধারিত হাসপাতাল’ হিসেবে সরকার কীভাবে তাদের সঙ্গে চুক্তি করে? গত জুন মাসেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি বরাবর যখন এসব প্রতারণার অভিযোগ উত্থাপিত হয়, তারপরও এসব মেগা প্রতারকের বিরুদ্ধে যখন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, তখন নাগরিকরা বুঝে নেয় ভদ্রবেশী প্রতারক আর জালিয়াতরা কত জায়গাই না দখল করে আছে। মাস্ক, ভুয়া অক্সিজেন সিলিন্ডার, পালস অক্সিমিটার, স্যানিটাইজারসহ করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসাসামগ্রী নিয়ে ওঠা শত শত অভিযোগের তো কার্যকর তদন্ত ও কোনো বিচার-আচারই হলো না।

করোনা পরীক্ষার সার্টিফিকেট-সংক্রান্ত জালিয়াতি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন; হাজার হাজার সুস্থ মানুষের সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ার প্রশ্ন। কদিন আগে ইতালিতে ফিরে যাওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ৩০ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত করা হয় এবং এরপর বাংলাদেশি অভিবাসী বহনকারী অন্য বিমানকে ইতালিতে নামতে দেওয়া হয়নি। পরিহাস এই যে, ইতালি থেকে ফিরে আসা যে বাংলাদেশিরা করোনাভাইরাস বহন করে বাংলাদেশে নিয়ে এলো, সংক্রমণের ঝুঁকির কারণে তারাই এখন ইতালিতে নামতে পারছে না। পৃথিবীর আরও কয়েকটি দেশকে অনুসরণ করে ইতালিও এখন কমপক্ষে আগামী তিন মাসের জন্য বাংলাদেশিদের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জারি করল। করোনা পরীক্ষার এসব অবিশ্বাস্য জালিয়াতি ও প্রতারণার কারণে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ ও সরকারের ভাবমূর্তি শুধু তলানিতে গিয়ে ঠেকছে না, আগামীদিনে অভিবাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বড় ধরনের সংকটেরও মুখোমুখি হতে হবে। প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যে মানব পাচারসহ নানা গুরুতর অভিযোগে সরকারদলীয় সাংসদ পাপুল এখন কুয়েতের কারাগারে। এসব ঘটনা বাংলাদেশের অভিবাসী ও অভিবাসী অর্থনীতিকেও নানাভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এই মাফিয়াদের বাড়-বাড়ন্ত সরকারসহ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রছায়াতেই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাকি দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে প্রায় প্রতিদিন এর বিপরীত চিত্রই দেখতে হচ্ছে। রাষ্ট্র ও তার ক্ষমতার কাঠামোগুলো এখন অনেকটাই এই মাফিয়া-দুর্বৃত্তদের নিয়ন্ত্রণে।  রাষ্ট্র যখন খোলাখুলিভাবে দুর্বৃত্তদের পক্ষে দাঁড়িয়ে যায়, তখন নাগরিকদের দিক থেকে এ ধরনের রাষ্ট্রের উপযোগিতা নিয়ে জরুরি নানা প্রশ্ন উঠে আসা অস্বাভাবিক নয়।

চিহ্নিত কিছু মাফিয়া সিন্ডিকেটের কাছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা এখন একাকার। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে এরা বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। সরকারের কাছেও এরা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ কর তুলেছে। সরকারের অস্তিত্ব ও টিকে থাকার সঙ্গে এদের অস্তিত্ব ও টিকে থাকাও সম্পর্কিত। এ কারণে ক্ষমতায় থাকতে ভোটের মাধ্যমে জনসম্মতি আদায়ের চেয়ে এদের সমর্থন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, প্রতিষ্ঠানসহ এদের ওপর সরকারের নির্ভরশীলতা যত বাড়ে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক ক্ষমতাও তত কমতে থাকে। এ কারণে ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি, ব্যাংক, শেয়ার মার্কেট লুট, অর্থ পাচারসহ দুর্নীতি, জালিয়াতি ও প্রতারণার লোমহর্ষক ঘটনাবলি একে একে চাপা পড়ে; এক ঘটনা আরেক ঘটনাকে টপকে যায়। সম্রাট, জি কে শামীম, পাপিয়া আর হালের সাহেদ, সাবরিনাদের যারা তৈরি করেছে, সামনে ও পেছন থেকে যারা মদদ জুগিয়েছে, বাহবা দিয়েছে, রাতারাতি ‘টক শোতে’ বুদ্ধিজীবী বানিয়েছে, তারা সবাই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতে পারেন।

বস্তুত সাহেদ, সাবরিনা-আরিফ দুর্বৃত্তায়িত পুরো ব্যবস্থার কণামাত্র, উল্কাপাতের মতো। হাজার হাজার সাহেদ-সাবরিনারই এখন দৌরাত্ম্য। সমস্যা হয়েছে ওদের মুখোশটা খসে পড়ায়। আর যে বিপুলসংখ্যক নানা তকমা নিয়ে মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের জন্য ব্যবস্থা কী? এই নিদানের ব্যবস্থা করতে পারলেই বোধ করি দেশ ও জনগণের মুক্তি।

লেখক

সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি

saifulhuqrwpb@gmail. com